বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ব্যাপ্তিকাল ছিল ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত। ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন— “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারে সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।” সেই ঐতিহাসিক সন্ত্রাসের সফল পরিসমাপ্তি হয়েছিল ১১৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতের লে: জেনারেল জগজিৎ সিংহ অরোরার কাছে ঢাকায় পাকিস্তানের লে: জেনারেল নিয়াজির নিঃশর্ত আত্ম সমর্পণে।
মুসলমান সত্যশোধক মণ্ডল-এর প্রতিষ্ঠাতা মুসলমান সমাজ সংস্কারক হামিদ দলওয়াই মুম্বইয়ের একটি বিশেষ পত্রিকার সংবাদদাতা হিসেবে ওপার বাংলার মুক্তিযুদ্ধ সম্বন্ধে খবর সংগ্রহ করতে এসেছিলেন। বিশিষ্ট গ্রন্থকার শৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তার পূর্ব-পরিচয় ছিল। সেই সুবাদে তিনি পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত ও সীমান্তের ওপারে এবং ত্রিপুরার মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য শৈলেশবাবুর সাহায্য নিয়েছিলেন। শৈলেশবাবুর ‘দাঙ্গার ইতিহাস’ গ্রন্থসূত্রে (মুসলমানদের প্রতি অধ্যায় ১৫, পৃ. ২৮০-২৮১) জানা যায়, মুম্বই ফিরে যাবার আগে হামিদ দলওয়াই তাকে বলেছিলেন—এদেশের মুসলমানরা চায়নি বাংলাদেশ স্বাধীন হোক। মুজিব তাদের কাছে বঙ্গবন্ধু নন, মুসলমানদের পরম অকল্যাণকারী। ভারতীয় মুসলমানদের ওই বিচিত্র মানসিকতার কারণ ব্যাখ্যা করে দলওয়াই বলেছিলেন— তারা মনে করেন অখণ্ড পাকিস্তান ভারতীয় মুসলমানদের স্বার্থরক্ষার জন্য এদেশের উপর যতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে, পাকিস্তান দ্বিধাবিভক্ত হলে তা আর সম্ভবপর হবে না। ঠিক সেই মুহূর্তে সেদিন দলওয়াইয়ের কথা শৈলেশবাবু বিশ্বাস করতে চাননি। তার পর তিনি বহু সাক্ষ্যপ্রমাণ দেখে বুঝেছিলেন, হাসিদ দলওয়াইয়ের কথা কত খাঁটি। পশ্চিমবঙ্গ-সহ ভারতীয় মুসলমানদের বড়ো একটা অংশই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও শেখ মুজিবুর রহমানের বিরোধী ছিল।
১৯৫৭ সালে রাষ্ট্রমন্ত্রী নবাব কাজেম আলি মির্জা বিধানসভায় ‘কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ’ এই মর্মে একটি বেসরকারি প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। বিধানসভার নির্দল সদস্য সৈয়দ বদরুদ্দোজা সেই প্রস্তাবে সই করতে রাজি না হওয়ায় কাজেম আলি তাকে ব্যঙ্গ করে কিছু কথা বলেছিলেন। বদরুদ্দোজা সাহেব রেগে গিয়ে চেঁচিয়ে তার উত্তরে বলেছিলেন—কাজেম আলি আমাকে ঘাঁটিও না। র্যাডক্লিপ সাহেব যখন মুর্শিদাবাদ ইন্ডিয়াকে দিলেন তখন তুমি এখান থেকে ছুটে করাচি যাওনি? লিয়াকত সাহেবের কাছে নিয়ে কান্নাকাটি করোনি? সূত্র : ‘বদসংহার এবং’ (১৯৪৬-১৯৫০); সুখরঞ্জন সেনগুপ্ত, পৃ. ৬৮।
১৯৪৭ সালের ৩ জুন মাউন্টব্যাটেন ভারতভাগ ও শাসনক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার ড. জাকির হোসেন সে সময় ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস সার্ভিসের একটি কনফারেন্স উপলক্ষ্যে মাদ্রাজে যান। সেখান থেকে ১০ জুন তিনি জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার লেটার হেড ব্যবহার করে Respected Quaid-iAzam’-কে লিখেছিলেন যে, তার অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলেই পাকিস্তান সম্ভব হয়েছে। (“…Pakistan which your almost superhuman efforts have brought into being”)। সেই সঙ্গে পাকিস্তানের শিক্ষাবিভাগে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করে তিনি লিখেছিলেন—“If I can be of any service in framing of educational programmes, I shall deem it a privilege to be able to do so”—(The Telegraph, 16.2.1992)।।
উল্লেখ্য, পরবর্তীকালে পণ্ডিত নেহরু সরকারের আমলে ড. জাকির হোসেন ভারতের রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হয়েছিলেন।
বিমলেন্দু ঘোষ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.