অরুনাচলের গ্রামে জিহাদী ধরনে খ্রিষ্টান মিশনারী হামলা

অরুণ + অচল …অরুণ অর্থাৎ উদীয়মান সূর্য , অচল অর্থাৎ নিশ্চল পর্বত। সেই খানে সবার আগে সূর্য আসেন রক্তআভা ছড়িয়ে। সেখানে পর্বতমালা মৌন যোগীর ন্যায় তপস্যায় লীন আছে সেই কোন সুপ্রাচীন কাল হতে। সেটা সূর্য দেবতার বাসভবন। সে এক প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য বুনটে বোনা বিস্ময়কর স্থান। পাহাড় – নদী- জঙ্গল , কত যে নাম জানা ও না জানা প্রাণীর বাস, তার মধ্যে মানুষের ভাষা -সমাজরূপ – সংস্কৃতির বহুবিচিত্র ধারা এখানে প্রবাহিত।বিচিত্র পত্র মর্মর, ঝোরা , ডুংরী , নদী  প্রস্রবণ এর বিচিত্র জলধ্বনি , কর শত পাখির কত বিচিত্র সুরেলা কুজন, ভ্রমরের গুঞ্জন , প্রাণীদের বহু স্বর সেখানে মুখরিত হয়ে সকাল সন্ধ্যায়। সে এক আজব স্থান। তাই এই স্থান “land of the dawn-lit mountains”। ভারতের সাত বোনের রাজ্য নাম না জানা অর্কিডের ভূমি। এই উদীয়মান সূর্যের এলাকা তার মধ্যে অন্যতম।এখানে এত রকমের অর্কিড পাহাড়ে, বনে ফুটে থাকে ও তাদের এত রকমেরই ঔষধি গুন যে এই সূর্যের পর্বতকে অর্কিডের স্বর্গরাজ্য বলা হয়।

সেই স্বর্গরাজ্যে আদি হিন্দু জনগোষ্ঠীর গ্রামে জিহাদী কায়দায় গতকাল আক্রমন করল খ্রিষ্টান মিশনারীরা। ভাঙচুর চালানো হল জিহাদী ধরনে,মন্দির ও দেব মূর্তি ধ্বংসের সময় মুখে তাদের উচ্চারিত হল #InTheNameOfJesus. ভয়ঙ্কর এই অত্যাচারের কথা সাধারণ মিডিয়া আমাদের চোখে সামনে না নিয়ে এলেও তার বীভৎসতা নিয়ে সরব সোশ্যাল মিডিয়ার দুনিয়া।

মিশনারী মাফিয়ারা এনজিও , মিশন ইত্যাদি  মাধ্যেমে সুবিশাল ভারতের অখন্ডতা এবং হিন্দু অখন্ডতাকে নষ্ট করতে যখন অক্ষম তখন তাদের এই জিহাদী পন্থা নেওয়া।  প্রসঙ্গত  ভারতের অশান্তি জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা এবং উত্তর পূর্ব ভারতে ভারত বিরোধী কার্যকলাপের জন্য খ্রিষ্টান মিশনারীরা অজস্র ফান্ডিং করে চলেছে। জোর করে ধর্মান্তর করা হয়েছে এবং সে বিষয়ে যখনই কেউ প্রতিবাদ করেছে তখনই চুপ করিয়ে দেওয়া হয়। যেমন – পালঘরের সাধু হত্যা।

ভারতের গির্জাগুলি ও বাম দলগুলি উভয়ই যেন ছদ্মবেশ ধরে আছে।উভয়ই ভারতীয় ঐতিহ্যের পরিপন্থী।তাদের কার্যাবলি ও কার্যপ্রণালির মধ্যেও যথেষ্ট সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়।সূক্ষাতিসূক্ষ ভাবে বিশ্লেষণ করলে উভয়েরই ভিতরকার চেহারাটা প্রকাশ্যে আসে।


সাম্প্রতিক কালে,মহারাষ্ট্রের পালঘর অঞ্চলের নিরীহ সাধুদের হত্যার ঘটনা বিশ্বের সকল হিন্দুকে গভীর ভাবে নাড়া দিয়েছে।হৃদয়ের তন্ত্রীতে আঘাত করেছে।কিছু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দু’টি গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে,”মুসলমানরা নাকি করোনা সংক্রমণ ছড়াচ্ছে” এবং ” একটি সক্রিয় কিডনি পাচার চক্র শিশুদের চুরি করছে”!এই ব্যাপারে অনেক সামাজিক গণমাধ্যমকে দোষারোপ করা হয়।কিডনি কি ফুলের মতো যে চাইলেই যে-কেউ টুক করে ছিঁড়ে নিল !এই গল্প বা গুজবের উৎস কি ? এর সত্যতাও-বা কতটুকু ?

মধ্যযুগের ইতিহাস থেকে আমরা ইসলামী প্রভাবে হিন্দুদের অবস্থার কথা জানি এবং সে বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করি ।কিন্তু তেমনি আধুনিক যুগে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের প্রভাবে এদেশের হিন্দুদের অবস্থা ঠিক কী হয়েছিল তা আমাদের আলোচনা করা একান্ত প্রয়োজন ।আজ সে বিষয়ে আলোচনা সূচিত হল।

ষোড়শ সপ্তদশ শতকে পর্তুগিজরা বাংলায় ব্যবসা বাণিজ্যের উপলক্ষে বসবাস করতে আরম্ভ করলে বাংলায় রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টধর্ম প্রচার আরম্ভ হয় । সপ্তগ্রাম ,চট্টগ্রাম ,ব্যান্ডেল, হুগলিতে পর্তুগিজরা বাণিজ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। ক্রমে এই সমুদয় স্থানে, বিশেষত হুগলিতে, বহু পর্তুগিজ ও ইউরোপিয়ানরা স্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করে । পর্তুগিজরা মরুবাসীদের মতই দস্যু প্রকৃতির ছিল। যে এলাকায় বসবাস করত সেই এলাকার মানুষদের উপর অত্যাচার করত। এছাড়াও জোর করে এলাকাবাসীকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করত।

তারা গর্ব করতো যে সমস্ত প্রাচ্য ভূখণ্ডে তারা দশ বছরে যত ভারতীয়কে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করে হুগলিতে এক বছরে তার চেয়ে বেশি লোক খ্রিস্টান হয় । কিন্তু শাহজাহানের হারেমের দুই বাঁদি কে অপহরণ করার ফলে 1632 খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজরা বিতাড়িত হয়।

পর্তুগিজ মিশনারীরা  ধর্ম প্রচারের জন্য বাংলা শিখেছিল । এরপর বাংলা ভাষায় বিভিন্ন খ্রিস্ট গ্রন্থ রচনা করত।   একটি কাহিনী প্রচলিত আছে যে,” 1783 খ্রিস্টাব্দে রচিত “ব্রাহ্মণ রোমান ক্যাথলিক সংবাদ” গ্রন্থের রচয়িতা ডোম এন্টোনিও রোজারিও নামক খ্রিস্টধর্মান্তরিত এক বাঙালি হিন্দু ঢাকার নিকটবর্তী অঞ্চলে 200000 দরিদ্র ও অন্তজশ্রেণীর হিন্দুকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করে ।

কিন্তু এদের দায়িত্বভার গ্রহণ করবে এই নিয়ে দুই পাদ্রীর মধ্যে বিবাদ সূচিত হয় এবং তার ফলে এরা সকলেই হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করে। পূর্ববঙ্গে দরিদ্র শ্রেণীর কিছু মানুষ বহু  খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। ইংরাজ রাজত্ব প্রতিষ্ঠার পূর্বে বাঙ্গালীদের মধ্যে খ্রিস্ট ধর্মের প্রভাব খুব সামান্যই ছিল।  তবে বহু পর্তুগিজ এই দেশের স্ত্রী লোকদের তুলে নিয়ে গিয়ে বা জোর করে বা ভালোবাসায় ভুলিয়ে বিবাহ করায় বৃহৎ একটি বাঙালি খ্রিস্ট সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল। 

পর্তুগীজদের পরে ইউরোপ থেকে ওলন্দাজ ও ইংরেজ কোম্পানি ভারতে এসে বাণিজ্যের প্রাধান্য  বিস্তার ঘটায় । কিন্তু তারা ধর্মপ্রচারে স বিপক্ষে ছিলেন।  যে রাজকীয় সনদের বলে ইংরেজ বা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে বানিজ্য করবার অধিকার পেয়েছিল ,তাতে স্পষ্ট নির্দেশ ছিল যে তারা ভারতে কোন রকম ভাবে মিশনারী পাঠাতে পারবে না।  

এত বাধা সত্বেও উইলিয়াম কেরি নামে একজন ইংরেজ পাদ্রী ডেন দেশীয় জাহাজে 1793 সনে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে কলকাতায় উপস্থিত হন। এই উইলিয়াম কেরি একজন দরিদ্র মুচির পুত্র ছিলেন এবং যথেষ্ট উৎসাহ ও অধ্যবসায় স্বত্বও ধর্ম প্রচারে সম্পূর্ণ বিফল হলেন। কিছুদিন পরে তাঁর আহবানে আরো চারজন ইংরেজ এক অ্যামেরিকান জাহাজে কলকাতায় পৌঁছলেন।।কিন্তু ইংরেজ গভর্নর তাদের কলকাতায় নামতে না দেওয়ায় তারা ডেন জাতি অধিকৃত শ্রীরামপুর অঞ্চলে চলে গেলেন এবং কেরি ও সেখানে তাদের সঙ্গে যোগ দিলেন ।এই রূপে কলকাতার নিকটবর্তী শ্রীরামপুরে প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টান মিশনারীদের একটি কেন্দ্র স্থাপিত হলো।

1800 সনে কৃষ্ণ চন্দ্র পাল নামে এক ছুতার মিস্ত্রির হাত ভেঙে গেলে টমাস নামে এক মিশনারি ডাক্তারের চিকিৎসায় সে আরোগ্য লাভ করে। সেই সর্বপ্রথম খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে। এর পূর্বে সাত বছরের মধ্যেও একটি বাঙালি হিন্দু কেও কেউ খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে পারেনি ।সুতরাং এই ঘটনায় সমস্ত মিশনারীরা আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে এবং টমাস উন্মাদের মত আচরণ করতে শুরু করে। ফলে তাকে পাগল বলে আটক করে রাখা হয়।

বিলেতে একদল লোকের চেষ্টায় ভারতে ইংরেজ মিশনারীদের ধর্ম প্রচারে যে নিষেধাজ্ঞা ছিল 1814 রহিত করা হয়। সুতরাং শ্রীরামপুরের প্রোটেস্ট্যান্ট মিশনারিদের ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্র বাংলায় এবং বাংলার বাইরে বিস্তার লাভ করে। 1818 সনে 126 টি দেশীয় ভাষা শিক্ষার বিদ্যালয়ের প্রায় 10 হাজার ছাত্র পড়ত। তারা সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে খ্রিস্ট ধর্ম শিক্ষা লাভ করত । 1821 শ্রীরামপুর কলেজের প্রতিষ্ঠা হয়।

 1814 সনের পর থেকে ব্যাপক হারে missionary এই বঙ্গে আসতে শুরু করে ।কলকাতায় একজন পাদ্রী নিযুক্ত হলেন । এর ফলে প্র এবং প্রধানত বিদ্যালয় , হাসপাতাল এগুলির দ্বারা  দরিদ্র শ্রেণীর হিন্দুরা প্রলুব্ধ হয়ে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করল। কিন্তু তাদের সংখ্যা খুব বেশি হয়নি।

 1817 হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠা হয় এবং 1835 সরকারি নতুন ব্যবস্থা ইংরেজি শিক্ষার প্রসারের ফলে উচ্চ শ্রেণীর হিন্দুদের মধ্যে খ্রিস্ট ধর্মের প্রতি আশক্তি বৃদ্ধি পায় । মধুসূদন দত্ত , কৃষ্ণমোহন বন্দোপাধ্যায় খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে।

পূর্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃপক্ষ এ দেশে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের বিরোধী ছিলেন ক্রমে ক্রমে তাদের মত সম্পূর্ণ পরিবর্তন হইল a company দেওয়া হলো তাতে মিশনারীদের এদেশে বসবাস ও ধর্ম প্রচারের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করা হলো এ দেশে আসতে শুরু করল ও কর্মচারীগণ পরোক্ষভাবে হিন্দু ধর্মের সমর্থন করে আসছিল তার বিরুদ্ধে তারা বিরোধিতা করতে শুরু করল ।

এক্ষেত্রে বলে রাখি এর পূর্বে ইংরেজ সরকার পক্ষ থেকে, কিন্তু হিন্দু মন্দিরের ভার গ্রহণ করা ,অনাবৃষ্টি হলে তার নিবারনের জন্য ব্রাহ্মণদের দ্বারা পুজো করানো ,সরকারী দলিলপত্র শ্রী লেখা ,গনেশ নাম উচ্চারণ করা ,হিন্দুদের নানা ধর্মউৎসবে সরকারি কর্মচারীদের যোগদান দেওয়া এবং সেই উপলক্ষে শোভাযাত্রা সামরিক বাদ্য বাজানো, হিন্দু উৎসব উপলক্ষে কামান দাগা ইত্যাদি কার্যাবলী গুলো হতো।

মিশনারি গনের আন্দোলনের ফলে বিলেতের কর্তৃপক্ষ আদেশ দিলেন যে সরকারি কর্মচারীরা হিন্দু ধর্মের সঙ্গে কোনো সম্বন্ধ রাখতে পারবেন না । সরকারের নির্দেশ ছিল যে সরকারি কর্মচারীরা ধর্ম বিষয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবে। কিন্তু কার্যত এই সরকারি কর্মচারীরা খ্রিস্টান ধর্মের জন্য নানাভাবে মিশনারীদের সাহায্য করতে বাধ্য থাকবে ।
এ বিষয়ে উদার মতাবলম্বী রাজা রামমোহন রায় যা লিখেছিলেন তা বিশেষ প্রণিধানযোগ্য :
“গত 20 বছর যাবত ইংরেজ মিশনারিরা প্রকাশ্যে নানাভাবে হিন্দুদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করতে চেষ্টা করছে। 
প্রথমত: ছোট বড় নানা গ্রন্থ রচনা করে, এই ধর্মের নিন্দা করে হিন্দু দেবতা ও মহা পুরুষদের প্রতি গালিগালাজ করে ,ব্যঙ্গোক্তি করে তা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করছে।

দ্বিতীয়ত, এদেশীয় লোকের গৃহের সম্মুখে এবং রাস্তায় দাঁড়িয়ে নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠতা এবং অন্য ধর্মের হীনতা চার করা ।
তৃতীয়: নিম্ন শ্রেণীর লোককে অর্থলোভে বা অন্য কোন স্বার্থের আশায় খ্রিস্টান হলে তাদের ভরণপোষণও চাকরির ব্যবস্থা করা হবে, এই ভাবে  অপরকে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণের উৎসাহ দান ।
সত্যি বটে যিশুখ্রিস্টের শিষ্যরা  নানা দেশে ধর্ম প্রচার করত । কিন্তু মনে রাখতে হবে যে তারা ওই সমুদয় দেশে রাজত্ব করত না।

 যদি ইংরেজ মিশনারীরা  তুরস্ক, পারস্য ইত্যাদি অধিক নিকটবর্তী যে সব দেশ ইংরাজ ও খ্রিস্ট অধীন নয় সেই দেশে ধর্ম প্রচার করতো তাহলে বুঝতাম যে , যীশুর অনুচরগনের ন্যায়  ধর্ম সাধনাই  তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ।
কিন্তু যে বাংলা তথা ভারতে ইংরেজ রাজা এবং ইংরেজের নামে ভয়ে মানুষ কম্পমান সেই দেশের দরিদ্র  ভীরু অধিবাসীদের ধর্ম বিষয়ে স্বাধীন অধিকারে কোনো প্রকার  হস্তক্ষেপ ভগবান বা মানুষের কাছে ন্যায় সঙ্গত বলে বিবেচিত হবে না।

কারণ জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিরা তাদের অপেক্ষা কম শক্তিশালী কারো মনে আঘাত দেওয়া অন্যায় মনে করেন বিশেষত এই সমস্ত দুর্বল লোকেরা যদি তাদের অধীনস্থ হয় তবে তারা এদের কষ্ট দেওয়ার কথা কল্পনাও করতে পারেন না।
মিশনারীরা হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে কিরূপ মনোভাব পোষণ করতেন তা রেভারেন্ড আলেকজান্ডার ডাফ প্রণীত একখানি গ্রন্থে নিম্নলিখিত উক্তিতে তা বোঝা যাবে : “অধঃপতিত মানবের কুবুদ্ধি হইতে যে সকল অসত্য ধর্মমতের উদ্ভব হয়েছে তার মধ্যে হিন্দুধর্ম সর্বাপেক্ষা বিশাল। জগতে যত মিথ্যা দ্বন্দ্ব আছে তাদের মধ্যে হিন্দু ধর্মই সর্বাপেক্ষা অধিক পরিমাণ এবং অধিকারে প্রকারে ভগবানের প্রচারিত সত্যের বিরোধী মত ও উক্তি স্থান পেয়েছে।”

মিশনারিদের বিদ্যালয় গুলি যে প্রধানত খ্রিস্টধর্ম প্রচারের কেন্দ্র রূপে কল্পিত হয়েছিল সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই । 1822 সালে এক ইংরেজি পত্রিকায় লেখা হয়েছে “যে সমস্ত ছাত্ররা এখন পুতুল পূজার নেয় অপবিত্র গর্হিত আচরণে অভ্যস্ত , তারা এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার প্রভাবে ভগবান ও তার প্রেরিত যীশু সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান লাভ করবে। “
 মিশনারি বালিকা বিদ্যালয় গুলিতেও প্রকাশ্যে খ্রিস্ট ধর্মের শিক্ষা দেওয়া হতো। হিন্দু ছাত্রীদের অন্নপূর্ণা , বিষ্ণুপ্রিয়া ইত্যাদি নাম উল্লেখ করে একজন মিশনারি মন্তব্য করেছেন “ব্যভিচারিণী, ইন্দ্রিয়পরায়ন যেসব কাল্পনিক দেবীর যে সব ক্রুরতা ও কামুকতা র কুৎসিত কাহিনী হিন্দুদের ধর্ম গ্রন্থেই লিপিবদ্ধ আছে তাদের নামে পিতামাতারা যে সন্তানের নাম রেখেছেন তাদের নিকট সৎ আচরণ কি করে  প্রত্যাশা করা যায়।”

মিশনারীরা যে ছলে বলে তরুণ বালকদের কে খ্রিস্টান করতেন এর অভিযোগ সে সময়ের সংবাদপত্রে প্রকাশিত হতো ।  1833 খ্রিস্টাব্দের 6 জুলাই “সমাচার চন্দ্রিকা” এ এক পত্র প্রেরক লিখেছিলেন যে,  তাকে না জেনে তার পুত্র মিশনারি স্কুলে পড়ছে এই সংবাদ পেয়ে তিনি তার পুত্রকে বাড়িতে আটকে রেখে ছিলেন। পরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে  তার উক্তি উদৃতি করছি:

“কিঞ্চিৎ কাল  পরে অপকৃষ্ট ক্রিষ্টা বান্দা নামক পাতি ফিরিঙ্গি একজন গত স্নানযাত্রা দিবসে আমার বোন হুগলির বাড়িতে যাইয়া ওই ১৪ বৎসর বয়স্ক বালককে ছল করিয়া আনিয়া বগি গাড়িতে আরোহন করাইলো। বালক শিক্ষকের বশীভূত হইয়া তৎসমভিব্যাহারে গেল তখন আমার গৃহে পুরুষ মাত্র ছিলনা।  কিন্তু যখন কলিকাতা অভিমুখে বগি চলিতে লাগিল তখ বালক শীৎকার ধ্বনি করিয়া গ্রামের লোক কে কহিল ‘তোমরা আমার পিতাকে সংবাদ দিবা আমাকে ক্রিস্টা বান্দা ধরিয়া লইয়া যায়।তৎপরে কয়েক দিবস  আমি তত্ত্করত ওই পাঠশালায় আছে জানতে পরিয়া বাটী মধ্যে প্রবিষ্ট হওনের চেষ্টা করিলাম । কোনোমতে প্রবিষ্ট হইতে পারিলাম না । পরে পোলিশে নালিশ করিলাম,কিন্তু  ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব তাতে মনোযোগ করিলেন না । আমার বালককে ছাড়িয়া দিতে হুকুম দিলেন না ।”

এরপরে তিনি লিখেছিলেন যে , মিশনারীরা এই প্রকার দৌরাত্ম্য করছে এবং এরম আরো চারটি বালককে অপহরণ করে খ্রিস্টান করেছে তাদের নাম ও পরিচয় দিয়ে হিন্দুদের মিশনারিদের দমনের চেষ্টা করতে উপদেশ দিয়েছেন।

ডাফ সাহেব তার যেসব প্রবন্ধ ও গ্রন্থে হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে পূর্বলিখিত নিন্দাবাদ করেছেন তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় তাঁর তীব্র প্রতিবাদ প্রকাশিত হয় । তাঁর স্কুলের একজন ছাত্র ও তার স্ত্রী খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করায় কলকাতায় তুমুল আন্দোলন হয়েছিল এবং স্বয়ং দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে হিন্দুগন খ্রিস্টান করার বিরুদ্ধে দলবদ্ধ হয় ।
https://twitter.com/DhakadShadev/status/1280489939457769479?s=19

এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে তাদের চেষ্টা সফল হয়েছিল  বলপূর্বক খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা দেবার দৃষ্টান্ত এরপর থেকে অনেক কমে গিয়েছিল। মিশনারীদের বিদ্যালয়গুলোই এরূপ ধর্মান্তর গ্রহণের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।
 এর ফলে 1845 সালে একটি স্কুল স্থাপিত হলো। হিন্দুরা ইংরাজি শিক্ষা গ্রহণে সচেষ্ট হয়ে উঠল।হিন্দু ছাত্র এখানে বিনা বেতনে পড়তে পারতো ।
কিন্তু শত চেষ্টা সত্ত্বেও উচ্চ-মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত হিন্দুদের উপর খৃষ্টধর্ম বিশেষ কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। 

সাভারকার এর রচনাতে হিন্দুদের উপর মুসলিমদের অত্যাচারের কথা যেমন রয়েছে তেমনি আছে হিন্দুদের ওপর খ্রিস্টান আক্রমণের কাহিনী। তিনি ” খ্রিস্টানদের হিন্দু বিরোধী অভিযানের শুরু ” গ্রন্থে লিখেছেন যে , খ্রিস্টীয় পুরাণ অনুসারে প্রথম শতাব্দীতে সিরিয়াতে যখন খ্রিস্টান ধর্ম প্রচার শুরু হয় তখন ইহুদিরা নাজারেথের যীশু কে ক্রুশবিদ্ধ করেছিল এবং জোর করে ইহুদী ধর্ম বিনষ্ট করার প্রতিবাদে  তারা খ্রিস্টানদের উচিত শিক্ষা দিতে শুরু করেছিল ।
এই সময় তারা ভারতে আসার পথের কথা জানত তারা ভারতে পালিয়ে আসে এবং জামরিয়ার রাজার কাছে আশ্রয় ভিক্ষা করে ।
হিন্দু রাজার পক্ষেই বিদেশীদের উপর কোন শর্ত আরোপ না করে নিজের উপকূলে নামতে দেওয়া সেদিন উচিত হয়নি। কিন্তু হিন্দু জাতি সদ্গুণ সমূহের বিকৃতির যে ব্যধিতে ভুগছে তা থেকে সেদিনের মালাবার সম্রাটও মুক্ত ছিলেন না। তিনি তাঁর রাজ্যের একটি এলাকায় এই সিরিয়ান খ্রিস্টানদের বসবাসের ব্যবস্থা করে দিলেন।
 তিনি তাদের গ্রাম পঞ্চায়েতের ভীতর এক স্বতন্ত্র জাতি রূপে বসবাসের অধিকার দিয়ে তাম্রপত্ত লিখে দিলেন। 
ধীরে ধীরে এই সিরিয়ান খ্রিস্টানরা লক্ষ্য করলো যদি হিন্দুদের কেউ তাদের সাথে পানভোজন করে তাহলে সে জাতিচ্যুত হচ্ছে । দেখে শুনে তারা নিজ মূর্তি ধারণ করল এবং এই সুযোগ নিয়ে ধীরে ধীরে খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারের অশুভ উদ্যোগ শুরু করল ।
প্রথম শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে একজনও খ্রিষ্টান ছিল না । কিন্তু ভারতে হিন্দুদের কপটতা পূর্বক খ্রিস্টানি করন শুরু হয়ে গিয়েছিল। ইংল্যান্ডে খ্রিস্টান ধর্ম কিভাবে প্রচারিত হয়েছিল তা হিন্দু মাত্রেই পাঠ করা উচিত ।। স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে শত্রুর ধর্মান্তর অভিযান পরিচালনায় পোষকতা করার মতো সুযোগ আমাদের ধর্মে প্রায় 2000 বছর আগে থেকে বিদ্যমান ছিল।
এই সব সিরিয়ান খ্রিস্টান মিশনারীরা লক্ষ্য করেছিল কোন একটি অঞ্চলে হিন্দুরা একটি সরোবর পবিত্র গণ্য করে সেখানে স্নান করে ,জলপান করে।তাদের মনে এই ধারণা জন্মেছিল, হিন্দুরা যখন খ্রিস্টানদের সঙ্গে পানভোজন করলে নিজেদের ধর্মভ্রষ্ট বলে গণ্য করে তবে ওই স্থানে ও তারা সেই সুযোগ নিয়ে সব হিন্দুদের ধর্মভ্রষ্ট  করে খ্রিস্টান করতে পারবে।

এই চিন্তা করে তারা হিন্দু দের দ্বারা ব্যবহৃত সরোবরে গোপনে যেতে শুরু করল এবং সেখানে স্নান ও জল পান করতে শুরু করল। তারপর কিছুদিন অতীত হলে মিশনারীরা হিন্দু সমাবেশে বক্তৃতা  দিতে শুরু করলো। তারা বলল, ” হিন্দুরা, তোমরা দেখো আমরা হচ্ছি খ্রীষ্টান ,হিন্দু নই । তোমাদের সঙ্গে ওই একই সরবরে স্নান করছি ,তার জল ব্যবহার করছি।  আমাদের খ্রিস্টান দেবতার উপাসনা করে আমরা আমাদের প্রভুর চরণোদক পান করছি আর সেই জল তোমরাও শ্রদ্ধাভরে পান করছো।
ফলত,  তোমাদের হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী হিন্দুধর্ম অনুযায়ী তোমরা যারা সেই জল পান করছ ,তারা খ্রিস্টান হয়ে গেছ। তোমাদের ধর্মে সে কথা বলা থাকে। কাজেই তোমরা সকলেই খ্রিস্টান হয়ে গিয়েছো ।

 তোমাদের অন্য ভাইরা যাতে প্রবঞ্চিত না হয়, তার জন্য আমাদের মত ধার্মিক খ্রিস্টানরা ওই সত্য প্রচার করে দিলাম। এ সংবাদ বিভিন্ন গ্রামে অল্পকালের মধ্যে প্রচারিত হয়ে যাবার পর হইচই শুরু হয়। অন্যান্য হিন্দুদের ধর্ম বর্ণ কারি তাদের হিন্দু ধর্ম থেকে বহিস্কার করে দেয় ।সেই সব গ্রাম শহর সামাজিক দিক থেকে হিন্দু ধর্ম হতে বহিষ্কৃত হয় খ্রিস্টান গ্রাম শহর বলে গণ্য হতে শুরু করে।

সেন্ট জেভিয়ার নামে একজন ওইসব অঞ্চলে খ্রিস্টানী করণে এমনই সকল সফল হয়েছিল, এটা কি তাতে সে বিশেষ আনন্দিত হয়েছিল । এ বিষয়ে সাভারকার লিখেছিলেন , “যে কোন মিশনারিকে দেখতে পেলে হিন্দুরা গ্রাম ছেড়ে এদিক ওদিক পালাতো । যে সব হিন্দুরা খ্রিস্টান হতে অস্বীকার করতো তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হতো । ফলে বহু হিন্দু মঠাধীশ ,পুরোহিতরা নিজও নিজও বিগ্রহ কে নিয়ে গোয়া ছেড়ে পলায়ন করে । 

সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার 1543 খ্রিস্টাব্দে সোসাইটি অফ রোমের নিকট লিখেছিল, ” আমি যেখানে মূর্তিপূজার সংবাদ পাই সেখানে একদল ছেলেকে নিয়ে যাই। তারা সেই মূর্তিপূজা ও পুরহিত ও অন্যান্যদের অপমান জনক কথা বলে গালি দিয়ে অতিষ্ঠ করে তোলে। ছেলেরা পরে সেদিকে ছুটে যায় ও থুতু দিয়ে পূজা স্থল অপবিত্র করে তোলে।

রোমে লেখেন, ” কোচিং থেকে 27 শে জানুয়ারি 1545 খ্রিস্টাব্দে পুনরায় সবাই ধর্মান্তরিত হয় , তখন আমি তাদের মিথ্যা দেবতার মন্দির ভেঙে ফেলার নির্দেশ দি।”
জে. সি. ব্যারেন্ট নামক জনৈক গোয়ানিজ ঐতিহাসিক লিখেছেন,” শান্তি ও প্রেমের ধর্ম এর নামে ইউরোপের যে   নিষ্ঠুরতার সহকারে ইনকুইজিশনের অনুষ্ঠিত হতো ভারতে তার থেকে বহুগুণে বেশি নিষ্ঠুর আচরণ প্রদর্শিত হয়েছিল।”

 ইনকুইজিশনের বিচারকদের একটি কথাই হচ্ছে মৃত্যুদণ্ডের নামান্তর। তাদের একটি অঙ্গুলিহেলনে সমগ্র এশীয় অঞ্চলে বিরাট জনতার মাঝে আতঙ্ক নেমে আসত। তারা অত্যন্ত তুচ্ছ অজুহাতে মানুষের উপর ভয়াবহ নির্যাতন করত কিংবা জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করতো।
ইনকুইজিশন কি ভয়াবহ জিনিস তা নিশ্চয়ই অধিকাংশ পাঠকই জানেন। স্পেনের ইনকুইজিশন তো ভুবনবি(কু)খ্যাত। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে এই উপমহাদেশেও ইনকুইজিশন ছিল আর সেটি ছিল গোয়ায়। পাঠক অনুমান করতে পারেন কে এই ইনকুইজিশনের উদ্যোক্তা? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন তিনি আর কেউ নন, সেন্ট জেভিয়ার। 

ভারতবর্ষে এসে তিনি বুঝতে পারেন খ্রিস্টধর্ম এখানের মানুষের মনে কোন স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারে নি। বেশিরভাগই জোরজবরদস্তির ফলে বা রাজনৈতিক কারণে খ্রিস্টান হয়েছে। পুরনো ধর্ম ও রীতি-নীতির প্রতি এদের রয়েছে গভীর আকর্ষণ। তাই এদেরকে প্রকৃত খ্রিস্টান করে গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন ইনকুইজিশনের মত ভয়ঙ্কর ও কার্যকরী ব্যাবস্থা। 

তাই তিনি ১৫৪৫ সালের ১৬ মে পর্তুগালের রাজাকে চিঠি লেখেনঃ”খ্রিস্টানদের জন্য দ্বিতীয় জরুরী জিনিসটি হচ্ছে এখানে যেন পবিত্র ইনকুইজিশন স্থাপন করা হয় কারণ এখনও অনেকেই ইহুদি এবং মুসলিম আইন অনুসারে জীবনযাপন করছে। তাদের মনে ঈশ্বরের কোন ভয় নেই বা কোন চক্ষুলজ্জাও নেই। যেহেতু এই দুর্গের বাইরে এমন অনেকেই রয়েছে তাই প্রয়োজন পবিত্র ইনকুইজিশন ও প্রচুর ধর্মপ্রচারকের। রাজা যেন তার ভারতের বিশ্বস্ত ও বিশ্বাসী প্রজাদের জন্য এইসব জরুরী জিনিসের ব্যাবস্থা করেন।” 

পর্তুগালের রাজা ও পোপের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকার কারণে ইনকুইজিশন তখনই স্থাপন করা সম্ভব হয় নি কিন্তু জেসুইটদের অব্যাহত চাপের ফলে ১৫৬০ সালে এর কার্যক্রম শুরু হয়। যদিও এর প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল নব্য খ্রিস্টানদের শাস্তি দিয়ে ও ভয় দেখিয়ে “প্রকৃত খ্রিস্টান” বানানো কিন্তু ক্রমে এর শিকার হয় স্থানীয় হিন্দু, মুসলিম, ইহুদি সবাই। খ্রিস্টান যাজকেরা প্রতিটি পাড়ায় নজরদারি করে বেড়াতেন ও কাউকে বিন্দুমাত্র সন্দেহ হলে ধরে এনে অকথ্য নির্যাতন চালানো হত। 

এমনকি অনেক ইউরোপিয়ানকেও ইনকুইজিশনের শাস্তি ভোগ করতে হয়েছে। এদের মধ্যে একজন হলেন ফরাসি পরিব্রাজক ডাক্তার চার্লস ডেলন যিনি ১৬৭৪ থেকে ১৬৭৭ সাল পর্যন্ত ইনকুইজিশনে বন্দী ছিলেন। তিনি তার এই কষ্টের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন তার লেখা বইয়ে। 

তার এই বর্ণনার কথা উঠে এসেছে ডক্টর ক্লডিয়াস বুকাননের লেখা Christian Research In India বইয়েও যা প্রকাশিত হয় ১৮১২ সালে। উল্লেখ্য যে ১৫৬০ থেকে ১৮১২ সাল পর্যন্ত এই গোয়া ইনকুইজিশন চলে। বুকানন ১৮০৮ সালে গোয়া যান এবং স্বচক্ষে দেখেন ইনকুইজিশনের সুবিশাল হল, বিচারকক্ষ, বন্দীশালা এবং যেখানে বন্দীদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হত।

কিন্তু ঠিক কত লোককে পুড়িয়ে মারা হয়েছিলো বা অন্যান্য শাস্তি দেয়া হয়েছিলো তার সঠিক কোন রেকর্ড পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে সমস্ত নথিপত্র ক্যাথলিক চার্চ খুবই সতর্কতার সাথে গোপন করে গেছে। ১৮১২ সালের ২০ ডিসেম্বর গোয়ার ভাইসরয় পর্তুগালের রাজার কাছে ইনকুইজিশন সংক্রান্ত নথিপত্র পুড়িয়ে ফেলার আবেদন জানিয়ে একটি চিঠি লেখেন। তাকে একাজ করতে নিষেধ করা হয় এবং টমাস নরিনহো নামে একজন পাদ্রীকে নিয়োগ দেয়া হয় উক্ত নথিপত্র থেকে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সংগ্রহ করতে। পরে ওই নথিপত্রের কি হয় তা আর জানা যায়নি। তবে স্পেন ও পর্তুগাল ইনকুইজিশনের রেকর্ডের সাথে তুলনা করে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে প্রচুর মানুষ এখানে বিনা অপরাধে প্রাণ দিয়েছে, অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হয়েছে এবং প্রত্যক্ষ করেছে ধর্মের নামে মানুষ কত নিচে নামতে পারে। গোয়া ইনকুইজিশন সম্পর্কে বিশ্বখ্যাত মনীষী ও মুক্তচিন্তক ভলতেয়ারের একটি উক্তি রয়েছে-
“Goa is sadly famous for its Inquisition, equally contrary to humanity and commerce. The Portuguese monks made us believe that the people worshipped the devil, and it is they who have served him.” -Voltaire
সেন্ট জেভিয়ার্স এবং তার পরবর্তী পাদ্রীরা হিন্দুদের উপর দীর্ঘকাল ধরে কী অবর্ণনীয় অত্যাচার করেছিল তা লেখক ওই গ্রন্থে স্থানাভাবে উল্লেখ করতে পারেনি বা হয়ত চাননি।

 কারণ গ্রন্থটি ভারতের ইতিহাস নয় ইতিহাসের সমীক্ষা মাত্র।
 গ্রন্থাকার ওই কথা বলার পর  আরো বলেছেন , ” উত্তর ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের হিন্দুদের শুধু মুসলিম অত্যাচার ও ধর্মীয় আক্রমণের মোকাবেলা করতে হয়েছিল । কিন্তু বিন্ধ পর্বতের দক্ষিণ থেকে রামেশরম অবধি  হিন্দুদের তৎকালীন দক্ষিণ ভারতের পাঁচটি মুসলমান রাজ্যের নির্মম অত্যাচার সহ্য করা ছাড়াও , তাদের চাইতে অধিক ও নিষ্ঠুর ও বর্বর নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল।
 খ্রিস্টান করার জন্য তাদের অত্যাচার ছিল সীমাহীন । সেই হৃদয়বিদারক কাহিনী কেউ পাঠ করতে চাইলে ডক্টর এন্ডনীও নারোহা রচিত ” Os Hindus De Goa Republica Porty Guese”   গ্রন্থ পাঠ করে দেখবেন। ইতিহাসে পর্তুগিজ পাদ্রীদের ভয়াবহ অত্যাচার কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। সেসব কাহিনীর কাছে মুসলিম অত্যাচারের কাহিনী ম্লান হয়ে যায়।

১৫৪৪ সালে  ত্রিবাঙ্কুর রাজ্যের রাজপুত্রদের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে ঝগড়া শুরু হয়। প্রত্যেকেই পর্তুগিজদের সাহায্য চাইছিল জেতার জন্য। তখন গোয়ার গভর্নর জেভিয়ারকে কুইলনের তিরুবতী রাজার সভায় নিযুক্ত করেন। রাজা বলেন যে পর্তুগিজদের সাহায্যের বিনিময়ে তিনি আর্থিক অনুদান ও মালাবার উপকূলের জেলেদের ধর্মান্তরিত করতে দিতে রাজি আছেন। 
জেভিয়ার এতে রাজি হয় ও মালাবার উপকূলে চলে আসে। যেসব জেলেরা ধর্মান্তরিত হতে রাজি হয়নি বা পরে ধর্মত্যাগ করে তাদের হুমকি দেয়া হয় যে পর্তুগিজরা তাদের নৌকা আটক করে রাখবে এবং মাছ ধরতে দেবে না। অন্যদের ভয় দেখাবার জন্য কয়েকজনের উপর এই শাস্তি প্রয়োগও করা হয়। এখানেও জেভিয়ার আগের মতই ভয়ানক মূর্তি ও মন্দিরবিদ্বেষী ভূমিকা রাখেন। 

গরীব জেলেরা এসবের প্রতিবাদ করতে পারত না কারণ এই সাধুকে সাহায্য করার জন্য তার পর্তুগিজ জলদস্যু বন্ধুরা হাতের কাছেই ছিল। জেভিয়ার যে এসব কাজে প্রচুর আনন্দ পেতেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৫৪৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি the Society of Jesus সংঘের প্রতি তার লেখা চিঠিতে-“দীক্ষাস্নান হওয়ার পরে নব্য খ্রিস্টানেরা ঘরে ফিরে যায় এবং তাদের স্ত্রী ও পরিবারকে নিয়ে আসে তাদের দীক্ষিত করার জন্য। সবাইকে দীক্ষিত করার পর আমি নির্দেশ দেই মিথ্যা দেবতাদের মন্দিরগুলি ধ্বংস করার জন্য ও মূর্তিগুলি ভেঙ্গে ফেলার জন্য। আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবোনা আমার কেমন আনন্দ হয় যখন আমি দেখি যে যারা একসময় এসব মূর্তির উপাসনা করত তারাই এখন এসব মূর্তি ভাঙছে।”
ধর্মপ্রচারের এই “মহান” কাজে জেভিয়ারের সহযোগী ছিলেন রোম কর্তৃক নিযুক্ত ভারতের ভিসার জেনারেল(ধর্মরক্ষক)মিগুয়েল ভাস। জেভিয়ারের সাথে পরামর্শ করে তিনি ১৫৪৫ সালের নভেম্বরে পর্তুগালের রাজার কাছে এক বিশাল চিঠি লেখেন। এতে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য ৪১ দফা পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে ৩ নম্বর দফাটি হল- “আমরা সবাই যেহেতু জানি যে পৌত্তলিকতা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে এক জঘন্য অপরাধ তাই এটাই উচিত হবে যে আপনার রাজ্যের কোন এলাকায় এমনকি সমগ্র গোয়ায় যেন কোন প্রকাশ্য বা গোপন মন্দির না থাকে এবং মন্দির তৈরি করার জন্য কঠিন শাস্তির ব্যাবস্থা করা হয়। কোন কর্মচারী যেন কোন ধরণের মূর্তি তৈরি করতে না পারে, তা পাথর, কাঠ, তামা বা অন্য যেকোনো ধাতুই হোক না কেন……এবং সেন্ট পল’স কলেজের দায়িত্বে যারা আছে তাদেরকে যেন ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য হিন্দুদের ঘর তল্লাসি করার ক্ষমতা দেয়া হয় যদি তাদের এমন সন্দেহ হয় যে ওইসব ঘরে মূর্তি আছে।” (Joseph Wicki, Documenta Indica, Vol. 1) 

এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে রাজা ১৫৪৭ সালের ৮ মার্চ গোয়ার ভাইসরয়কে নির্দেশ দেন সমস্ত মন্দির ভেঙ্গে ফেলতে। তবে মন্দির ধ্বংসের এই প্রক্রিয়া যে আগে ছিলনা এমন কিন্তু নয়। খ্রিস্টান যাজক ও পুরোহিতরা নিজ উদ্যোগেই স্ব স্ব এলাকার মন্দির ধ্বংস করতে উৎসাহী ছিলেন। শুধু ১৫৪১ সালেই ধ্বংস হওয়া ১৫৬টি মন্দিরের তালিকা পাওয়া যায় Tomba da Ilha des Goa e das Terras de Salcete e Bardes বইটিতে যার লেখক Francisco Pais আর বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৫২ সালে। 
তবে রাজার আদেশের পর ধ্বংস প্রক্রিয়া নতুন গতি লাভ করে। History of Christianity in India, Vol. 1 অনুযায়ী সালসেতে ২৮০টি মন্দির ও বারদেজে ৩০০টি মন্দির ধ্বংস করা হয়। বাসেইন, বান্দ্রা, থানা এবং বোম্বেতে ধ্বংস করা মন্দিরের কোন হিসেব পাওয়া যায় না। তবে মিশনারি নথিপত্রে বেশ কিছু মন্দিরকে গির্জায় পরিবর্তিত করার উল্লেখ পাওয়া যায়। 

সেভিওন এবং নেভেন দ্বীপে অনেক মন্দির পুড়িয়ে দেয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। এমনকি কারো বাসায় দেব-দেবীর ছবি বা মূর্তি রাখাও নিষিদ্ধ ছিল এবং নিষেধ অমান্যকারীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হত। শুধু তাই নয়,পর্তুগিজ এলাকার বাইরে কোন মন্দিরে আর্থিক অনুদান দিলে বা তীর্থযাত্রায় গেলেও প্রচুর জরিমানা দিতে হত ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হত।
স্থানীয়দের উপর চাপানো বৈষম্যমূলক আইনগুলি কেমন ছিল তার কিছু উদাহরণ নিচে দেয়া যেতে পারেঃ

১)ব্রাহ্মণদের বন্দী ও ক্রীতদাস করা হত বা নির্বাসন দেয়া হত।২)যেসব হিন্দুরা ধর্মান্তরের ভয়ে তাদের পরিবার পরিজনকে অন্য এলাকায় পাঠিয়ে দিত তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হত।৩)হিন্দু রীতি-নীতি ও উৎসব পালন নিষিদ্ধ ছিল।৪)হিন্দু পুরোহিত ও যাজকদের শাস্ত্রীয় ক্রিয়াকর্ম করা নিষিদ্ধ ছিল।৫)হিন্দুদেরকে গির্জার ভাষণ শোনার জন্য বাধ্য করা হত।৬)পারিবারিক ঐতিহ্য ও সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হত।৭)অনাথ হিন্দু শিশুদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হত।৮)হিন্দুদের ঘোড়ায় বা পালকিতে চড়া নিষিদ্ধ ছিল।
উপরোক্ত বৈষম্যমূলক নিয়মগুলি অন্যান্য স্থানীয় অখ্রিস্টান অধিবাসীদের জন্যও প্রযোজ্য ছিল তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও পৌত্তলিক হওয়ায় হিন্দুদের উপর এর প্রভাব সবথেকে বেশি পড়েছিল। একইভাবে ধর্মান্তরিত খ্রিস্টানদের দেয়া হত নানা সুযোগ সুবিধা। তাদের ভূমি কর ১৫ বছরের জন্য মওকুফ করে দেয়া হত। সরকারি উচ্চপদগুলিতে তাদের নির্বিচারে নিয়োগ দেয়া হত। এভাবে ধর্মকে ব্যাবসার মত লাভজনক করে তুলেছিল জেভিয়ার ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা।

ভারতবর্ষের এই সাফল্যের পর জেভিয়ার এবার প্রাচ্যের অন্যান্য রাজ্যগুলির দিকে নজর দেয়। সে ১৫৪৫ সালের সেপ্টেম্বরে মালাক্কায় আসে এবং পরবর্তী দুবছর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ধর্মপ্রচার করে। এখানেই তার দেখা হয় একজন জাপানী পলাতক খুনের আসামী আনজিরোর সাথে। 

আনজিরো খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে এবং জেভিয়ারকে বোঝায় যে জাপানের ধর্ম খ্রিস্টধর্মের মতই ও জাপানীরা খুব সহজেই যীশুকে গ্রহণ করবে। জেভিয়ার তাকে ১৫৪৮ সালে গোয়ায় নিয়ে আসেন এবং মিশনারি হিসেবে প্রশিক্ষণ দেন। দাগী আসামীদের নিজের স্বার্থে ব্যাবহার করা চার্চের বহু পুরনো কৌশল। 

যাই হোক, জেভিয়ার এবং আনজিরো দীর্ঘ যাত্রা শেষে জাপানের কোগোশিমা বন্দরে এসে পৌঁছায়। তখন জাপান প্রায় ২৫০ জন জমিদারের অধিকারে ছিল যাদের উপর মিয়াকোর সম্রাটের তেমন কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না।

 তারা উদীয়মান পর্তুগিজ শক্তির ব্যাপারে শুনেছিল এবং তাদের অনেকেই স্থানীয় যুদ্ধ বিগ্রহে পর্তুগিজদের সাহায্য নিশ্চিত করতে চাইতেন। এদেরই একজন জেভিয়ারকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং তাকে স্বাধীনভাবে ধর্মপ্রচারের অনুমতি দেন। 

কিন্তু ভারতের মত জেভিয়ার এখানে খুব একটা সুবিধা করতে পারছিল না কারণ তার পর্তুগিজ জলদস্যু বন্ধুরা না থাকায় তিনি ইচ্ছেমত জাপানীদের গণহারে ধর্মান্তরিত করতে পারছিলেন না। তাদেরকে হুমকি ধমকি দেয়া বা শাস্তি দেয়া তার পক্ষে সম্ভবপর ছিল না কারণ সে নিজেই জমিদারের অনুগ্রহে বাস করছিলেন। 

তাছাড়া সে বুঝতে পেরেছিল যে আনজিরো তাকে ভুল বুঝিয়েছে। জাপানে বৌদ্ধধর্ম ও প্রাচীন শিনতো ধর্মের সংমিশ্রণে যে ধর্ম চালু হয়েছিল তা তার খ্রিস্টধর্ম থেকে হাজার মাইল দূরে ছিল। স্থানীয় বৌদ্ধ ও শিনতো পুরোহিতরাও সংঘবদ্ধ এবং সতর্ক ছিল যাতে জেভিয়ার জাপানীদের ধর্মান্তরিত করতে না পার। 

জেভিয়ার তখন তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে তাদের হুমকি দিতে থাকে যে বুদ্ধ হচ্ছে স্বয়ং শয়তান আর যারা তার উপাসনা করে তারা পৌত্তলিকতার মত চরম ঘৃণ্য অপরাধ করার কারণে অনন্তকাল নরকের আগুনে পুড়বে। জাপানীরা জেভিয়ার ও তার ধর্মকে নতুনভাবে চিনতে পারল এবং তার বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা হল।
 জেভিয়ার অবস্থা বেগতিক থেকে মিয়াকোর সম্রাটের কাছে গেলেন তাকে ধর্মান্তরিত হওয়ার প্রস্তাব দেয়ার জন্য। কিন্তু সম্রাট তার নিজের ধর্মে সন্তুষ্ট ছিলেন এবং জেভিয়ারের মতলব বুঝতে পেরে তার সাথে দেখা করতে অস্বীকৃতি জানান। জেভিয়ার ভগ্নহৃদয়ে ১৫৫১ সালে গোয়ায় ফিরে আসে। যে অল্প কয়েকজন জাপানীকে তিনি ধর্মান্তরিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন তারা কিছুদিনের মধ্যেই আগের ধর্মে ফিরে যায়।
জেভিয়ার তার ভ্রমণকালে চীনের কথা অনেক শুনেছিলেন এবং জাপানের ব্যার্থ অভিযানের পর সিদ্ধান্ত নেন চীনে ধর্মপ্রচার করার। সেজন্য তিনি ১৫৫২ সালে চীনের উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু চীনের মূলভূমিতে পৌঁছানোর আগেই সে কুয়ানতাং বন্দরের অনতিদূরে একটি রুক্ষ পাথুরে দ্বীপে ওই বছরেরই ২ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। 

মৃত্যুর সময় তার সাথে ছিল শুধুমাত্র একজন চীনা ভৃত্য। ১৫৫৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে পর্তুগিজরা তার মৃতদেহ মাটি খুঁড়ে বের করে এবং ১৫৫৪ সালের ১৪ মার্চ তা গোয়ায় ফিরিয়ে আনা হয়। তাকে প্রথমে সেন্ট পল গির্জায় ও পরে বম জেসাস গির্জায় সমাহিত করা হয়। রোম ১৬৬৪ সালে তাকে সেন্ট উপাধিতে ভূষিত করে। 

তার মৃতদেহ একটি কাঁচের কফিনে রাখা আছে যা বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবের সময় প্রদর্শনীর জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। খ্রিস্টান অখ্রিস্টান নির্বিশেষে গোয়ার সাধারণ মানুষ তাকে শ্রদ্ধা ও ভক্তি করে এবং বিপদে আপদে তার অনুগ্রহ প্রার্থনা করে। কিন্তু তারা কি একবারও ভেবে দেখেছে এই মানুষটির কারণে তাদের পূর্বপুরুষদের কতটা অত্যাচার ও পাশবিকতার শিকার হতে হয়েছে? 

১৫৬০ থেকে ১৮১২ সাল পর্যন্ত এই সুদীর্ঘ ২৫২ বছরে যত নিরপরাধ মানুষকে ইনকুইজিশনের আগুনে প্রাণ দিতে হয়েছে, বন্দীদশা বরণ করতে হয়েছে বা অন্যান্য নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয়েছে তাদের কান্না কি এইসব অন্ধভক্ত যারা তাদেরই বংশধর তাদের কানে পৌঁছায় না?
এত কিছুর পরেও চার্চ জেভিয়ারকে ত্যাগ করেনি বা তার কর্মকাণ্ডের বিন্দুমাত্র নিন্দা করেনি বরং তাকে সেন্ট(সাধু) হিসেবে আখ্যা দিয়েছে, নানা উপাধিতে তাকে ভূষিত করেছে এবং প্রতিষ্ঠানের পর প্রতিষ্ঠান তার নামে উৎসর্গ করেছে। এতেই বোঝা যায় চার্চের কাছে সাধুতার সংজ্ঞা শুধু যেন তেন উপায়ে কার্যসিদ্ধি করা তথা নিজের সাম্রাজ্য ও বাহুবল বাড়ানো। 

গির্জার সাধুদের অনেকেই যেকোনো সাধারণ মানুষের থেকেও বেশি অসাধু। এদের অনেকেই উপবাস করা, খালি পায়ে হাঁটা, নিজেকে চাবুক মারা, নারীসঙ্গ বর্জন ইত্যাদি নানা ধরণের আত্মপীড়ন করে বেড়াতেন। কিন্তু যা এদের ছিল না তা হল উদার মানবতাবাদী বৈশ্বিক চেতনা। অযৌক্তিক ও মানবতাবিরোধী ধর্মীয় বিশ্বাসগুলি যে মানুষকে কতটা পাষণ্ড ও অমানুষ করে তুলতে পারে তার অনুপম নিদর্শন হচ্ছে সেন্ট জেভিয়ার।

কিন্তু এই সমুদয় অপচেষ্টা সত্বেও উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত হিন্দুদের ওপর খ্রিস্টধর্ম বিশেষ কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি । এই বিভৎস ইতিহাস পরে এখনো যদি জাতি, ভাষা, বর্ণ, প্রদেশিকতা কে বর্জন করে হিন্দু জাতি ঐক্য বদ্ধ না হয় , তাহলে পুনরায় রিফিউজি তকমা পাবার জন্য তৈরি হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.