যে সমস্ত কমরেড আজকে ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা’র ডাক দিচ্ছেন, তারা বোধহয় ভুলে গেছেন ১৯৮২ সালের ৩০সে এপ্রিল তেনাদের দল কলকাতা শহরের বুকে প্রকাশ্য দিবালোকে,জ্যান্ত জ্বালিয়ে দিয়েছিল ১৭ জন নিরস্ত্র আনন্দমার্গী সন্ন্যাসীদের। ভারতের বুকে এত বড় পরিকল্পিত নৃশংস গনহত্যার উদাহরন বিরল।

এই হত্যাকান্ডে আজ অবধি একজনেরও সাজা হয়নি, বিচারবিভাগীয় কমিশন হয় কোন রিপোর্ট দেয়নি অথবা রিপোর্ট চেপে রাখা হয়েছে। মমতা ব্যানার্জি ঘটা করে বিচারপতি লালা’র নেতৃত্বে যে কমিশন গঠন করেছিলেন -সেই কমিশন কার ইংগিতে ঠূঠো জগন্নাথ হয়ে বসে আছে সে কেবল উনিই জানেন।

চাইলে খুব সাধারণ ভাবে গুলি করে বা বোমা মেরেও খুন করা যেত আনন্দমার্গীদের কিন্তু বাম সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল সন্ত্রাসের বাতাবরণ সৃষ্টি করা৷ সেই কারণেই ১৭ জন আনন্দমার্গীকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার ব্লু–প্রিণ্ঢ তৈরীর কাজ শুরু হয়৷ ১৯৮২ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারীর পর থেকে আনন্দমার্গীদের নিশ্চিহ্ণ করার চূড়ান্ত রূপরেখা বাস্তবায়িত করেন কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়, রবীন দেবরা, এমনটি অভিযোগ৷ আনন্দমার্গীদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরী করতে নেমেছিলেন সিপিএমের নেতারা৷ রালি, মিটিং মিছিল শুরু করে আনন্দমার্গীদের ছেলেধরা প্রমাণ করার মরিয়া চেষ্টা চলেছিল৷ ১৯৮২ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারী পিকনিক পার্কে একটি কনভেনশন ডাকা হয়৷ সেই কনভেনশনে উপস্থিত থাকা বাম নেতারা জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়েছিলেন আনন্দমার্গীদের বিরুদ্ধে৷ সত্যসাধন চক্রবর্তী, কান্তিগাঙ্গুলী (তৎকালীন কমিশনার যাদবপুর পুরসভা ও প্রাক্তন মন্ত্রী), সুজন চক্রবর্তী , সন্তোষ মিত্র , ক্ষুদিরাম ভট্টাচার্য, গঙ্গাধর নস্কর, রবীনদেব , বিজনবিহারী পুরকায়স্থ, অধ্যাপক নির্মাল্য বাগচী, অধ্যাপক অবন্তীকুমার সান্যাল, অধ্যাপক রথীন্দ্র নারায়ণ বসু, রজত বন্দ্যোপাধ্যায়, মিহির চট্টোপাধ্যায় (নাট্যকার), আশুতোষ সেন (অ্যাড্ভোকেট), কবি অরুণ মিত্র, বাদল দাশগুপ্ত, সুনীল চক্রবর্ত্তী (চেয়ারম্যান যাদবপুরপুরসভা), বীরেন ঘোষ (ভাইস চেয়ারম্যান, যাদবপুর পুরসভা) প্রশান্ত দাশগুপ্ত (কমিশনার যাদবপুর পুরসভা), প্রণব সেন (কমিশনার যাদবপুর পুরসভা), অধ্যাপক রবি রায় সেইদিনের কনভেনশনে উপস্থিত ছিলেন৷ ঘটনার ঠিক একদিন আগে হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত ছক নিয়ে ২৯ এপ্রিল কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়ের পৌরোহিত্যে সন্তোষপুর লোকাল কমিটির সেক্রেটারি স্বপন চক্রবর্ত্তী ওরফে বাবলু, রামনাথ সিং, অর্জুন মুখোপাধ্যায়, গোপাল রায়, নির্মল হালদার সহ সিপিএমের বেশ কিছু কুখ্যাত কর্মীদের রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়৷ সেই মিটিংয়েই আনন্দমার্গীদের নিধনযজ্ঞের পরিকল্পনা পুরোপুরি তৈরি হয়ে যায়৷ ছক মেনে প্রথমে এলাকায় আনন্দমার্গীদের বিরুদ্ধে বারবার মিছিল করা শুরু হয়৷ পরিকল্পনা করা হয় যে, সিপিএমের ‘হার্মাদ’ বাহিনী তিন ভাগে ভাগ হয়ে তিন জায়গায় আনন্দমার্গীদের জন্যে অপেক্ষা করবে৷ বিজন সেতু, বালিগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন ও বালিগঞ্জ রেলওয়ের জিনিসপত্র রাখার জায়গায় তারা আনন্দমার্গীদের জন্যে অপেক্ষা করবে৷ তিনটি দলের নেতৃত্ব দেবে বাবলু, রামনাথ সিং ও নির্মল হালদার ও কুখ্যাত বাহিনী৷ যখনই আনন্দমার্গীরা তিলজলার আশ্রমের দিকে যাবে তখন তাদের পিটিয়ে ও জ্বালিয়ে খুন করা হবে৷ সেই জন্যে তিনটি দলের কাছে আগে থেকেই প্রচুর পরিমাণে জ্বালানিও মজুত রাখা হয়েছিল৷

১৯৮২ সালের ৩০সে এপ্রিলের সকালে সন্ন্যাসীরা বিজন সেতুর ওপরে আসতেই সিপিএম নেতা–কর্মীদের একটি দল তাঁদের ঘিরে ফেলে লাঠি, রড দিয়ে হামলা চালায়। কার্যত চক্রব্যুহে আটকে পড়া সন্ন্যাসীরা সিপিএমের ওই উন্মত্ত দলের কাছে কাকুতি মিনতি করতে থাকেন৷ কিন্তু মৃত্যু নেশায় বুঁদ সশস্ত্র বাহিনীর প্রথমে রড ও লাঠির ঘায়ে অচেতন করে দেয় অবধূতদের৷ এমন পরিস্থিতিতে অন্যান্য এলাকায় জমায়েত করে থাকা সিপিএমের ক্যাডাররাও বিজন সেতুর ওপর ভিড় বাড়িয়ে সেই নৃশংসতাকে কয়েকগুণ বাড়াতে হাত লাগান৷ এরপর অচেতন অথচ জীবিত অবধূতদের একের পর এক গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয় সিপিএমের কমরেডরা৷ পরে ওই হার্মাদদের দল একের পর এক অর্ধদগ্ধ সন্ন্যাসীদের দেহ বালিগঞ্জ স্টেশনের রেল লাইনে ফেলে দিয়ে ‘হায়েনার হাসি হেসেছিলেন’৷

এই যে জঘন্যতম গণহত্যা যা জাতি হিসাবে বাংগালীর লজ্জা তা যথারীতি আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজ বেমালুম ভুলে মেরে দিয়েছেন। সামান্যতম বিবেকদংশন অবশিষ্ট থাকলে তেনারা সিপিএমের নকল ফ্যাসিবাদের বিরোধিতা’র মুখোশ অনেকদিন আগে খুলে দিতেন।

লেখক: অবধূত

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.