একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী, আর তার অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ভোটযুদ্ধে পরস্পরের মুখোমুখি হলে তাদের রাজনৈতিক বয়ান শুনতে পাওয়া যাবে, এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম গণতন্ত্রে অস্বাভাবিক ঘটনাই স্বাভাবিক বলে গণ্য হয়। নইলে অভিনেতা অক্ষয় কুমারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী যখন গণতান্ত্রিক কাঠামোয় অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুর্গাপুজোয় তাকে কুর্তা রসগোল্লা পাঠানোর কথা বলেন, তার পরে দেউলিয়া বাম ঝাঁপিয়ে পড়ে মোদী দিদি ‘গটআপে’র অভিযোগে। আর সম্ভবত ‘মুসলিম ভোট’ হারানোর ভয়ে কাটা মোদীর সাক্ষাৎকারে বেজায় ক্ষুব্ধ মুখ্যমন্ত্রী রাগের চোটে বলে বসেন এরপর কাদা আর স্টোনচিপসে ভরা রসগোল্লা পাঠাব মোদীকে, খেলে দাঁত ভেঙে যাবে।
এধরনের অসাংবিধানিক বাচনভঙ্গিতে মমতা সিদ্ধহস্ত। গত লোকসভা নির্বাচনের সময় প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভাবী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে কোমরে দড়ি বেঁধে ঘোরানোর ফরমান জারি করেছিলেন। প্রথম দিকে এসব মন্তব্যে রাজ্যের মানুষ খেপে যেতেন, এখন হাসেন। কিন্তু হাসি রাগের মধ্যে গণতান্ত্রিক সৌজন্য – শিষ্টাচারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হারিয়ে যায় না। রাজনীতি রাজনীতির জায়গায় থাকে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গায়। এতো সরল ইকুয়েশন, কিন্তু রাজনীতিতেও কীভাবে অসুস্থতার সঞ্চার হতে পারে সাম্প্রতিক মমতা-মোদী তরজা তার অন্যতম প্রমাণ হয়ে থাকল।
মমতার কুর্তা রসগোল্লা পাঠানোর সৌজন্যকে স্বাভাবিক ভাবেই সম্মান জানিয়েছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। একইভাবে মমতার জন্মদিনের সময়ও বিজেপির রাজ্যসভাপতি সৌজন্য দেখিয়েছিলেন। বর্তমানে বিশেষ উদ্দেশ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদলেহী একটি বাজারি সংবাদমাধ্যম দিলীপবাবুর মন্তব্য তুলে ধরে দেখাতে চাইল দিলীপ ঘোষ মোদীর বিরদ্ধে গিয়ে মমতার পাশে দাঁড়িয়েছেন। রাজনীতিতে সৌজন্যতার পাঠ বামপন্থীরা কোনওদিন শেখেননি। ফলে মোদী-মমতা সৌজন্য তাঁদের কাছে অসহ্য লাগারই কথা, বিশেষ করে, ভারতীয় রাজনীতিতে তাদের ভূমিকাটা যখন মানিক সরকারের কথানুযায়ী ছাগলের তৃতীয় বাচ্চার মতো। আর বামপন্থী মানসিকতা সম্পন্ন বাজারি মিডিয়া এই সৌজন্যের নজিরেও মমতাকে আড়াল করতে ব্যস্ত, ‘রাজনীতি’র কারণেই।
এই ‘রাজনীতি’টাই এইবেলা বুঝে নেওয়া দরকার, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তরজায় মমতা যতই মাঝে মধ্যে বিষয়টিকে হাসির খোরাক করে তুলুন বা বিলো দ্য বেল্ট আক্রমণ করন না কেন। রাজনীতির কারবারিদের একাংশ বহুদিন যাবৎ নরেন্দ্র মোদীর তীব্র বিরোধী, তাদের ব্যক্তিস্বার্থ সিদ্ধির জন্য। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কেউ কারোর বিরোধী হতেই পারেন। কিন্তু একটা প্রশ্ন কেউ এড়াতে পারেননি, সেটি হলো মোদীর বিকল্প কে? প্রথমে রাহুল গান্ধীকে তুলে ধরা হলো। সবাই দেখল প্রধানমন্ত্রীকে চোখ মারা, সংসদে মিথ্যে ভাষণ দেওয়া, আর জনসভায় জনগণকে প্রতারণা করা ছাড়া রাজনীতিতে রাহুলের আর কোনও ভূমিকা নেই। কংগ্রেসকে কেউ আসন ছাড়তে রাজি নয়। ‘বিরোধী জোট’ আর ‘জোটের নেতা’ সবটাই ফানুস, জোটের আগেই ফেটে যেতে বিকল্প নেতা খুঁজতে সবাই ব্যস্ত হলো মায়া, অখিলেশ, চন্দ্রবাবু ইত্যাদির দিকে লক্ষ্য রেখে।
এমনকী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতিরূপ হিসেবে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে তুলে ধরে বারাণসীতে মোদীজীকে প্রায় হারিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু দশমণ তেলও পুড়লো না, রাধাও নাচল না। গান্ধী পরিবারের তরফ থেকে মোদীজীকে হারানোর স্বপ্ন ভোটের আগে এমনই দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো যে বারাণসী থেকে ভাই-বোন শুধু পালালেনই না, গান্ধী পরিবারের গড় রায়বেরিলি-আমেঠিতে মা-পুত্রের জেতাও এবার অনিশ্চিত। মায়া, অখিলেশ, চন্দ্রবাবুরা ভোটের আগেই সেফগার্ড নিয়ে নিয়েছিল। এই খেলা গত পাঁচ বছর ধরে চলছে। তারা জিতলে মানুষের মোদী-বিরোধী রায়, আর হারলে ইভিএমে কারচুপি। এবারও সেই একই পথে কারচুপির গাওনা তারা গেয়ে রেখেছেন।
এই পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নরেন্দ্র মোদীর বিকল্প হিসেবে প্রজেকশানের খুব দরকার ছিল। কারণ উল্লিখিত নেতাদের পেশিশক্তির জোর নেই। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম মমতা। প্রশাসন তার কুক্ষিগত। রাজ্যের মিডিয়া তার অনুগত। বুদ্ধিজীবীরা তার তাঁবে থেকে মমতাজীবীতে পরিণত হয়েছেন। সর্বোপরি নরেন্দ্র মোদী কেন্দ্রীয় প্রশাসনে থাকলে মমতা-অনুগামীদের চুরি বাটপাড়িতে সমূহ বিপদ, সেটাও সবাই জানে। তাই মমতা কারণে-অকারণে মোদী বিরোধী থেকে মোদী বিদ্বেষীতে পরিণত হয়েছেন। এই মোদী বিদ্বেষ অপরিণামদর্শী রাজনীতিক মমতাকে দেশবিদ্বেষীতে পরিণত করেছে। এবং একদল বামমনস্ক তথাকথিত বুদ্ধিজীবী তাদের প্রোপাগাণ্ডা, এজেন্ডা ছড়াতে সুকৌশলে মমতাকে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ফলে মমতাকে মোদীর প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাতে এদের তাগিদ ছিল, বাঙ্গালি সেন্টিমেন্টের অপপ্রয়োগ করে সারা দেশের সঙ্গে বাঙ্গলাকে বিচ্ছিন্ন করে আরবি সংস্কৃতিতে লালিত-পালিত করার কামনা এরা করেছিল মমতার মোদী বিরোধিতাকে সম্বল করেই। তাই এখন পরিকল্পনামাফিক রটানো হচ্ছে মোদী মমতাকে ভয় পেয়েছেন, তাই বাঙ্গলায় বারে বারে ছুটে আসছেন ইত্যাদি। মোদী বনাম মমতার বক্তৃতার মূল বিষয়টি কী ? মোদী বাঙ্গলায় তার বিভিন্ন নির্বাচনী জনসভায় তুলে ধরতে চেয়েছেন ভারতীয় সংস্কৃতিকে। আর মমতা প্রতিবারই সুযোগ বুঝে চলে গিয়েছেন দাঙ্গার প্রসঙ্গে। বিজেপিকে দাঙ্গাবাজ প্রমাণ করতে মমতা শুধু মুসলমান তোষণেই থেমে থাকেননি, দেশের বৃহত্তর হিন্দু জনগোষ্ঠীকেও অপমান করেছেন। জাতীয় নাগরিক পঞ্জীকরণ নিয়ে নরেন্দ্র মোদীর দৃঢ় অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে শ্রীরামপুরে এক জনসভায় স্বভাবসিদ্ধ নিজস্ব হিন্দিতে মমতা বলেন :‘এন আর সি করে গা। কেয়া এন আর সি করেগা? এন আর সি-র নামে আপনাদের জিজ্ঞাসা করবে ১৯৫০ সালের সার্টিফিকেট আছে তো? নইলে সব বাদ। আমায় আমার মায়ের জন্মদিন কবে জিজ্ঞাসা করলে তো আমিই বলতে পারবো না। আপনারা কোত্থেকে বলবেন। সত্তর বছর আগের কাগজ আমি কোত্থেকে পাব? এরা এন আর সি-র নাম করে সবাইকে দেশ থেকে তাড়াতে।’
মমতার এই বক্তব্যে হাসির খোরাক বিলকুল আছে। কিন্তু রোহিঙ্গা-রাজনীতি আর ভুল বুঝিয়ে লোক খেপানোর পলিটিক্স যে মমতা তাঁর রাজনৈতিক তাস হিসেবে ব্যবহার করবেন তা ওই বক্তব্যে খুব স্পষ্ট। নরেন্দ্র মোদী একইসঙ্গে তার বিভিন্ন জনসভায়, এরাজ্যে তো বটেই এমনকী বারাণসীতেও নিজের মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় মমতার রাজত্বে বিজেপি-কর্মীদের ওপর লাগাতার আক্রমণ, অত্যাচার নিয়ে সরব হয়েছেন। ইলামবাজারে জনসভায় তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন ভোট ‘দিদিগিরি’র জায়গা নয়। ‘দাদাগিরি’রও নয়। ভোট ভারতীয় গণতন্ত্রের মহিমাকে সুস্পষ্টরূপে তুলে ধরার জন্য। বারাণসীতে তিনি বলেছিলেন, ‘বাঙ্গলায় বিজেপি-কর্মীরা বোমা- বন্দুকের সামনে লড়াই করছে। বাড়ি থেকে বেরনোর সময় বিজেপি কর্মীরা জানেন না তারা আর বাড়িতে ফিরতে পারবেন কিনা। দেশের প্রধানমন্ত্রীর এই সংবেদনশীল ভাষণ নিয়েও কতটা নােংরা রাজনীতি করা যায়, তা মমতায় সুযোগসন্ধানী একটি নকশালি বাজারি সংবাদমাধ্যম বারাণসীতেও মোদীর মুখে দিদি’ গোছের খবরে দেখিয়েছে, মোদী নাকি মমতাকে ভয় পাচ্ছেন।
এমন হিংস্রতাকে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু মোদীর ভয়ে যে তিনিও সমান আতঙ্কিত, তাই আরও বেশি আতঙ্ক তৈরির চেষ্টায় আছেন নিজের তখত রাখতে, আর এ কাজে বাজারি মিডিয়ারও যে মদত আছে, নানুরে ভোটের দিন একটি ভিডিওতে তা প্রকাশ্যে এসেছে। বাজারি মিডিয়ার বৈদ্যুতিন মাধ্যমে সেখানকার মহিলারা তাদের ওপর ধর্ষণের হুমকির জন্য একটি বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের দিকে হাত তোলা মাত্র ‘শান্তি বজায় রাখতে’ খবরটি ঘুরিয়ে দেওয়া হয়, শ্মশানের শান্তিও ‘শান্তি’ অবশ্য। মমতার ভয় এই ভয়হারী মোদীকেই। যিনি প্রতিপক্ষের শত বাধা সত্ত্বেও এমন এক ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেন, যেখানে বৈষম্য থাকবে না, উপাসনা পদ্ধতিতে বিভিন্নতা থাকলেও বিভেদ থাকবে না।।
এই জায়গাতেই মমতার সমস্যা তৈরি হয়েছে। তার রাজনীতি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমাদর পেলেও তা যে দেশের পক্ষে বিপজ্জনক তা রাজ্যবাসী এমন টের পাচ্ছেন। তাই পেশীশক্তির আস্ফালন করে মমতাকে এখন বলতে হচ্ছে—‘গোটা ভারত সরকার নামান, বাঙ্গলায় শূন্য পাবেন মোদী। ইতিমধ্যেই তিনি বারাণসীতে দাঁড়ালে সব ভোটই নাকি তিনি পাবেন, মোদীর কপালে একটি জুটবে না মমতার এ ধরনের হাস্যকর অবান্তর কথায় এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় মিমের ছড়াছড়ি। কিন্তু মমতার এই ভুলভুলাইয়ার মধ্যেও আরও বেশি চোখে লাগছে ভারত সরকারকেই তিনি শত্রু হিসেবে বেছে নিয়েছেন দেখে, মোদী বিরোধিতা করার অজুহাতে। আর একাজে ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যের প্রশাসনকে ব্যবহার করতে চাইছেন তিনি। মোদীজীর কথায় কোনও অত্যুক্তি নেই যে বাংলাদেশি এনে বিজেপিকে হারানোর ছক কষচ্ছেন দিদি। ঠিকই তো, এরাজ্য, এই দেশের ওপর, এই দেশবাসীর ওপর আর মমতার আস্থা নেই, ভিনদেশ ও ভিনদেশিদের ওপরই তাকে ভরসা করতে হবে, দেশদ্রোহী অভিযোগের সারবত্তা প্রমাণের জন্য মমতার মোদী-বিরোধী প্রচার অভিযানের দিকে লক্ষ্য রাখলেই যথেষ্ট। মোদী বিরোধিতা মানেই দেশ-বিরোধিতা নয় বলে যারা গলা ফাটান, মমতা আর তাঁর তোষামুদে মিডিয়া এঁদের কাছে উদাহরণ হিসেবে গণ্য হতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “তৃণমূলের সূর্য অস্ত যাচ্ছে। নির্বাচনী চোখরাঙানিতে রাজ্যবাসী সেই অপেক্ষায় দিন গুনছেন।
অভিমন্যু গুহ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.