কলকাতা, ৪ মে (হি স)। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাধারণ নির্বাচনে নোটা ভোট সেখানকার কমিউনিস্ট সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। জানেন কি ইন্দোনেশিয়ায় একটি শহরে নোটা-র জেরে পুনর্নির্বাচন হয়েছিল? পশ্চিমবঙ্গের ভোটে আমরা কি আদৌ নোটা নিয়ে মাথা ঘামাই? ঘামালে কতটা?

২০১৩ সালেই সুপ্রিম কোর্ট, ভারতের নির্বাচন কমিশনকে ব্যালটে ‘নোটা’ বা ‘নান অব দ্য অ্যাবাভ’ অর্থাত ‘উপরের কাউকেই নয়’ বিকল্প রাখার অনুমতি দিয়েছে। অর্থাৎ, অংশগ্রহণকারী কোনও প্রার্থীকে পছন্দ না হলে ভোটাররা ভোটযন্ত্রে ওই বিকল্প বেছে নিতে পারেন।

’৯০-এ রাশিয়ায় নোটা ভোটের জেরে ২০০ টি আসনে নতুন প্রার্থী দিয়ে, নতুন করে নির্বাচন করতে বাধ্য হয় প্রশাসন। আগের নির্বাচনে জয় পাওয়া কমিউনিস্ট পার্টির ১০০ জনের বেশি প্রার্থী পরাজিত হন। ১৯৯২ সালে সোভিয়েতের পতনের পর বরিস ইয়েলেতসেন বলেছিলেন নোটার বিকল্পই মানুষের হাতে গণতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ এনে দিয়েছিল।
সার্বিয়ায় ২০১২ সালে নির্বাচনে লড়ে ২২,৯০৫টি ভোট পেয়ে সার্বিয়ান পার্লামেন্টে একটি আসন দখল করেছিল ‘নান অব দ্য অ্যাবাভ’ পার্টি। ইন্দোনেশিয়ার মাকাসার শহরে মেয়র নির্বাচনে শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীই ছিলেন। প্রতিপক্ষ ছিল ‘কোটাক কোসোং (ফাঁকা বাক্স)’ বা নোটা। ৩৫০০০ ভোটে জিতে যায় নোটা। ফলে ২০২০-তে পুনর্নির্বাচন হয়। 

সংরক্ষণ-বিরোধী আন্দোলনকারীদের একটি সংগঠন রাজনীতিকদের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টায় এবারের বিধানসভা ভোটের আগে নোটায় ভোট দিতে ফেসবুকে আবেদন করে। বাড়িভাড়া আইনের সুষ্ঠু রূপায়ণ, রেন্ট কন্ট্রোল থেকে প্রাপ্য আদায়ে দ্রুততা প্রভৃতির দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছে গৃহমালিকদের সংগঠন দি অল ক্যালকাটা হাউস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। তাতে সমস্যার সমাধান না হওয়ায় রীতিমত সাংবাদিক সম্মেলন করে গৃহমালিকদের নোটা-তে ভোট দেওয়ার আবেদন করেন সংগঠনের সম্পাদক সুকুমার রক্ষিত।

এতে কি আদৌ লাভ হয়েছে? এই প্রতিবেদককে সুকুমারবাবু উত্তরে বলেন, “আমরা নোটা-র আহ্বাণ জানানোয় রাজনীতিকদের কাছে একটা সঙ্কেত অবশ্যই যায়। কংগ্রেসের দীপা দাশমুন্সি একবার লোকসভা ভোটে ১৭ হাজার ভোটে হেরেছিলেন। সেবার ওই কেন্দ্রে নোটায় ভোট পড়েছিল ১৯ হাজার। নোটা-র প্রভাবে যে ওই হারজিৎ হয়নি, কে হলফ করে বলতে পারেন? এবার কোচবিহারের সাংসদ নিশীথ প্রামাণিককেও ভোটের লড়াইয়ে নামিয়েছিল বিজেপি। কোচবিহারের দিনহাটায় মাত্র ৫৭ ভোটে জিতে কোনওক্রমে মুখরক্ষা করতে পেরেছেন তিনি। প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানাধিকারীর প্রাপ্ত ভোটের শতাংশ যথাক্রমে ৪৭ এবং ৪৬.৫৮। ওই কেন্দ্রে নোটা ১৫৩৭। আর একটু হলে নোটা তো ওই কেন্দ্রে অন্য কিছু করে দিতে পারত!“

ভারতে এখনও পর্যন্ত কোনও লোকসভা বা বিধানসভা আসনে নোটা সর্বাধিক ভোট না পেলেও বিদেশের নানা স্থানে গুরুত্ব আছে নোটার। বেশ কিছু ভোটের ক্ষেত্রে নোটা নির্ণায়ক ভূমিকা নিয়েছে। ২০১৭ সালের গুজরাত লোকসভা নির্বাচনে ১১৮টি কেন্দ্রে বিজেপি ও কংগ্রেসের পরেই ছিল নোটা। গোটা রাজ্যে বিজেপি কংগ্রেস ও নির্দল প্রার্থীদের সম্মিলিত প্রাপ্ত ভোটের পরই সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিল নোটা। ২০১৮ সালে কর্নাটক বিধানসভা ভোটে সিপিআইএম বসপা-এর মতো দলগুলির থেকেও বেশি ভোট ছিল নোটার ঝুলিতে। একই বছরে মধ্যপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি কংগ্রেসের মোট ভোটপ্রাপ্তির ব্যবধান ছিল মাত্র ০.১ শতাংশ। সেখানে নোটা ভোট পেয়েছিল ১.৪ শতাংশ।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে অসম, কেরল, পুডুচেরি ও তামিলনাডুতে নোটা পড়েছে যথাক্রমে ১ লক্ষ ৫৪ হাজার ৩৯৯, ৯১ হাজার ৭১৫, ৯ হাজার ৬ এবং ১ লক্ষ ৮৪ হাজার ৬০৪। পশ্চিমবঙ্গে ৫ লক্ষ ২৩ হাজার ১। অর্থাৎ, বাকি চার রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে নোটা বেশি। দেখা যাক কোথায় নোটায় কী ধরণের ভোট পড়েছে। প্রদত্ত ভোটের ১ শতাংশের কম নোটা পড়েছে অনেক কেন্দ্রেই। এগুলোর মধ্যে আছে হাওড়ার আমতা ১ হাজার ৩০২ (০.৬২%), এন্টালি ৯৯১ (০.৬৩%), পূর্ব বর্ধমানের পূর্বস্থলী উত্তর কেন্দ্র ১ হাজার ৩৫০ (০.৬৪%), কলকাতা বন্দর ১ হাজার ৩৬০ (০.৮৯%), বালি ১ হাজার ২০৫ (০.৯৬%) প্রভৃতি।

প্রদত্ত ভোটের ১ শতাংশের বেশি নোটা পড়েছে অনেক কেন্দ্রেই। যেমন চৌরঙ্গীতে ২ হাজার ৭১৩ (১.২৭%), দমদমে ২ হাজার ৩৯ (১.১০%), কসবায় ২ হাজার ৪৭৬ (১.১১%), কাশীপুর বেলগাছিয়ায় ১ হাজার ৪৩৯ (১.১৭%), যাদবপুরে ২ হাজার ৭১৩ (১.২৭%), তারকেশ্বরে ২ হাজার ৭৫২ (১.৩৪%), হাওড়া দক্ষিণে ২ হাজার ৯৪৮ (১.৩৬%), বোলপুরে ৩ হাজার ৩৩৭ (১.৪৫%), দার্জিলিং ২ হাজার ৫৪০ (১.৫১%), আউসগ্রামে ৪০৩৯ (১.৮৬%)।

কিন্তু কোনও কেন্দ্রে নোটা-য় সর্বাধিক ভোট পড়লেও সেখানে ভোট বাতিলের কোনও সংস্থান নেই। কোনও নির্দিষ্ট কেন্দ্রে নোটা-য় সর্বাধিক ভোট পড়লে সেই কেন্দ্রের নির্বাচন বাতিলের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে একটি আবেদন জমা পড়ে। এই আর্জির পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টে এ বিষয়ে কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের মতামত জানতে চায়। গত ১৫ মার্চ প্রধান বিচারপতি এসএ বোবডে ও বিচারপতি এএস বোপান্না ও বিচারপতি ভি রামসুব্রহ্মন্যনকে নিয়ে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রক ও নির্বাচন কমিশনকে নোটিশ জারি করে এ বিষয়ে তাদের মতামত জানাতে বলে।

নোটা ভোট আপাতত নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশেরই মাধ্যম। এই ভোট দিয়ে একজন ভোটার সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের সকল প্রার্থী বা ভোটারের উপর অনাস্থা প্রকাশ করতে পারেন। গত কয়েক বছরের নোটা ভোটের ইতিহাস দেখে রাজনৈতিক দলগুলিও নড়ে চড়ে বসতে বাধ্য হচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে নোটা ভোট যদি প্রথম দুই দলের কেউ নিজেদের ঝুলিতে আনতে পারত, তাহলে ফলাফলই বদলে যেত। তাই এলাকার সমস্যা, এলাকার চাহিদা শুনতে বাধ্য হচ্ছেন দলগুলি। অর্থাৎ সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও নোটা ভোটকে গণতান্ত্রিক শক্তির প্রয়োগে সফলভাবে ব্যবহার করা যায়। অনেকে মনে করেন নোটা-তে ভোট দেওয়া মানে ভোট নষ্ট। আবার অনেকে মনে করেন, এই ধারণা একেবারেই ভুল।

হিন্দুস্থান সমাচার/ অশোক

অশোক সেনগুপ্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.