মমতার প্রতি মুসলমানদের মোহ ভাঙা শুরু হয়েছে

অনেক দিন পর দেখা হলো হাজি মনিরদ্দিন আলেমের সঙ্গে। অতীব রাজনৈতিক সচেতন এই মানুষটি মহেশতলার লাগোয়া সাতগাছিয়া বিধানসভা কেন্দ্রের আশুতির বড়ো বকুলবাড়ির মসজিদ পাড়ার বাসিন্দা। স্থানীয় মানুষের কাছে বড়ো হাজি সাহেব বলে পরিচিত মনিরুদ্দিন প্রথম থেকেই কংগ্রেসি ঘরনার সমর্থক। বিগত ১৯৭৭ সালে সাতগাছিয়া কেন্দ্রে জ্যোতি বসু বামফ্রন্ট প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়ার সময় থেকে কংগ্রেস প্রার্থীর সমর্থনে যুবক মনিরুদ্দিন প্রচার ও জনসভা শুরু করেছিলেন। প্রথম থেকেই এখনকার প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্রের অনুগামী তিনি। পরে ‘ছোড়দা’ তার এক সময়কার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তথাকথিত অগ্নিকন্যার দলে গিয়ে সাংসদ হওয়ার ফয়দা তুলতে নাম লেখানোর সময় অনেকের মতো মনিরুদ্দিনও ঘাসফুলের শিবিরে ভিড়ে যান। এখনও পর্যন্ত তিনি রাজ্যের শাসকদলের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। কংগ্রেস শিবিরে থাকার জন্য একটা সময় তাকে অনেকবারই বামেদের হাতে হেনস্থা হতে হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তিনি তার দল তৃণমূল কংগ্রেস এবং দলনেত্রীর কাজকর্মে হতাশ।

এই বাংলার অনেক মুসলমানের মতো তিনিও মনে করতেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাদের একমাত্র মসিহা। তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস এবং চীন ঘেষা সিপিএম ও জামাত, আই এস সমর্থক অতি বামেদের ভ্রান্ত প্রচার ও ভুল ধারণার জন্য তিনিও প্রবল বিজেপি বিদ্বেষী। অনেক মুসলমানের মতো তিনিও তৃণমূল কংগ্রেসের পাশাপাশি একই সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলেমায়ে হিন্দের সদস্য। এই সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তিনি আছেন। সব মিলিয়ে ‘হিন্দুদের দল’ বিজেপি বিদ্বেষ তার মজ্জায় প্রায় প্রকাশ্যেই প্রবাহিত। তার রাজনৈতিক দল এবং ধর্মীয় সংগঠনের বিভিন্ন সভায় দেশ বিরোধী বক্তব্যের সঙ্গে বিজেপির প্রতি উদ্দেশ্য প্রণোদিত উচ্চকিত মন্তব্য করেন তিনি। পোশাকে, সজ্জায়, আচরণে, খাদ্যাভাসে, কথায় নিজেকে ‘প্রকৃত মুসলমান’ বলে প্রচারও করেন। তাঁর মতে জওহরলাল নেহরু, সিদ্ধার্থ শংকর রায়, মুলায়েম সিংহ যাদব, মায়াবতী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হলেন আসল মুসলমান বন্ধু। এই নেতাদের কাছে মুসলমানরা নিরাপদ। এখন বাংলাতে মুসলমানরা ভালো আছেন। নিজেকে কট্টর মৌলবাদী বলতেও দ্বিধা নেই এই মানুষটি এখন অন্য ভাবনার দোলাচলে।

দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা কমিটির এক সময়কার-সহ সভাপতি এবং আবু বরকত আতাউল গণিখান চৌধুরীর নেতৃত্বে থাকা প্রদেশ কংগ্রেসের সম্পাদক অশতিপর আদ্যপান্ত বিজেপি বিরোধী এই মানুষটি কিছুদিন হলো অন্য ভাবনায় চলমান। কথা প্রসঙ্গে তিনি জানালেন সত্যিই কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুসলমানদের বন্ধু নাকি সবটাই তাঁর রাজনৈতিক চাল। নব্বই দশকের শেষ দিকে রাজনৈতিক কারণে বিজেপির সঙ্গ ছাড়েন তৃণমূল সুপ্রিমো। দীর্ঘ তিন দশকের বামেদের অপশাসনের জন্য রাজ্যের মানুষ পরিবর্তন চাইছিলেন। সেই সময় চতুর রাজনৈতিক নেত্রী রাজ্যের ২৩শতাংশ মুসলমান ভোটের আশায় চরম বিজেপি বিদ্বেষী হয়ে পড়েন। প্রতি শুক্রবার দেবী সন্তোষীর ব্রত রাখা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মাথায় হিজাব তুলে নেন। সকলেরই মনে আছে ২০১১ সালে প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি রেড রোডে স্বাধীনতা দিবসের পতাকা তুলতে হিজাব পরে গিয়েছিলেন। রেল দপ্তরের একটি হিসাব অনুসারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী থাকায় সময় এই রাজ্যের মোট ১৪২৫৩ জনকে চাকরী দিয়েছিলেন। তার মধ্যে ৩৪৯৮ জন স্থায়ী পদে নিয়োজিত হয়েছিলেন।

অস্থায়ীদের প্রায় সবাইকে বেআইনি ভাবে নিয়োগ করা হয়েছিল বলে পূর্বতন রেলমন্ত্রী সিপি যোশী এবং পরবর্তী সময়ে পবন কুমার বনশাল তাদের সরিয়ে দেন। মমতার সময়ে স্থায়ী পদে ২৪২১ এবং অস্থায়ী পদে ৮৭৪৩ জন মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকে রেল দপ্তরের কর্মী হিসাবে নিয়োগ করা হয়েছিল। বিগত ২০১১ সালের নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই তৃণমূল নেত্রীর মুসলমান তোষণের চেহারা দেখেছেন বাংলার মানুষ। পূর্বতন প্রদেশ কংগ্রেসের সংখ্যালঘু সেলের সভাপতি তথা বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ ইদ্রিশ আলির উস্কানিতে বাংলাদেশের লেখিকা তসলিমা নাসরিনের রাজ্য থেকে বহিষ্কারের দাবিতে কলকাতা শহরে যে সাম্প্রদায়িক ভয়াবহ আবহ তৈরি হয়েছিল তাকে সমর্থন করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ক্ষমতায় আসার পর পার্কস্ট্রিট বা কামদুনির মতো অমানবিক ঘটনার পরেও তোষণের স্বার্থে কেবলমাত্র মুসলমান বলে অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। এরপর কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী সহ বিভিন্ন প্রকল্প তৈরি করে এক তরফা ভাবে নির্দিষ্ট করে মুসলমানদের সরকারি সহায়তা করেছেন। এক তরফা ভাবে মুসলমানদের চাকরি দিয়েছেন। ওবিসি কোটায় প্রায় সমস্ত মুসলমানদের এনেছেন। হালফিলে জনগণের অসন্তোষ টের পেয়ে অবস্থার পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। অপর দিকে গোরু পাচার-সহ বিভিন্ন অপরাধ দিনের পর দিন বাড়লেও প্রথম দিকে প্রশাসন উপর মহলের নির্দেশে ছিল নিশ্চুপ। খাগড়াগড় কাণ্ডের পর কেন্দ্রীয় সরকার কঠোর হতেই এই সব অপরাধীদের ধরা পড়তে দেখা যায়। অপরাধীরা বেশির ভাগ মুসলমান সম্প্রদায়ের এবং অনেকেই অনুপ্রবেশকারী।

সকলেরই মনে আছে ক্ষমতায় আসার কয়েকদিনের মধ্যেই এখনকার মুখ্যমন্ত্রীর প্রিয় বুলি পরিবর্তনের পরিবর্তে হয়ে ওঠে ‘সব করে দিয়েছি’। বিধানসভা নির্বাচনের আগে ‘সংখ্যালঘুদের’ নামের আড়ালে মুসলমানদের সমস্ত কিছুতেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এমনই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বস্তুত এখনও তাই করেই যাচ্ছেন। কিন্তু এত কিছুর পরেও মুসলমান সমাজের প্রশ্ন—আদৌ কি মুসলমানদের প্রকৃত উন্নয়ন হচ্ছে। মুসলমান যুবক সমাজের কিছু চাকরি হয়েছে, অনেকেই সরকারি ঋণ নিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন। কয়েকজন সরকারি দলে নাম লিখিয়ে আখের গুছিয়ে নিয়েছে। আবার গোরু পাচার-সহ বিভিন্ন অপরাধ করেও শাসক দলের ছত্রছায়ায় থেকে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সন্দেহ নেই বেশ কিছু মুসলমান যুবক আর্থিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এখানেই কি শেষ? সম্প্রতি মহেশতলার ডাকঘরে অনুষ্ঠিত এস্তেমাগায় এমনই প্রশ্ন তুলেছেন হাজি মনিরুদ্দিন সহ অনেকেই। বড়ো হাজি সাহেবের কথায়, সংখ্যাগুরু হিন্দুদের বাদ দিয়ে কেবল মাত্র মুসলমানদের উন্নয়ন হবে, মুসলমানদের ঘরে কেবল চাকরির চিঠি আসবে, বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা পাবে তা কখনই হবে না। কিন্তু প্রশ্নটা হলো, এই রাজ্যে মুসলমানদের জন্য যত উন্নয়নের ঢাক পেটানো হচ্ছে তার সত্যতা কতটুকু। তিনি মনে করেন অনুপ্রাণিত হওয়ার মতো বাস্তব সত্য আছে কি। একই প্রশ্ন তুলেছেন ফুরফুরা শরীফের প্রধান ত্বহা সিদ্দিকি। তিনি প্রকাশ্যেই বলেছেন মুসলমান উন্নয়ন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মিথ্যে কথা বলা না বন্ধ করলে ‘সিপিএমকে কবর থেকে তুলে ক্ষমতায় বসাবেন’। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো এক ভাইরালে তার বক্তব্য বিজেপিকে তিনি খারাপ মনে করেন না। প্রাক্তন আইপিএস অফিসার নজরুল ইসলাম, অধ্যাপিকা মিরাতুন নাহারও অনেকবারই ‘সততার প্রতীকের’ মিথ্যাচারিতার মুখোশ খুলেছেন। জয়নগর মজিলপাড়ায় অনুষ্ঠিত একটি মজলিসে ভাষণ দিতে গিয়ে দিল্লির মেহরালির কুতুবশাহী চবুতরা মসজিদের ইমাম মাওলানা তব্বিবুর হোসেন আগা বলেছেন এই রাজ্যের মুসলমানদের থেকে গুজরাট, রাজস্থানের মুসলমানরা ভালো আছেন। বিশেষ করে গুজরাটে করসেবক কাণ্ডের পর কিছুদিন অস্থিরতা থাকলেও সবই এখন ইতিহাস। গুজরাট মুসলমানদের জন্য স্বর্গরাজ্য না হলেও মিথ্যা ফুলঝুরিতে বসবাস করেন না। সেখানকার বয়ন শিল্পী বা স্বর্ণকারেরা বাংলার থেকে ভালো আছেন। কলকাতা লাগোয়া একটি কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক সফিকুল আহাসান মনে করেন মুসলমানদের প্রতি স্তোকবাক্য এবং মিথ্যাচার সব থেকে বেশি অপমানকর। দেশের যা আর্থ সামাজিক অবস্থা তাতে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত মানুষ কখনই প্রচুর অর্থের মুখ দেখবেন না। আর দারিদ্র সীমার নীচে বসবাসকারীদের মমতা, রাহুল, মায়াবতী, মুলায়েমরা কিছুদিন দু’টাকা কেজিতে চাল দিতে পারবেন কিন্তু এর বেশি কিছু নয়।

তিনি মনে করেন, ধরে নেওয়া যাক গোটা দেশে ক্ষমতায় এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেবলমাত্র দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী মাত্র ১৫ কোটি মুসলমানদের আর্থিক ভাবে উন্নত করবেন। কিন্তু গোটা দেশের আর্থ সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন না হলে তিনি অমর্ত্য সেনের মতো একটা নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদকে উপদেষ্টা রাখলেও কিছু করতে পারবেন না। ফলে মুসলমানদের জন্য সব করে দিয়েছি বলে কথার ফুলঝুরি ছড়ালে হিন্দু মুসলমান সবাই নিজ নিজ কারণে কেবলমাত্র ক্ষুব্ধ হবেন।

ফিরে আসা যাক হাজি মনিরুদ্দিনের কথায়। তাঁর সাফ কথা এখনকার মুসলমান সমাজ নিজেদের ভালোমন্দ, অধিকার বুঝে নিতে জানে। অনেক মুসলমানই এখন কোনও ইমাম, পিরজাদা, মাওলানা বা রাজনৈতিক নেতার কথায় অন্ধ হয়ে চলে না। বড়ো হাজি সাহেবের আশুতোষ কলেজে পড়া নাতি জানতে চায় কেন বিজেপি খারাপ। কেউ বললেই কি মোদী সাম্প্রদায়িক হবেন। বিজেপি একবারও মুসলমানদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বলে? বড়ো হাজি সাহেব মনে করেন, এসব প্রশ্ন তোলা মানেই বিজেপির দিকে এখনই ঢলে পড়া নয়। কিন্তু রাহুল বা মমতার দিকেও নিঃশর্ত সমর্থনও নয়। বাম, কংগ্রেস, তৃণমূলের শাসন দেখা শেষ, এখন তবে বিকল্প কী। প্রশ্ন ওঠা মানে বিতর্কের শুরু। আর বিতর্ক মানেই এক কথায় মেনে নেওয়া নয়। আর মেনে না নেওয়া মানে মোহ ভঙ্গের দিকে যাত্রা শুরু এমনটাই মনে করেন পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ তথা ধর্মীয় নেতা হাজি মনিরুদ্দিন।

সুকল্প চৌধুরী

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.