পূর্ব অংশ

।।তৃতীয় অংশ।।

বিশ্বেশ্বরায় নরকার্ণব তারণায় কণামৃতায় শশিশেখরধারণায় |
কর্পূরকান্তিধবলায় জটাধরায় দারিদ্র্য দুঃখদহনায নমঃ শিবায় ||
গৌরীপ্রিযায় রজনীশকলাধরায় কালান্তকায ভুজগাধিপকঙ্কণায় |
গংগাধরায গজরাজবিমর্দনায দারিদ্র্য দুঃখদহনায় নমঃ শিবায় ||
ভক্তিপ্রিয়য় ভবরোগভযাপহায় উগ্রায় দুর্গভবসাগরতারণায় |
জ্যোতির্ময়ায় গুণনামসুনৃত্যকায় দারিদ্র্য দুঃখদহনায় নমঃ শিবায় ||

শিব মন্ত্র উচ্চারিত হচ্ছে। এ মন্ত্র প্রত্যহ উচ্চারণে দুঃখ বিনাশ হয়। সমগ্র অরন্য ও আরণ্যক মন্ত্রের শব্দে শুদ্ধ ও আমোদিত হয়ে উঠেছে । আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো বনপথে সেই শিব মন্ত্র কর্ণগোচর করতে করতে এগিয়ে চললাম। কিছু পথ এগিয়ে আসতেই অগুরু, চন্দন , পুষ্প , ধুম সুবাস প্রবেশ করে আমার দেহ মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলল । এ পূজায় আতিশয্য নাই। ভক্তির আবেশে তা শিবলোকে পরিনত হয়েছে যেন।

আমি ক্রমশ আচার্যের আশ্রমের প্রবেশ করলাম । আচার্য শুক্রাচার্য তখন পূজা সমাপন করে সবে উঠে দাঁড়িয়েছেন। আমি আচার্যের সম্মুখে আভূমি প্রণত হয়ে বললাম , “আচার্য আমার নাম কচ। আমি দেবগুরু বৃহস্পতির পুত্র । মহর্ষি অঙ্গিরার পৌত্র। আমি আপনার শিষ্য হতে চাই। আপনি দয়া করে আমাকে আপনার শিষ্য হওয়ার সম্মান দান করুন। – নাম্না কচমিতি খ্যাতয়ং মাং ভবান। আমি আপনার শিষ্য হবার জন্য হাজার বছর ব্রহ্মচর্য পালন করতে রাজি আছি। ব্রহ্মচর্যয়ং চরিস্যামি ত্বয়্যহংপরমং গুরৌ।

শুক্রাচার্য স্থির হয়ে আমাকে দেখলেন। তারপর স্মিত হাসলেন।অদ্ভুত লাগল । আমি বৃহস্পতির পুত্র। বলতে গেলে শুক্রের শত্রু তনয়। কিন্তু আমার মধ্যে অসম্ভব ভাবে শিক্ষার আগ্রহ ও বিনয়ের ভাব ছিল জন্মগত, তা দেখে গুরু শুক্রাচার্য ভারি খুশি হলেন । এরপর তিনি যে ভাষায় এবং যে শব্দে শত্রু পুত্রকে নিজ গৃহে আমন্ত্রণ জানালেন তা অবাক করার মত । আচার্য আমাকে বললেন, ” আমার আশ্রমে তোমার শুভাগমন হোক। তুমি ব্রহ্মচর্যের অঙ্গীকারে আমাকে যেহেতু গুরু বলে মেনে নিয়েছো আমি তোমাকে শিষ্য হিসেবে স্বীকার করে নিচ্ছি। কচ আমি তোমার অনুরোধ মেনে নিচ্ছি , এই কারণে যে,  তুমি শিষ্য হিসাবে আমার আরাধনীয় । আমি একজন অর্চনীয় ব্যক্তিকে আরাধনা করছি। তাতে তুমিও যেমন অর্চিত বোধ করবে , তেমনি অর্চিত হোক তোমার পিতা দেবগুরু বৃহস্পতি । “

কচ সুস্বাগতম তে’স্তু প্রতিগৃহানমি তে বচঃ।
অর্চয়িস্যে’হম অর্চয়ং ত্বামর্চিতো’স্তু বৃহস্পতি।

সেই সময়ের সমাজের নিয়মে শত্রুপক্ষ হওয়া সত্বেও শুক্রাচার্যের কাছে শিক্ষার্থী হয়ে আসতে আমার বিশেষ কোন অসুবিধা হয়নি। অনুরূপভাবে গুরুদেবের ও কোনও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব হয়নি শত্রুপক্ষ কাউকে শিষ্য হিসাবে গ্রহণ করতে ।এমনকি চরম শত্রু আমার পিতা বৃহস্পতি সম্পর্কে শুক্রাচার্যের যথেষ্ট সম্মান বোধ আছে বলে আমি উপলব্ধি করলাম । গুরু-শিষ্যের এই সম্পর্ক টুকু আমার কাছে অনেক বেশি মূল্যবান ছিল…..

আমার শিক্ষানবিশ জীবনের সূচনা হল। শুক্রাচার্যের আশ্রমের সমস্ত বিধি নিয়ম আমি কিছুদিনের মধ্যেই রপ্ত  করে নিলাম। গুরুগৃহের বিধি নিয়ম মানতেই হত । সেইসঙ্গে মানতে হত আরো কিছু। গরু চড়ানো, যজ্ঞভূমি প্রস্তুত, ভিক্ষা, পুজোর প্রস্তুতি, আশ্রম পরিষ্কার, আর গুরুর সেবা….

 এই তথাকথিত কার্য ব্যতীত ব্রহ্মচর্য শিক্ষা গ্রহণ এবং শাস্ত্র শিক্ষা গ্রহণ এবং শস্ত্র শিক্ষা গ্রহন করতাম প্রতিদিন। গুরু বড় যত্ন করে শিক্ষা দিতেন আমাকে। শাসন ও স্নেহ উভয়ই ছিল সেখানে। তিনি প্রায় নিজেকে উজাড় করে আমাকে শিক্ষা দান করতেন।

এসবের সঙ্গে আশ্রমে জুটেছিল কিছু উদ্বৃত্ত কাজ  ।  আমি গুরু সেবায় এবং বিদ্যা লাভের জন্যই ব্যস্ত থাকতাম। আমার উপলব্ধি এই ছিল যে, গুরু যখন এরূপ নিজেকে উজাড় করে শিক্ষা দান করছেন , তখন অবশ্যই সঞ্জীবনীও দান করবেন….

আশ্রম পরিবেশ শান্ত থাকত । কেবল গুরুর কন্যার কোলাহলে মুখরিত হত। একদিন গুরু আমাকে ঔষধি বৃক্ষ চেনাচ্ছেন , হঠাৎ দেখলাম একটি ভারী সুন্দরী কন্যা আমার সামনের একটি গুল্ম থেকে ফুল তুলে রিউ রিউ সুরে গাইতে গাইতে বনের দিকে চলে গেল…গুরু বলে উঠলেন , ” দেবযানী মা, অধিক গভীর অরণ্যে প্রবেশ করবে না…” আমি সে দিকে মন্ত্র মুগ্ধের ন্যায় কিয়দকাল স্থির হয়ে রইলাম।  গুরুর কন্ঠের শব্দে চমকিত হলাম, ” আমার কন্যা, বড় চঞ্চল বুঝলে কচ, আমি জপতপ নিয়ে থাকি । চিন্তা হয়। আমার হতশ্রী শিষ্য গুলো তো ঠিক নয়… যা হোক, হ্যাঁ এই বৃক্ষের পাতা যন্ত্রণা উপশমে……”

একি রূপ মূর্তি হেরিলাম। জন্ম জন্মান্তরেও ভুলব না।এমন রূপ? আমি জানতাম সৌন্দর্য কেবল স্বর্গের হয়। কিন্তু হে ত্রিদেব, তুমি তো অসুর দানব কুলেও তোমার শিল্প মহিমা সৃষ্টি করেছ। সারাদিনে কাজের মাঝে মাঝে কেবলি সেই চঞ্চল কন্যাটির কথা মনে অলিন্দে এসে দন্ডায়মান হতে লাগল। নিজেকে আমি অঙ্কুশ দিয়ে আঘাত হানলাম। কি করছি আমি? আমার লক্ষ্য সঞ্জীবনী । কোনো সুন্দরী কন্যা নয়। ছিঃ। কিন্তু হায় আহারে শয়নেও সে কন্যা কেবল মনে আসে কেন ?

সে দেবীপ্রতিমা নারিব ভুলিতে    প্রথম প্রণয় আঁকিল যাহা,
স্মৃতিমরু মোর শ্যামল করিয়া    এখনো হৃদয়ে বিরাজে তাহা।
সে প্রতিমা সেই পরিমলসম   পলকে যা লয় পায়,
প্রভাতকালের স্বপন যেমন    পলকে মিশায়ে যায়।
অলসপ্রবাহ জীবনে আমার    সে কিরণ কভু ভাসিবে না আর—
সে কিরণ কভু ভাসিবে না—
সে কিরণ কভু ভাসিবে না॥

আমার হৃদয় প্রাসাদে যখন কন্যা ঢুকে চুরি করলেন , তখন আমি চুরি না করি , চোরের সঙ্গে মিত্রতা করতেই পারি। প্রথমে বার্তালাপ কম হত, কেবল তিনি ফুল তুলে আনতে বলতেন….

 গুরু কন্যার অজানা পুষ্প চয়ন ও তাদিয়ে শৃঙ্গার ভারী এক প্রিয় কাজ ছিল। প্রতিদিনই কোন না কোন অজানা পুষ্প চয়ন করার জন্য আমাকে উপরোধ অনুরোধ করতেন এবং না করলে অভিমান করতেন।  গুরু এবং দুজনের জন্যই তৃপ্তির নিমিত্ত আমি যথেষ্ট চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। কিন্তু এ তো এক বিপরীত সাধন । শুক্রাচার্য যাতে খুশি হবেন সুন্দরী নিশ্চয়ই তাতে খুশি হবেন না। আবার যে কাজে দেবযানীর খুশি হওয়ার কথা তাতে নিশ্চয়ই আমার গুরু খুশি হবেন না । তাই আমার সাধনা ছিল দু’রকম । এক দিকে ব্রত নিয়ম ব্রহ্মচর্য ব্রত গ্রহণ করেছি যাতে গুরু তুষ্ট হন অন্যদিকে যৌবনবতী সুন্দরী হৃদয় হরন এর জন্য একটি প্রেমে উত্তাল যুবক যা করে তাই করছি ।

নিত্যমারাধয়িস্যয়ংস্তয়ং যুবা যৌবনাগাং মুনি।

আমার এমনি অবস্থা হল , কখনো কখনো  ব্রতের শিষ্য থেকে উন্মাদ যুবা বেরিয়ে আসত।

একদা প্রাতঃকাল। স্নান , সূর্য প্রনাম ,আহ্নিক ও শিবের পূজা সমাপনতে , গুরু গৃহে গুরুপ্রনাম ও তাঁর কিয়দ শুশ্রূষা করে বাহির হলাম। শীত গিয়ে বসন্ত সমাগত। বাতাস সেই অসুরদের অরণ্যের কি সব অজানা ফুলের সুবাস আমোদিত করছে। একটি কোকলি সূর্য উদয় কাল হতে কেমন যেন অক্লান্ত কুহু কুহু ডেকে যাচ্ছে…সাদা সাদা বকপাখি আকাশে শ্বেতপুষ্প মালার ন্যায় উড়ে চলেছে। মনটি ভারী প্রসন্ন বোধ করছিলাম।

 হঠাৎ করে সুন্দরী যৌবনবতী দেবযানী এসে আমায় প্রশ্ন করলেন , ” বন্ধু তুমি না স্বর্গে ছিলে ? এতদিনে স্বর্গের সেইসব বিখ্যাত সুন্দরী  অপ্সরার নৃত্য কুশল, আর যক্ষ গ্ন্ধ্ধর্বদের নৃত্য গীত তুমি  কতবার দেখেছো বা শুনেছো?  আজ এই ঋষি আশ্রমে তুমি নন্দনের গন্ধবহ । তুমি কি স্মরণ করতে পারো –  সেই নৃত্য গীত বাদ্যের ধ্বনি? “

 বললাম, ” হ্যাঁ পারি।  শুধু স্মরণ কেন ?তুমি চাইলে সেই  নন্দনের নৃত্য গীত কিছু দেখাতেও পারি । তোমাকে শোনাতে পারি ইন্দ্র সভায় গাওয়া হত কোন গান ? “

প্রফুল্লিত ঋষি কন্যা বললেন , “তবে দেখাও সেই মনমোহন নৃত্য…গাও সেই গান । আমি ভালো রুদ্রবীণা বাজাই । পিতা শিখিয়েছেন। আমি তোমার সঙ্গে বীণা বাজাবো। “

 আমি বৃহস্পতি পুত্র কচ গুরু শুক্রাচার্যের করণীয় যজ্ঞকর্মের সমস্ত আয়োজন সেরে রেখে নৃত্যে মেতে উঠলাম ঋষি কন্যার সামনে।  স্মিত মুখে ভুজ বিলাস আর কঠিন পাদ ন্যাসে ফুটে উঠল সুর নৃত্যের ছন্দ- লয়- তাল । গায়ন নৃত্যন বাদয়ংশচ দেবযানীমতোষয়ৎ। দেবযানীর রুদ্রবীণা ঝংকার দিয়ে উঠল।

শিকড়গুলোর শিকড় ছিঁড়ে যেন শালের গাছ
পেরিয়ে এল মুক্তিমাতাল খ্যাপা,
হুংকার তার ছুটল আকাশ-ব্যাপা।
ডালপালা সব দুড়্‌দাড়িয়ে ঘূর্ণি হাওয়ায় কহে–
নহে, নহে, নহে–
নহে বাধা, নহে বাঁধন, নহে পিছন-ফেরা,
নহে আবেগ স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা,
নহে মৃদু লতার দোলা, নহে পাতার কাঁপন–
আগুন হয়ে জ্বলে ওঠা এ যে তপের তাপন।
মহাদেবের তপোভঙ্গে যেন বিষম বেগে
নন্দী উঠল জেগে;
শিবের ক্রোধের সঙ্গে
উঠল জ্বলে দুর্দাম তার প্রতি অঙ্গে অঙ্গে
নাচের বহ্নিশিখা
   নিদয়া নির্ভীকা।

ঋষিকন্যার ভালো লাগছে। তিনি বড় সুন্দর বাজান। আমি নৃত্য মত্ততা থেকে অকস্মাৎ থমকে দাঁড়ালাম। অসুরকুলের ঋষি কন্যা এত সুন্দরী , এমন মোহময়ী কেমন করে হয়? তাঁর বীণায় যেন মা সরস্বতীর বাস। কন্যা চক্ষু বন্ধ করে বাজিয়ে যাচ্ছেন। অরণ্যের বন্য বাতাস, আকাশের মেঘ, আগত বসন্তের কচি পাতা, গত শীতের শুষ্ক পত্র, বুনো ফুল, পাখি সবাই আনন্দিত কিন্তু নিস্তব্ধ হয়ে শুনছেন সেই বীণা। আমি মোহগ্রস্থের ন্যায় তাকে অবলোকন করতে লাগলাম।

হঠাৎ বীণা থামল। ঋষি কন্যা চক্ষু উন্মিলিত করলেন। আমিও তখন নৃত্য করে ঘর্মাক্ত। আমার মেদ হীন ঘর্মাক্ত শরীর নবীনা দেবযানীকে কেমন মোহময়ী করে তুলল। তিনি ভালো করে বোঝেন না – মনের মধ্যে কিসের এত আলোড়ন।

শরীরে কিসের শিহরণ ?

আমার প্রাণ শক্তি ছিল অফুরন্ত ।নৃত্যগীতের পরিশ্রমে আমার কোন ক্লান্তি নেই । গুরুসেবার অনন্ত কর্মের পর আরো কিছু নিত্য কর্ম আছে। পূজার ফুল তুলতে গেলে মহাদেবের জন্য যতগুলি সংগ্রহ করতে হয় ,  তার থেকে বেশি ও অজানা ফুল আহরণ করতে হয় গুরুকন্যার নিমিত্ত। তাঁর কেশবন্ধে পুষ্পের অলংকরণ রচনা করা এখন আমার অন্যতম কাজ।

দেবযানি নিত্য নতুন বায়না এবং আবদারের অন্ত নেই । বনের পথে চলতে চলতে কখনো এই যুবতী গাছের বুনোফল কুড়িয়ে আনতে বলেন। কখনো আমাকে পথ সখা বলে উচ্চ স্বরে ডাকবেন। পথ সখার অঞ্জলিবদ্ধ কুসুমোচ্চয় শৃঙ্গার করতে বসেন। আর কখনো বা প্রভুর মতো যথেচ্ছ আদেশে  আমাকে উচ্চকিত করে তোলেন, তার কোন ঠিক নেই ।

আমি তাঁর হৃদয় যাতে সুখী হয় সে সব কার্য করি। দেবযানী র চোখের ইঙ্গিতে আমি সব বুঝেনি। কারণে-অকারণে অজানা সেই অরন্যের না জানা ফুল ফল কুড়িয়ে আনাই শুধু নয় । আজ্ঞাপেক্ষী দাসের মত আমি সদা সর্বদা দেবযানীর পাশে থাকতাম ।

আমার এই অফুরান প্রাণশক্তি তো বৃথা ব্যায়িত হয় না। ঋষি কন্যার  অল্প বয়সের কিশোরী মনে শিহরণ জাগে। ঋষি কন্যা ভাবেন শুধু তুষ্ট করা নয় । নিশ্চয় এই অক্লান্ত পরিশ্রমের কারন সরসতা আছে, নইলে কেন আমার মত একজন সদ্য যুবক শুক্রাচার্যের পাঠশালার কারাগার থেকে বারবার পালিয়ে তার কাছে ফিরে আসছে? কখনো কাজে ফাঁকে আমারও মনে হয় ভালোবেসে, সখী, নিভৃতে যতনে. আমার নামটি লিখো– তোমার. মনের মন্দিরে। আমার পরানে যে গান বাজিছে . তাহার তালটি শিখো– তোমার. চরণমঞ্জীরে॥

দিনান্তে সূর্য যখন বন ভূমি আরক্ত করে তোলে তখন এই ক্লান্ত শান্ত যুবককে দেখে বোধ করি ঋষি কন্যার বড় মায়া হয় । সেই কোন সুদূরের স্বর্গ থেকে এখানে এসেছি আমি- শুধু মন্ত্র লাভের জন্য তাঁর দাসত্ব বরণ করেছি এ কথা কন্যের বিশ্বাস হয়না । তার ধারণা আমি তাকে ভালোবাসি ।

আরক্ত সন্ধ্যাবেলায়  ঋষি কন্যা বনবালা যখন নির্জন বনভূমিতে উদাস মনে বসে থাকেন তখন গুরুগৃহে কর্মরত  আমার জন্য তার হয়তো মন কেমন করে। আমার উদ্দেশ্যে তিনি কাছে আসার ডাক পাঠান গানের সুরে – গায়ন্তী চ ললন্তি চ রহঃ পর্য্যচরত্তথা।

 আমি হয়ত তাঁর    সন্ধ্যার মেঘমালা,  সাধের সাধনা,

               তাঁর    শূন্যগগনবিহারী। সারা বিকাল সে    আপন মনের মাধুরী মিশায়ে আমারে করে রচনা–

                   “তুমি    আমারি, তুমি আমারি,
মম     অসীমগগনবিহারী॥
মম    হৃদয়রক্তরাগে তব চরণ দিয়েছি রাঙিয়া,
 অয়ি    সন্ধ্যাস্বপনবিহারী।”

গানের সুর  আমার কর্ণ দিয়ে মস্তকের অলিন্দে নয়, হৃদয় মন্দিরে প্রবেশ করে আঘাত করে। এ আঘাত বড় মধুর আঘাত। আবেশে মন , শরীর জড়িয়ে ওঠে সুগন্ধি গুল্ম লতার ন্যায়। আমি ছুটে যাই। কি অবচেতনে জানি না? ঋষি কন্যা বড় মমতায় অঞ্চল দিয়ে আমার কপালের স্বেদ বিন্দু মুছিয়ে দেন। মধুর কথায় অপনোদন করে পরবাসের ক্লান্তি।

ঋষি কন্যা তারণায় আমাকে নাচতে হয় গাইতে হয় । কুড়িয়ে আনতে হয় ফুল ফল।  সেই সব পরিশ্রম আর কৃত্রিমতা লঘু হয়ে যায় যখন সেই ঋষি কন্যা সহজ-সরল চাওয়ায়,  রমণীর নির্জন পরিচর সুখে। আমি তাঁর নিকট নিজেকে বার বার সমর্পিত করছিলাম নিজেকে। মাঝে মাঝে উপলব্ধি হত কিসের সুর – অসুর? কিসের গুপ্তচর? কিসের মৃত সঞ্জীবনী মন্ত্র ? থেকে যাই সারা জীবন এই আশ্রমে, ঋষি কন্যার কোলে মাথা ঘুমাব, বকুল যুথি র মালা গেঁথে দুজনে সাজব, গান গাইব বীণা বাজিয়ে, ভোরের বেলায় ফুল কুড়াব, নদীর তীরে শিব গড়ে পুজো করব…বুনো ফল খেয়ে পেট ভরাব।

দিন যায় রাত যায় আমার আর কন্যার মধ্যে সাহচর্য ঘনীভূত হয় । একমুহূর্ত না দেখলে দুজন দুজনকে চক্ষে হারাই। গায়ে আমার পুলক লাগে চোখে ঘনায় ঘোর। হৃদয়ে মোর কে বেঁধেছে রাঙা রাখির ডোর।

একদিন এক বসন্তের বিকেল। আকাশ রাঙিয়ে সূর্যদেব পাঠে বসবেন। গোধূলির অপূর্ব সুন্দর আলোকে এক মাধবী তলায় আমি কন্যাকে দেখলাম। গোধূলির রঙে রাঙিয়ে গিয়ে কন্যাকে আরও সুন্দর লাগছিল। ঋষি কন্যার চিবুক ছুঁয়ে দিয়ে গেল শেষ বিকেলের আলো ।

তনু-মনে আমার জাগল পরশ, হে ঋষি কন্যা , হে বনবালা তোমাকেই বেসেছি ভালো। ঋষি কন্যার অঙ্গ শোভার সোহাগ মেখে গোধূলীর আলো, অপরূপ সাজে সজ্জিত হলো । সাঁঝের আঁধার নামল সেথায় কালো।আঁধার ঘনিয়ে রাতের আকাশে শুক্ল পক্ষের চন্দ্র উঁকি দিল, তারার মিলনে জোসৎনারা ভাঙে মায়াবী রূপের বাঁধ। আমি মাধবী তলায় নেমে আসা সন্ধ্যার আঁধারে কন্যাকে নিজের কাছে টেনে নিলাম। হে প্রকৃতি দেবী , হে চন্দ্র, হে জোনাকি , ঝিঁ ঝিঁ র দল তোমরা সাক্ষী থাক আমার এই গুপ্তচর জীবনের প্রথম ও গুপ্ত প্রেমের….

ঋষি কন্যার অধর এঁকেছি সুধাবিষে মিশে মম সুখদুখ ভাঙিয়া।মম বিজনজীবনবিহারী

হে ঋষি কন্যা   তুমি আমারি। আমার মোহের স্বপ্নকাজল তোমার চক্ষের কোলে আজ হতে সোহাগে আদরে মিশে থাক। হে,মুগ্ধনয়নবিহারী, আমার স্বর্গের নৃত্য     সঙ্গীত , বাদ্য , পারিজাত গন্ধ তব অঙ্গে অঙ্গে দিয়েছি জড়ায়ে জড়ায়ে। মিশে যাক তোমার অঙ্গে তারা কন্যা…..

অসুর গুরু শুক্রাচার্য এখন দানবরাজ বৃষপর্বার  রাজধানীর কাছে আশ্রম বেঁধে আছেন। – বৃষপর্বসমীপে হি  শক্যয় দ্রোস্টুয়ং ত্বয়া দ্বিজঃ। বৃষপর্বার অসুর , দানব পরিচালকরা সদাসর্বদা অসুর

গুরুর  তত্ত্বাবধান করত এবং সময়ের নিয়মে তারাও জেনে গেল শুক্রাচার্য গুরুর নব ও প্রিয় শিষ্যটি আসলে বৃহস্পতির জ্যেষ্ঠ পুত্র কচ। গুরুর একমাত্র ও ত্রিভুবন খ্যাত সুন্দরী কন্যার সঙ্গে আমার প্রীতি সম্বন্ধ , তথা আমার উপরে শুক্রাচার্য স্নেহ সম্বন্ধও অসুর সমাজে অপরিচিত ছিল না । তবে অসুর গুরু কে তাদের কিছু বলার সাহস হতো না ।তাছাড়া বললেও তিনি শুনতেন না। তাই অসুর দানবরা শুক্রাচার্য্যকে একেবারেই অসন্তুষ্ট করার প্রচেষ্টাও করেননি ।

কিন্তু তাই বলে শত্রু শিবিরে একজন দেবপ্রধান ব্যক্তির পুত্র তাঁদেরই গুরুর কাছে মৃত সঞ্জীবনী বিদ্যা শিখে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন এ তাঁদের সইবে কি করে ? তারা তলায় তলায় আমাকে  হত্যা করার পরিকল্পনা শুরু করে দিলেন।

শুক্রাচার্যের আশ্রম এ আমার নিত্যদিনের অনেক কাজের মধ্যে একটি প্রধান কাজ ছিল গুরুর হোমধেনু সহ আশ্রমের বাকি গরু গুলিকে ছড়াতে নিয়ে যাওয়া । আশ্রমের প্রান্তে একটি তৃণভূমি ছিল । তাকে ঘিরে ছিল ঘন অরন্য। তৃণভূমিতেও বৃক্ষের আধিক্য ছিল।  অন্যদিনের মতো আমি সেখানেই গরু নিয়ে গিয়েছি। হোমধেনুর সঙ্গে অন্য গরু গুলিও একসঙ্গে তৃণভোজনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।  আমি এক জায়গায় বসলাম। বেশ মৃদু বাতাস দিচ্ছে। কাছেই বোধয় কোনো অচেনা ফুলের গাছ আছে। মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে। কয়েকদিন আগে একটি গরু গভীর জঙ্গলে চলে গিয়েছিল। খুঁজে আনতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। সন্ধ্যা নেমে এসেছিল। গুরু ও তাঁর কন্যা চিন্তিত মুখে আশ্রম দ্বারে দাঁড়িয়ে ছিলেন আমার পথ চেয়ে। তারপর থেকে গরু গুলিকে চোখে চোখে রাখি। 

নাঃ, বসে কাজ নেই। গুরুর জন্য হোমের কাঠ ও ফুল তুলতে হবে। আজ বকুল ফুল নিয়ে যাব আর আকন্দ। অনেক লাল ফুল ফুটেছে গাছে। ওগুলোও নেব। মালা গেঁথে শিবের পূজায় দেব। আর ওই যে অজানা ফুলের গন্ধ পাচ্ছি ওগুলো নেব সখীর জন্য…..গুরু শুক্রাচার্যের হোম যজ্ঞের জন্য সমিধ কাঠ কুড়িয়ে জোড় করলাম।কুশ কেটে গোছা বেঁধে নিলাম । বনফুল চয়ন করলাম। আর সেই সুগন্ধি পুষ্প কিছু আলাদা করে নিলাম। সখী বড় খুশি হবেন।  সব এক জায়গায় নিয়ে , আবার গিয়ে বসলাম বট গাছ তলায়।  মৃত সঞ্জীবনীর থেকে মন সরে গিয়ে উদাসী হাওয়ায় মনে পড়ল গুরুকন্যার কথা।

এই   উদাসী হাওয়ার পথে পথে   মুকুলগুলি ঝরে;
আমি   কুড়িয়ে নিয়েছি,      তোমার      চরণে দিয়েছি–
লহো লহো করুণ করে॥
যখন যাব চলে     ওরা     ফুটবে তোমার কোলে,
তোমার   মালা গাঁথার আঙুলগুলি   মধুর বেদনভরে
যেন   আমায় স্মরণ করে॥

বৃষপর্বার দানব পরিচালকরা কয়েক দিন ধরে আমার গতিবিধি নিপুণভাবে লক্ষ্য রেখে চলেছে আমি উপলব্ধি করছি। ঋষি কন্যার কথায় ভেবে আমি বিভোর হয়ে ছিলাম। কাল সে তাঁর স্নিগ্ধ নরম অধর ন দিয়ে আমাকে ছুঁয়ে দেখছিল।। চকিত হলাম এক অসুর শিষ্যের শব্দে…. অসুররা আজ সেই গোচারণ ক্ষেত্রে এসে উপস্থিত হল । “তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে  কচ “…

যেহেতু আমি অসুর কুলের মধ্যেই দীর্ঘকাল ধরে বসবাস করছি এবং অসুরের অনেকেই  গুরু শুক্রাচার্য আশ্রমের শিষ্য,  সেহেতু তাদের সঙ্গে এক প্রকার মুখে বলা মিত্রতা স্থাপন হয়ে গিয়েছিল । সুতরাং কথা আছে এই বাহানায় তারা আমাকে ডেকে নিয়ে গেল বনের একান্তে।

আমার গোষ্ঠ বিহার সুখের হলো না । আমি নিরস্ত্র ছিলাম। অকস্মাৎ আমার উপর অস্ত্রের আঘাত নেমে এল।আমি বুঝে ওঠার আগেই অস্ত্রাঘাত । যদি বুঝে উঠতাম আর তাহলে হয়তো গুরু শুক্রাচার্য আমাকে যে প্রকারে অস্ত্র ও নিরস্ত্র যুদ্ধ শিক্ষা দান করেছেন তাতেই এই সামান্য দানবদের সঙ্গে  যুদ্ধ করা  কোনো ব্যাপার ছিল না ।

অসুররা আমাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলল। শুধু তাই নয় আমাদের অস্থি চিহ্ন, কোন কিছুই প্রমাণ রাখা যাবে না । মরণ সূত্র যাতে আবিষ্কার করা না যায় সেই জন্য আমার শরীরে টুকরোগুলি কে শিকারি কুকুর গুলোকে খাইয়ে দিল। যেহেতু আমি বৃহস্পতি পুত্র এবং দেবপক্ষ তাই কোন ভাবে যাতে আমি সঞ্জীবনী বিদ্যা না শিখতে পারি।  সেজন্য গোপনেই হত্যা…. তারপর ?

ক্রমশঃ

 দুর্গেশনন্দিনী 

পরবর্তী অংশ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.