আমরা সকলেই হয়তো আমাদের স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলোনের ইতিহাস পড়েছিলাম এবং কেন জানিনা কোন এক অজানা কারনে মনে মনে হয়তো বেশ গৌরবাণ্বিতও হয়েছিলাম। আসলে অধিকাংশ বৈদেশিক ইতিহাসের মাঝে ভারতবাসী হিসাবে নিজেদেরকে গৌরবাণ্বিত করতে পারে এমন কাহিনী হয়তো আমাদের স্কুলপাঠ্যে কতিপয়ই ছিল।
এখন আসা যাক আসল প্রসঙ্গে, যদিও কবিগুরু সহ বাংলার অন্যান্য মনীষিদের অনুপ্রেরণায় এবং অধিকাংশ বাঙালির সক্রিয় বা পরোক্ষ অংশগ্রহণে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়েছিল বটে কিন্তু ব্রিটিশদের সেদিনের সেই Devide and Rule Policy এর তাৎক্ষণিকভাবে নিষ্ক্রিয় হলেও এই Policy এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে বিপুলভাবে। আজও পঞ্চায়েত প্রধান থেকে রাষ্ট্রপ্রধান, বিদ্যালয় প্রধান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রধান প্রশাসনিক পদে আসীন বিভিন্ন ব্যাক্তিকে আমরা দেখি অতি তুচ্ছ কারণেও এই পদ্ধতির নির্লজ্জ প্রয়োগ করতে।
সম্প্রতি ফিরহাদ হাকিমের কলকাতা পুরসভার পুরোহিত ভাতার ঘোষণাও হয়তো সেই Devide & Rule Policy এর নিঃশব্দ প্রয়োগ। ব্যাপারটা একটু বিশদে বলা যাক 2011 সালে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জন্মের 175 বছর পুর্তিতে বাংলার বুকে সংঘটিত এক আমূল রাজনৈতিক পরিবর্তন। প্রায় সাড়ে তিন দশকের বামপন্থী শাষণের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গের এই পালাবদলে অংশগ্রহণ করে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ নির্বিশেষে সকল ধর্মের, সকল শ্রেণীর মানুষ। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের কিছুদিন বাদেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারিভাবে ইমাম ভাতা এবং অতঃপর মোয়াজ্জেম ভাতা প্রদানের কথা ঘোষণা করলেন এবং ধর্মনিরপক্ষ ভারতবর্ষের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে মুসলিম ও অমুসলিম এই দুই শ্রেণিতে ভাগ করে ফেললেন। যদিও পরবর্তীকালে এই সিদ্ধান্তকে অন্য একটি রাজনৈতিক দল আদালতে চ্যালেঞ্জ করার পর সরকার আইন রক্ষা করতে একটি জটিল পক্রিয়ার সাহায্য নেয় কিন্তু কোন মতেই ইমামভাতা ও মোয়াজ্জেমভাতা বন্ধ হতে দেয়নি। হয়তো সেদিন বামশাসনের অবসান ঘটানোর নয়নের মণি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তার নিচে চাপা পড়ে যায় এই শ্রেণিবিভাজন বিরোধীতার  আগুন কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথের জন্মভূমি এই বাংলার মাটিতে এই শ্রেনীবিভাজন বিরোধিতার আগুন ধীরে ধীরে লেলিহান শিখার আকার নিচ্ছে। এবং এই আগুনের উত্তাপ প্রশমিত করতেই হয়তো কলকাতা পুরসভার এই সাম্প্রতিক পুরোহিতভাতার ঘোষনা।        

 

এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় বিষয় এই যে এই ভাতা প্রদান করা হবে শুধুমাত্র 7 টি শ্মশানের অগ্রদানি ব্রাহ্মণদের অর্থাৎ এই ঘোষণার মাধ্যমে যে হিন্দুদেরকে অহিন্দু শিখ, জৈন, বৌদ্ধ ইত্যাদি সম্প্রদায়ের থেকে পৃথক করার বিভাজিত করার চেষ্টা করা হল তাইই নয়, হিন্দুসমাজকেও খন্ডিত করার চেষ্টা করা হল। এখন এই প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের শ্রেণীবিভাজনবিরোধী আগুনের লেলিহান শিখা আরও বেশি প্রজ্জ্বলিত হবে নাকি রাজনৈতিক নেতা ও তাদের তোষণকারী তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের কপট বুদ্ধির নীচে চাপা পড়ে যাবে তার উত্তর দেবে সর্বশক্তিমান সময়। কিন্তু বাংলায় বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলোনের 100 বছর পরেও যে আমরা প্রতি মুহূর্তে সেই Divide and Rule Policy এর বিষাক্ত ও নির্লজ্জ প্রোয়োগ দেখতে পাচ্ছি তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। 

-দ্বৈপায়ন আর্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.