সকাল সাড়ে দশটা থেকে বেলা তিনটে। সাড়ে চার ঘণ্টা পরেও স্বাভাবিক হল না হাওড়া কর্পোরেশন চত্বরের পরিস্থিতি। বরং আরও অগ্নিগর্ভ হল। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেও পারলেন না রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ রায়। আইনজীবীরা ঘিরে রয়েছেন কর্পোরেশন দফতর। দফায় দফায় চলছে ইটবৃষ্টি। ইটের ঘায়ে আহত পুরকর্মীকে নিয়ে যাওয়ার সময় আটকে দেওয়া হল অ্যাম্বুলেন্স।

কর্পোরেশনের ভিতর আটকে কয়েক হাজার কর্মী। অসংখ্য সাধারণ মানুষ যাঁরা পুর দফতরে নিজেদের কাজের জন্য এসেছিলেন, তাঁরাও আটকে পড়েছেন। কর্পোরেশনের দুটি গেটই অবরুদ্ধ করে রেখেছেন আইনজীবীরা। কর্পোরেশনের পার্কস অ্যান্ড গার্ডেন বিভাগের এক মহিলা কর্মী বলেন, “আমরা আতঙ্ক নিয়ে বসে আছি। কী হবে জানি না। খাবার কিনতে বেরোতে পারছি না। ভয়াবহ অবস্থা।”

ঘটনার সূত্রপাত বুধবার সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ। কর্পোরেশনের দক্ষিণ-পূর্ব দিকের নতুন গেটের সামনে এক আইনজীবীর গাড়ি পার্ক করা ছিল বলে জানা গিয়েছে। অভিযোগ, কর্পোরেশনের অস্থায়ী কর্মীদের কেউ সেই গাড়িতে ভাঙচুর চালায়। এরপর খবর যায় কোর্টে। উকিলরা ঢুকে পড়েন কর্পোরেশনে। পুরকর্মীদের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধ বেঁধে যায় আইনজীবীদের। অভিযোগ, এক আইনজীবীর মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনায় আহত হয়েছেন এক পুরকর্মীও। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে হাওড়া স্টেট  জেনারেল হাসপাতালে। কর্পোরেশনের নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গেও ব্যাপক ধস্তাধস্তি হয় আইনজীবীদের। যত যময় এগোয়, তত চড়তে থাকে উত্তেজনার পারদ। কর্পোরেশন এলাকা থেকে গণ্ডগোল বেরিয়ে নেমে আসে কোর্টের সামনের রাস্তায়। শুরু হয় ইট বৃষ্টি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বন্ধ হতে শুরু করে দোকানপাট। বেশ কিছুক্ষণ পর হাওড়া কমিশনারেটের বিশাল পুলিশ বাহিনী আসে। তাদেরও পরিস্থিতি সামাল দিতে নাকানিচোবানি খেতে হয়। নামানো হয় র‍্যাফ। তাতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।

দুপুরে, ফের এক দফা ইটবৃষ্টি হয়। সেই ঘটনায় মাথা ফাটে শর্মিষ্ঠা দত্ত নামের এক পুরকর্মীর। তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় ওই অ্যাম্বুলেন্স আটকে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বেশ কয়েকজন আইনজীবী মিলে ওই অ্যাম্বুলেন্সের চাবি খুলে নিয়ে পালিয়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় শর্মিষ্ঠা দত্তকে সেখানেই বসে থাকতে হয়। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে অ্যাম্বুলেন্স হাওড়া হাসপাতালের দিকে এগোলে সেখানেও আটকে দেওয়া হয় অ্যাম্বুলেন্স। বেশ কিছুক্ষণ আটকে থাকার পর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।

পরিস্থিতির খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছন বিজেপি প্রার্থী রন্তিদেব সেনগুপ্ত। কিছুক্ষণ থাকার পর তাঁকেও নিরুপায় হয়ে ঘটনাস্থল ছাড়তে হয়। অনেকের অভিযোগ, আইনজীবীরা কার্যত নিজেদের হাতেই আইন তুলে নিয়েছেন। একটা জরুরি পরিষেবার জায়গাকে কী করে অবরুদ্ধ করে রাখেন তাঁরা? আইনজীবীদের দাবি, কর্পোরেশনের যে কর্মীরা হামলা চালিয়েছিল, তাঁদের গ্রেফতার করতে হবে। নাহলে অবরোধ চলবে। বন্ধ হয়ে গিয়েছে হাওড়া কোর্টের সমস্ত কাজকর্ম।

অভিযোগের আঙুল উঠছে কর্পোরেশনের প্রশাসক বিজিন কৃষ্ণার দিকেও। অনেকের মতে, এই আমলার প্রশাসনিক অদক্ষতার জন্যই এমন একটা ঘটনা ঘটল। কিন্তু সব কিছুর পরেও, বিকেল পর্যন্ত আটকে কয়েক হাজার মানুষ। তাঁদের দাবি একটাই, পুলিশ পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে তাঁদের বার করার ব্যবস্থা করুক। এখন দেখার কখন স্বাভাবিক হয় হাওড়ার প্রাণ কেন্দ্রের পরিস্থিতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.