অদ্ভুত আঁধার এসেছে বাংলায়, আঁধার এসেছে পশ্চিমবঙ্গে।
বাম আমলে একটি শব্দ খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। বৈজ্ঞানিক রিগিং। শব্দটি সম্ভবত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের কারও মস্তিষ্কের ফসল। রিগিং তো রিগিং, তা সে বৈজ্ঞানিক কেন? বৈজ্ঞানিক রিগিং এমন একটা অপারেশন (!) যে কাটা হবে কিন্তু রক্ত পড়বে না। কাকপক্ষীতেও টের পাবে না। অনিল বিশ্বাসরা নাকি এই কাজে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। বামপন্থীরা স্বাভাবিক ভাবেই এসব মানবেন না। তাঁরা বলবেন, মোটেই না, বাম আমলে, গ্রামাঞ্চলে মানুষ উৎসবের মেজাজে কাস্তে হাতুড়িতে ভোট দিতেন। দল কে দল, গ্রাম কে গ্রাম।
সেই দিন এখন গেছে। এখন আর বিজ্ঞানের ধার ধারছে না রিগিং করিয়েরা। রিগিং এখন খুল্লমখুল্লা। বাম আমলের ঘোমটা ধোপার বাড়ি পাঠিয়ে খ্যামটা এখন নগ্ন নাচে মেতেছে। শীর্ষ নেতৃত্ব কলার তুলে ঘোষণা করছে, মার্জিন বাড়াতে না পারলে কাউন্সিলররা আর নির্বাচনে টিকিট পাবেন না। দলের যে নেতা বা মন্ত্রী ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় নিজেই স্বীকার করেন, মার্জিন বাড়ানোর টার্গেট, দলীয় নেতৃত্বের কাছে নিজেকে সত প্রমাণ করার তাগিদ, নির্বাচনে হিংসার জন্ম দেয়, তিনিই ঘোষণা করছেন, ‘মার্জিন! পুরপিতা ও পুরমাতাগণ মার্জিন ! মার্জিন না বাড়ালে চলবে না।’
মানুষের ওপর ভরসা যে কম হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ভোটদাতার ওপর সামান্য ভরসাও থাকলে কি কাউন্সিলরদের এমন সেলসম্যান মাফিক টার্গেট দেওয়া যায়? কর্পোরেট টিএমসিতে এখন এটাই দস্তুর। গণতন্ত্রের গোদের ওপর দলতন্ত্রের বিষফোঁড়ার মতো, মার্জিন বাড়ানোর এ হেন নির্লজ্জ ঘোষণা প্রথম সারির কাগজের প্রথম পাতায় ছাপাও হয়ে যায় বড় হরফে।

ক্ষমতার উৎসের এমন উদাত্ত আহ্বানে যার পর নাই উৎসাহিত হয় ক্ষমতার অলিন্দ।
আইনজীবী সাংসদ ও এবারেও শ্রীরামপুরের তৃণমূল প্রার্থী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আরও একধাপ এগিয়ে ঘোষণা করেন, যে কাউন্সিলর লিড দিতে পারবে না, তার ওয়ার্ডে এমপি ল্যাডের টাকা পৌছবে না। ভাবটা এমন, এমপি ল্যাডের টাকা যেন তিনি তাঁর মক্কেলদের থেকে নিয়ে আসেন! কল্যানের এমন দৃপ্ত ঘোষণায় চকিতেই ভরসা পেয়ে যান আরও কেউ কেউ। মমতা ঘনিষ্ঠ কল্যাণের এমন অগণতান্ত্রিক ঘোষণা, তাঁদেরও ভরসা যোগায় এমন অসংসদীয় কথা বলতে।
শীর্ষ নেতৃত্বের ঘোষণা আগেই প্রমাণ করেছিল যে মা মাটি মানুষের দল মানুষের ওপর ভরসা হারিয়েছে। কল্যাণ প্রমাণ করলেন, শুধুমাত্র সাধারণ মানুষ নয়, নিজের দলের নিচু তলার কর্মীদের ওপরেও ভরসা হারিয়েছে তৃণমূল। সার্বিক ভাবে কাউন্সিলরদের লক্ষ্য করে কল্যাণ বলেন, নিজের ভোটের সময় জিতবে আর সাংসদ ভোটে ওই ওয়ার্ডেই দল হারবে, তা তো হতে পারে না। এরপরেই তাঁর হুঙ্কার, ওই ওয়ার্ডে এমপি ল্যাডের টাকা পৌঁছবে না।

কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও কি এমন বক্তব্যের সপক্ষে কোনও যুক্তি আছে? তাঁরই দলের কাউন্সিলর যদি তাঁর ওয়ার্ডে কল্যাণকে হারিয়েও দেন, (ধরেই নেওয়া যাক ভোটের বাজারে আর সবকিছুর মূল্য থাকলেও, ভোটারের কোনও দাম নেই। সে নেহাতই ফালতু।) তবে তার দায় আর যারই হোক সেই সব সাধারণ মানুষের যে নয় তা বলাই যায়।
তৃণমূলের এমনতর রিগিংয়ের একটা নামকরণ সম্ভবত দরকার। বাম আমলে বৈজ্ঞানিক, অতি বৈজ্ঞানিক সব হয়ে গেছে। মমতার হাতে রিগিং হয়েছে আরও নির্লজ্জ, নগ্ন, ন্যক্কারজনক।

এমন রিগিংয়ের নামকরণের ভার পাঠকরা নিলে মন্দ হয় না।

দেবক বন্দ্যোপাধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.