কালবৈশাখী ঝড়ের মাঝেই উনিশের উত্তাপ রোজ একটু একটু করে বাড়ছে। শুক্রবার তারই মধ্যে কলকাতা বিমানবন্দরের সাম্প্রতিক বিতর্কিত কাণ্ডের প্রসঙ্গ সরাসরি উঠে গেল সুপ্রিম কোর্টে। কেন্দ্রের তরফে প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের এজলাসে স্পষ্ট অভিযোগ জানানো হল, বাংলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তলানিতে এসে ঠেকেছে। এতোটাই যে কেন্দ্রের কোনও তদন্ত এজেন্সি আইন মেনে কাজ করতে গেলে রাজ্য পুলিশ তাদের বাধা দিচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করছে, এমনকী গ্রেফতারও করতে চাইছে।

কেন্দ্রের এই অভিযোগ শুনে দ্রুত লিখিত রিপোর্ট পেশ করার নির্দেশ দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি।
সারদা মামলায় এ দিন সুপ্রিম কোর্টে শুনানি নির্ধারিত ছিল। সিবিআই তথা কেন্দ্রের তরফে এ দিন শুনানির সময় সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহেতা বলেন, সারদা কাণ্ডে তদন্তের জন্য আরও কল রেকর্ড খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কিন্তু দুটি বেসরকারি সার্ভিস প্রোভাইডার (বিষয়টি বিচারাধীন বলে দুই সার্ভিস প্রোভাইডারের নাম প্রতিবেদনে লেখা হল না) এ ব্যাপারে সহযোগিতা করছে না। এ কথা শোনা মাত্র ওই দুই সার্ভিস প্রোভাইডারকে নোটিস পাঠানোর নির্দেশ দেন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ।

এর পরই সলিসিটর জেনারেল বিমানবন্দর কাণ্ডের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বিচারপতিদের বলেন, কলকাতা বিমানবন্দরের একটি সাম্প্রতিক ঘটনার দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। যে ঘটনা থেকে আপনারা বুঝতে পারবেন, পশ্চিমবঙ্গে আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতির কতটা অবনতি হয়েছে।

সলিসিটর জেনারেল আদালতকে জানান, গত ১৫ ও ১৬ মার্চের মাঝের রাতে কলকাতা বিমানবন্দরে থাই এয়ারওয়েজের বিমানে দুই মহিলা এসে নামেন। এঁদের মধ্যে একজন হলেন পশ্চিমবঙ্গের এক সাংসদের স্ত্রী। তাঁদের কাছে সাতটি বড় ব্যাগ ছিল। এক্স রে মেশিনে স্ক্যান করার সময় তাঁদের দুটি ব্যাগে সন্দেহজনক জিনিস দেখা যায়। তাঁদের ব্যাগ খুলতে বলেন বিমানবন্দরে দায়িত্বরত শুল্ক দফতরের কর্তারা। কিন্তু তাঁরা তা না করে পুলিশকে ডাকেন। তার পর বচসা জুড়ে দেন। পুলিশ এসে শুল্ক দফতরের কর্তাদের কাজে বাধা দেয়। তার পর রাত দুটো পর্যন্ত পুলিশের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি এমন দিকে এগোয় যে পুলিশ এক সময়ে শুল্ক দফতরের অফিসারদের গ্রেফতার পর্যন্ত করতে যায়। পরে তারা শুল্ক দফতরের বিরুদ্ধে অভিযোগও দায়ের করেছে। গোটা ঘটনাই যে সিসিটিভি ফুটেজে ধরা রয়েছে তা বার বার আদালতকে জানান সলিসিটর জেনারেল।

রাজ্যের তরফে এ দিন আইনজীবী ছিলেন কংগ্রেসের রাজ্যসভা সাংসদ অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি। সলিসিটর জেনারেল যখন এ কথাগুলি বলেন, তখন অভিষেক আপত্তি করেন। তিনি বলেন, চলতি মামলার সঙ্গে এ ঘটনার কোনও যোগ নেই, প্রাসঙ্গিকতা নেই। কিন্তু প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ তাঁকে থামিয়ে দেন। বরং সলিসিটর জেনারেলকে বলেন, গোটা ঘটনা সবিস্তার জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একটি লিখিত রিপোর্ট পেশ করতে।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, সারদা মামলার সঙ্গে বিমানবন্দরের ঘটনার কী সম্পর্ক। কেন্দ্রের আইনজীবীদের বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্টে এখন সিবিআই বনাম রাজ্য মামলা চলছে। সিবিআইয়ের তরফে আদালতে অভিযোগ জানানো হয়েছে যে, রাজ্য সরকার চিটফান্ড কাণ্ডের তদন্তের সময় কীভাবে প্রতি পদে অসহযোগিতা করেছে। কখনও কল রেকর্ড দেওয়া হয়নি, তথ্য প্রমাণ লোপাটের আশঙ্কা রয়েছে, তা ছাড়া মুখ্যসচিব থেকে রাজ্য পুলিশের ডিজি-র কাছে বারবার বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চেয়ে চিঠি লিখে কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি। সর্বোপরি কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বাড়িতে সিবিআই টিম জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গেলে, তাঁদের হেনস্থা করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, রাজীব কুমার মামলায় কদিন আগে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, সিবিআই তাঁর বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ করতে চায় তা ১০ দিনের মধ্যে হলফনামা হিসাবে আদালতে পেশ করতে হবে। তার পর এবার বিমানবন্দর প্রসঙ্গও সুপ্রিম কোর্টের দরবারে এসে পৌঁছল। সব মিলিয়ে রাজ্যে তৃণমূল সরকারের অস্বস্তি যে ক্রমশ বাড়ছে তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.