ডেঙ্গু, রক্ত-আমাশা, গর্ভপাত! এই নিয়েই ২২ দিনে পড়ল এসএসসি-অনশন, তীব্র সমালোচনার মুখে সরকার

দাবি তাঁদের একটাই। চাকরি। রীতিমতো পরীক্ষা দিয়ে, পাশ করে প্রাপ্য চাকরি। সেই দাবিতেই অনশন করছেন তাঁরা। দাঁতে কুটোটুকু না কেটে, ২২ দিনে পৌঁছে গেল তাঁদের আন্দোলন। এর মধ্যেই কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। রক্ত আমাশায় ছটফট করছেন কেউ। গর্ভের সন্তানকে হারাতে হয়েছে এক জনকে। বাকি দুই অন্তঃসত্ত্বাকে বুঝিয়েসুঝিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবু অনড় অনশনকারীরা। এক চুল জমি ছাড়তে রাজি নন তাঁরা। দাঁতে দাঁত চেপে বলছেন, দাবি আদায় করেই উঠবেন। তাঁরা এ রাজ্যের ভবিষ্যতের সম্ভাব্য শিক্ষক। এসএসসি পরীক্ষায় পাশ না করেও, দীর্ঘ দিন ধরে চাকরি না পাওয়া যুবক-যুবতীর দল।

বুধবার, স্কুল সার্ভিস কমিশনের অধীনে চাকরিপ্রার্থীদের অনশন আন্দোলন একুশতম দিনে পৌঁছয়। এ দিন একটি গণ কনভেনশনের আয়োজন করেন এসএসসির চাকরি প্রার্থীরা। রাজ্যের বিভিন্ন শিল্পী-সাহিত্যিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সেই অনুষ্ঠানে অংশ নেন। বিরোধী নেতাদেরও দেখা যায়। কনভেনশন চলাকালীনই দুই অনশনকারী অসুস্থ হয়ে পড়েন। রায়গঞ্জের অর্পিতা দাস এবং বীরভূমের সুবোধ হালদারকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় প্রেস ক্লাবের সামনের অনশন মঞ্চ থেকে।

“গাছ ভেঙে পড়ুক। গাড়ি চাপা দিয়ে দিক। মৃত্যুর কোনও পরোয়া নেই। অনশন তো চলবেই। হয় চাকরি, নয় মৃত্যু”– দৃঢ় গলায় বললেন এক অনশনকারী। এই পণ নিয়েই এসএসসি চাকরি প্রার্থীদের অনশনে এখনও ২০০ জন সামিল। বাড়িঘর ছেড়ে ধর্মতলার প্রেস ক্লাব চত্বরই এখন এঁদের ঠিকানা।

নদিয়ার তানিয়া শেঠ বলেন, “এখানে অনশনে বসে বীরভূমের রুমকি প্রামানিকের ডেঙ্গু হয়েছে। মুর্শিদাবাদের রুশভেল রক্ত আমাশায় আক্রান্ত। এক জনের সন্তান নষ্ট হওয়ায় গর্ভপাত করতে হয়েছে। অনশন করে অসুস্থ হওয়ায় ৫৮ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। মোট অসুস্থ ১০০ জনকে বাড়ি চলে যেতে হয়েছে। তবু আমাদের লড়াই থামবে না।”

সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, নবম-দশম ও একাদশ-দ্বাদশে এসএসসির লিখিত পরীক্ষায় পাস করেও, কয়েক বছর ধরে ওয়েটিং লিস্টে থাকতে হচ্ছে কয়েকশো প্রার্থীকে। অথচ ওই শিক্ষকদের জন্য অসংখ্য শূন্য পদ রয়েছে একাধিক স্কুলে। তাঁদের চাকরি দিতে হবে, এই দাবিতে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন করছেন কয়েকশো তরুণ-তরুণী। ইতিমধ্যে প্রায় ৬০ জন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। অনশনের জেরে কয়েকদিন আগে এক মহিলার গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যায়। ছোটো ছোটো সন্তান কোলে নিয়ে মায়েরাও অনশন করছেন। তাঁদের অভিযোগ, এসএসসি নিয়োগে দুর্নীতি চলছে। তাঁরা যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও চাকরি পাচ্ছেন না।

এ দিন গণকনভেনশনে আসা এপিডিআর, গণনাট্য সংঘের মতো সংগঠনগুলি অনশনকারীদের দাবি ন্যায্য বলে দাবি করে। কবি মন্দাক্রান্তা সেন, পরিচালক অনীক দত্ত, অভিনেতা বাদশা মৈত্র– সকলেই সরকারের প্রবল সমালোচনা করেন। সিপিএমের শ্যামল চক্রবর্তী এবং ফুয়াদ হালিমের মতো নেতারাও আন্দোলনে সহমর্মিতা জানান। কবি শঙ্খ ঘোষ আগেই সংহতি জানিয়েছেন অনশনকারীদের জন্য।

অনশনকারীরা ছাড়াও, বিভিন্ন জেলা থেকে এ দিন আরও অনেক চাকরি প্রার্থী অনশন মঞ্চে আসেন। এক উচ্চপ্রাথমিক শিক্ষক পদের প্রার্থী বলেন, “তিন বছর আগে শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা হয়। বাংলার শিক্ষক হিসেবে আবেদন করে টেট পাস করেছি। আমার তুলনায় কম নম্বর পাওয়া প্রার্থীরা চাকরি পেয়েছে চোখের সামনে। আমার এখনও কাউন্সেলিংয়ে ডাক আসেনি। কীসের উপর ভিত্তি করে নিয়োগ হচ্ছে জানিই না!”

বস্তুত, নিয়োগের তালিকায় কোনও প্রার্থীর প্রাপ্ত নম্বর উল্লেখ করছে না এসএসসি। এখানেই সন্দেহ দানা বেঁধেছে প্রার্থীদের মনে। সদ্যোজাতকে কোলে নিয়ে অনশনে বসা এক প্রার্থী বলেন, “আমার নাম ওয়েটিং লিস্টে আছে। শূন্য শিক্ষকের পদও আছে অসংখ্য। স্বচ্ছ ভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া হলে আমার অবশ্যই চাকরি হওয়া উচিত ছিল এত দিনে। কিন্তু তা হবে কি না জানি না।”

গণকনভেনশনের মঞ্চে এ দিন বিশিষ্ট জনেরা জানান, খোলা আকাশের নীচে অনশন করছেন এতগুলি মানুষ। কাছে পানীয় জল, অ্যাম্বুল্যান্স এবং শৌচাগারের ব্যবস্থা রাখা উচিত সরকারের। এবং যথেষ্ট সহমর্মিতার সঙ্গে এঁদের দাবিগুলি পর্যালোচনা করা উচিত।


Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.