সেকালের শ্রেষ্ঠী থেকে আজকের ব্যবসায়ী

ভারতে যারা ব্যবসা করেন তাদের অধিকাংশের মধ্যে একটি যােগীসুলভ মানসিকতা আছে। মফস্‌সল শহরের ছােটোখাটো দোকানদার থেকে শুরু করে সাধারণ ঠেলাওয়ালাদের মধ্যেও এই মানসিকতার প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে। ধরা যাক কেউ এক কেজি চাল কিনলেন। সাধারণত দোকানদার দাঁড়িপাল্লায় ওজন সঠিক হওয়া সত্ত্বেও কিছু চাল অতিরিক্ত দিয়ে দেন। এর কারণ কী? দোকানদারের ভাবনা সম্ভবত এই খাতে বয়, ‘দাঁড়িপাল্লায় ওজন ঠিক আছে কিন্তু তবুও কোথাও ভুল হয়ে থাকতে পারে। কিছু চাল অতিরিক্ত দিয়ে দেওয়াই ভালাে।’ এই ধরনের ঘটনা ভারতে আকছার ঘটে। হয়তাে দোকানদার নিজেও জানেন না, কেন তার মনে হয় ‘কোথাও ভুল হয়ে থাকতে পারে’। তার বাপ-ঠাকুর্দা এইভাবে ব্যবসা করেছেন, তিনিও করে যাচ্ছেন। শুধু ছােটো ব্যবসায়ীরাই নয়, বড়ো বড়ো শিল্পপতিদেরও এই ধরনের মানসিকতা দেখা যায়।

ভারতীয় ব্যবসায়ীরা কোনওদিনই একা পুরাে বাজার দখল করার লক্ষ্যে ব্যবসা করেননি। বরং তারা মনে করতেন সবাইকে নিয়ে বাজার সম্প্রসারণ করতে পারলে বাণিজ্যের পরিধি আরও বাড়বে। উদাহরণস্বরূপ, ঘনশ্যামদাস বিড়লার নাম করা যেতে পারে। তিনি যত তরুণ উদ্যোগপতিকে বাণিজ্যলক্ষ্মীর কৃপাদৃষ্টি লাভের পথ বাতলে দিয়েছেন, বােধকরি আর কেউ তত দেননি। সম্ভবত এই কারণেই ভারতের কোনও ভাষায় ইংরিজি ব্ল্যাকমেলের কোনও প্রতিশব্দ নেই। প্রাচীন ভারতে ব্যবসায়ীদের বলা হতাে শ্ৰেষ্ঠী। অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ। তার পর ভারতের বাণিজ্যক্ষেত্রে মুসলমানদের পদার্পণ ঘটল। তাদের পরে এল ব্রিটিশরা। এরা যে শুধু বাণিজ্যের নামে ভারতবর্ষের শাসনক্ষমতা দখল করল তাই নয়, ভারতের মহান আত্মাকেও ধ্বংস করার চেষ্টায় মেতে উঠল।

স্বাধীনতা লাভের পর প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর নীতি এবং মানসিকতাও ভারতের ব্যবসায়ীসমাজের চরিত্রবদলের জন্য দায়ী। কথাটা বিশদে বােঝার জন্য একটা পুরনাে ঘটনার কথা বলা যেতে পারে। একবার নেহরু জে. আর. ডি. টাটার সঙ্গে লাঞ্চ করছিলেন। খেতে খেতে টাটা বলেন, সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন বাণিজ্য ক্ষেত্রগুলিকেও লাভজনক করে তােলা দরকার। তাতে নেহরু বলেছিলেন, ‘লাভ একটা অত্যন্ত কুরুচিকর কথা। আশাকরি এখন এসব কথা বলে তুমি আমাদের খাওয়াটা নষ্ট করবে না।’ ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর এহেন কথা শুধু ভারতীয় বাণিজ্যের সম্ভাবনাকেই নষ্ট করেনি, তার মানসিকতায় ভারতীয় ব্যবসায়ীরাও যারপরনাই হতাশ হয়েছিলেন।

আর একটি ঘটনা। দেশভাগের পর সিন্ধুপ্রদেশের পুরােটাই পাকিস্তানে চলে যায়। ভাই প্রতাপ দয়াল দাস (১৪ এপ্রিল ১৯০৮-৩০ আগস্ট ১৯৬৭) কচ্ছের মহারাওয়ের দেওয়া ১৫,০০০ একর জমিতে সিন্ধু রিসেট্‌লমেন্ট করপােরেশন স্থাপন করেন। মাত্র তিন বছর সময়ে তিনি তিনটে শহরের জন্ম দেন।শহরগুলির নাম আদিপুর, গান্ধীধাম এবং কাণ্ডলা। শুধু তাই নয়, করাচি বন্দর হাতছাড়া হওয়াতে ভারতের যে ক্ষতি হয়েছিল তার পরিপূরক হিসেবে তিনি কাণ্ডলা বন্দরের নকশা তৈরি করেছিলেন।

ভাই প্রতাপ দয়াল দাস ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন পুরােধাপুরুষ। তিনি জাতীয় কংগ্রেসের কোষাগারে প্রভূত অর্থ জুগিয়েছেন, নিজের বাড়ির বেসমেন্টে আত্মগােপন করে লড়াই করেছেন ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আবার গান্ধীজী নেহরু প্রমুখ নেতা সিন্ধুপ্রদেশের হায়দরাবাদে গেলে তাদের নিজের বাড়িতে রেখে যথাযথ আপ্যায়নও করেছেন।

কিন্তু বিনিময়ে কী পেয়েছেন? বিদেশ থেকে ইমপাের্টেড জিনিসপত্র নিজের কাছে রাখার জন্য তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সামান্য ঘটনা কিন্তু অবস্থাবৈগুণ্যে জটিল হয়ে দাঁড়াল। তার বিরুদ্ধে প্রথম মামলা দায়ের করা হয় ১৯৬০ সালে। বছরের পর বছর মামলা চলতে থাকে। ১৯৬৫ সালে মামলার রায় বেরােয়। পাঁচ বছর কারান্তরালে কাটিয়ে এবং সেখানে অমানুষিক পরিশ্রম করার ফলে তার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছিল। কারাবাসের একেবারে শেষ দিকে তাকে বম্বে পুরসভা পরিচালিত সেন্ট জর্জেস হাসপাতাল ভর্তি করা হয়। আশ্চর্যের ব্যাপার, পরিবারের লােকজন দু’ সপ্তাহে একবার হাসপাতালে তাকে দেখতে যেতে পারত। ১৯৬৭ সালের ৩০ আগস্ট ভাই প্রতাপ লন্ডনে মারা যান। তখন তার বয়েস মাত্র ৫৯ বছর।

ব্যবসায়ীদের প্রতি জওহরলাল নেহরুর উপেক্ষা এবং নীচু নজরের বহিঃপ্রকাশ আমরা যেমন ভাইপ্রতাপ দয়াল দাসের ক্ষেত্রে দেখতে পাই, ঠিক তেমনই পাই টিটি কৃষ্ণমাচারীর ক্ষেত্রেও। মুদ্রা কেলেংকারিতে জড়িত থাকার দায়ে ১৯৫৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি টি.টি. কৃষ্ণমাচারী অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন। কিন্তু ১৯৬২ সালের নির্বাচনে পুনর্নির্বাচিত হলে নেহরু তাকে অর্থমন্ত্রক ছাড়া যে-কোনও একটি ক্যাবিনেট মন্ত্রক বেছে নিতে বলেন। নেহর প্রস্তাবের কোনও জবাব না দেওয়ায় তাকে মন্ত্রকহীন ক্যাবিনেট মন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রীসভায় কিছুদিন থাকতে হয়। পরে অবশ্য তাকে অর্থমন্ত্রকেই ফিরিয়ে আনেন নেহরু। এবং ১৯৬৬ পর্যন্ত তিনি অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। টি.টি. কৃষ্ণচমাচারী ছিলেন ব্যবসায়ী, টিটিকে গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা। তবে কংগ্রেস দলে থাকার ফলেই তিনি সেবার বেঁচে গিয়েছিলেন এবং দ্বিতীয়বার অর্থমন্ত্রকের দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

সেই সময় সরকারের ভ্রান্ত নীতির জন্য বহু ব্যবসায়ীর মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছিল। এমনই এক ব্যবসায়ীর নাম দান সিংহ বিস্ত (১৯০৬-১৯৬৪)। তিনি ছিলেন একাধারে ব্যবসায়ী, স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং সমাজহিতৈষী। অথচ তাকে তার কারখানা প্রায় জলের দরে বিক্রি করে দিতে হয়, কারণ ঋণের টাকায় কেনা বিদেশি যন্ত্রপাতি সরকার তাকে কলকাতা বন্দর থেকে ছাড়াতে দেয়নি। এই শােকেই পরে তার মৃত্যু হয়।

ভারতীয় ব্যবসায়ীদের নীচু নজরে দেখলেও, বিদেশি বহুজাতিক সংস্থাগুলির প্রতি নেহরুর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। আই বি এম যাতে ভারতে ব্যবসা করতে পারে তার জন্য নেহরু ১৯৫১ সালে বিশেষ ব্যবস্থা নেন। সে সময় ভারতীয় বাজারের আশি শতাংশের দখল ছিল আই বি এম-এর হাতে। ভারতীয় বাজারে কী বিক্রি হবে, না হবে তা নিয়ন্ত্রণ করত আই বি এম। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে তারাই ছিল সর্বেসর্বা। বিদেশ থেকে পুরনাে মেশিন নিয়ে এসে আই বি এম আগে চলনসই গােছের করে তুলত, তারপর চড়া দামে লিজ দিত সরকারকে।

বিক্রম সারাভাইয়ের নেতৃত্বে সরকারের ইলেকট্রনিক্স কমিটি প্রথম এ ব্যাপারে তদন্ত শুরু করে। আই বি এম জানায়, সরকার দেশের সার্বিক ক্রমবিকাশের যে নীতি গ্রহণ করেছে, তারা সেই নীতি অনুসারেই কাজ করছে। বলা বাহুল্য, কারাের কাছেই এই ব্যাখ্যা সন্তোষজনক বলে মনে হয়নি। কিন্তু কংগ্রেস সরকার কোনও পদক্ষেপও করেনি। ১৯৭৭ সালে নির্বাচিত জনতা সরকার প্রথম বিদেশি মুদ্রা আইনের নির্দেশিকা মেনে আই বি এম-এর ভারতীয় অংশীদারিত্ব ২৬ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। আই বি এম এই সিদ্ধান্ত মানেনি। সেই কারণে ওই বছরেই আই বি এমকে ভারত ছাড়ার নির্দেশ জারি করে সরকার।

ইন্দিরা গান্ধীর আমলেও পরিস্থিতি বিন্দুমাত্র বদলায়নি। আর এক গান্ধীবাদী ব্যবসায়ী এবং ইন্দিরা গান্ধীর বন্ধু বীরেন জে. শাহকে (১২ মার্চ ১৯২৬-৯ মার্চ ২০১৩) জরুরি অবস্থার বিরােধিতা করার অপরাধে গ্রেপ্তার করা হয়। বীরেন শাহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন মিসা আইনে। তাকে প্রথম ছ’মাস বম্বের আর্থার রােড জেলে রাখা হয়েছিল। তারপর নিয়ে যাওয়া হয় তিহার জেলে। সেখানে তিনি তিন মাস ছিলেন। এই সময় বীরেন শাহের ছেলে রাজেশ শাহ একটি চিঠি পেয়েছিলেন। চিঠিটা লিখেছিলেন বম্বের এক প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা। চিঠির বক্তব্য ছিল এই রকম : বীরেন শাহ যদি জরুরি অবস্থা সমর্থন করে বিবৃতি দেন তাহলে তার সব অপরাধ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। শুধু তাই নয়, ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য মহার্ঘ্য কিছু লাইসেন্সও তিনি পেয়ে যেতে পারেন। বলা বাহুল্য, রাজেশ শাহ এই পরামর্শ কানে তােলার কথা ভাবেননি। এমনকী, বাবার সঙ্গে কথা বলার ভাবনাও তার মাথায় আসেনি।

লাইসেন্স রাজের স্রষ্টা ছিলেন নেহরু। এবং তাঁর এই সৃষ্টি কালক্রমে ভারতে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির জন্ম দিয়েছে। সর্বোপরি, যাবতীয় দুর্নীতির জন্য কাঠগড়ায় তােলা হয়েছে শুধু ব্যবসায়ীদের। বিংশ শতাব্দীর শেষে এসে আমরা দেখতে পাচ্ছি, শ্ৰেষ্ঠীরা দানবে পরিণত হয়েছেন।

এতৎসত্ত্বেও, ভারতীয় ব্যবসায়ীরা কিন্তু দেশের পাশেই থেকেছেন। মাতৃভূমিকে সমৃদ্ধ করার কোনও সুযােগই তাঁরা ছাড়েননি। ১৯৯৮ সালে পােখরানে (পােখরান-২) আণবিক বােমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণের পর আমেরিকার অনেক গুলি সংস্থা ভারতের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্বন্ধ ছিন্ন করেছিল। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে ২০০ ভারতীয় সংস্থা। এদের মধ্যে ছিল কিরলােসকর ব্রাদার্স, গােদরেজ অ্যান্ড বয়েস, লার্সেন অ্যান্ড টুবরাে এবং ওয়ালাদ-নাগার ইন্ডাস্ট্রিজের মতাে বিশ্বখ্যাত সংস্থাও। দেশের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এইসব সংস্থা ক্ষতিস্বীকার করেছিল। সরকারকে দোষারােপ করে কোনও বিবৃতি তাদের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি।

মানতেই হবে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের ব্যবসায়ীদের থেকে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা আলাদা। স্মরণাতীতকাল থেকে তারা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থেকে বিভিন্ন ভাবে দেশের উপকার করে চলেছেন। তাঁরা সৎ এবং ন্যায়নিষ্ঠ। অবশিষ্ট বিশ্ব ব্যবসায়ীদের মধ্যে এই দুটি গুণ এখনও খুঁজে পায়নি।

(সৌজন্য : অর্গানাইজার)

সন্দীপ সিংহ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.