আজ মানব ইতিহাসের একটি কালো দিন। আজ থেকে একশ বছর আগে ১৩ ই এপ্রিল ১৯১৯ সালে এমনি একটি বৈশাখী নববর্ষের দিনে পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগের একটি ময়দানে সহস্র নারী পুরুষ একত্রিত হয়ে সাধারণ ও শান্তিপূর্ণ একটি সভা করছিলেন যেখানে অতর্কিতে ইংরাজ পুলিশের আক্রমণ নেমে আসে। ভারতে ইংরেজ রাজত্বের ইতিহাসকে কালিমালিপ্ত করে এই ঘটনা। জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি বর্ষিত হয়। বন্দুকের সমস্ত গুলি নিঃশেষিত করে কেড়ে নেওয়া হয় শিশু ও নারীসহ হাজার হাজার প্রাণ। তৎকালীন সময়ে এই ধরনের সভার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল, কিন্তু সভায় উপস্থিত জনগণ এই বিষয়ে অবগত ছিলেন না। ব্রিটিশ সরকারের হুকুমে প্রায় ১০ মিনিট ধরে গুলি বৃষ্টি চলেছিল। এই ঘটনা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের দিশাকে বদলে দেয়। আক্রোশ এবং ক্ষোভ থেকে ভারতে জাতীয়তাবাদের ঢেঊ উঠেছিল এই ঘটনার পর।

এই বিষয়ে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ডকে পত্র লিখে জানান- এই ধরনের ঘটনার কোন নৈতিক ঔচিত্য এবং রাজনৈতিক অপরিহার্যতা ছিল না কারণ নিরীহ মানুষের ওপর এই ধরনের অত্যাচার এমন একটি সরকার করেছে যার কাছে সম্পূর্ণ মানব জীবনকে নষ্ট করে দেওয়ার মতো অস্ত্র মজুত আছে। নিকট এবং সুদূর ভবিষ্যতেও এই ধরনের নৃশংসতার কোনও তুলনা খুঁজে পাওয়া যাবে না। এরপর তিনি এই ঘটনার বিরোধিতা করে ইংরেজ সরকার প্রদত্ত নাইট উপাধি ত্যাগ করেন।

একশ বছর পরেও এই ঘটনা আমাদের মনকে পীড়িত করে। ইতিহাস শুধুমাত্র ঘটনাক্রম নয়। ইতিহাস থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। এই ইতিহাস আমাদের আমাদের শেখায় জটিল কুটিল মানসিকটা কতোটা ভয়ানক হতে পারে। এই কুটিলতার বিপরীতে সন্ত রবিদাসের উক্তি মনে রাখতে হবে পাপ কখনো জয়ী হতে পারে না। মহাত্মা গান্ধী বলেছেন সম্পূর্ণ মানব ইতিহাসে হিংসা বা পাপ কখনই জয়লাভ করে না।

জালীয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পর দেশ এবং পৃথিবী অনেক এগিয়েছে, সর্ব শক্তিমান ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদও মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছে। এরপরও এমন বহু ঘটনার সাক্ষী আমরা হয়েছি যাতে বলতে হয় এই মুহূর্তে সব থেকে জরুরি হল মানবতার জন্য উন্নততর ভবিষ্যৎ নির্মাণ। এই মুহূর্তে বিশ্ব শান্তি স্থাপন এবং স্থায়ী পরিবেশ সম্মত বিকাশ আগের থেকেও অনেক বেশি জরুরি হয়ে ঊঠেছে। এই বার্তা স্কুল শিক্ষা স্তর থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে হবে যে শান্তি স্থাপন ব্যতীত বিকাশ অসম্ভব । বিশ্বের সমস্ত দেশকে একমত হয়ে একত্রিত হতে হবে । শক্তি সত্তা ও উত্তর দায়িত্ব সমন্বিত এক বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে । যে ব্যবস্থায় সমস্ত দেশের সমান অধিকার থাকবে । নজর রাখতে হবে শক্তি সম্পন্ন রাষ্ট্রের স্বৈরাচার যেন কায়েম হয়ে না বসে, সমস্ত রাষ্ট্রের মত প্রকাশের অধিকার যেন থাকে। এক্ষেত্রে ভারত এবং আরও কয়েকটি দেশ সংযুক্ত রাষ্ট্রের সুরক্ষা পরিষদের অধিক প্রভাব ও সক্রিয় ভূমিকা প্রার্থনা করছে।

আমরা অনাদিকাল থেকে বসুধৈব কুটুম্বকম এর আদর্শে বিশ্বাসী । তাই সমগ্র বৈশ্বিক উৎপাদনের ২৭ শতাংশ আমরা উৎপন্ন করলেও ভারত কখনই কোন দেশকে আক্রমণ করে নি, বরং বহুকাল ধরে বহু বিদেশি শক্তি আমাদের আক্রমণ করেছে এবং গত কয়েক দশক ধরে আতঙ্ক বাদের দংশন সহ্য করছে। এখন তাই ১৯৯৬ সাল থেকে সংযুক্ত রাষ্ট্রের দরবারে ভারতের করে রাখা কম্প্রিহেনসিভ কনভেনশন অন ইন্টারন্যাশনাল টেরোরিসম এর ওপর বিচার করার সময় এসেছে।

যে রাষ্ট্র আতঙ্কবাদকে প্রশ্রয় দেবে সেই দেশ বিশ্ব স্থায়িত্ব ও শান্তির জন্য ভয়ঙ্কর । বিশ্ব সমুদায়কে এটা স্থির করতে হবে আতঙ্কবাদকে প্রশ্রয় দেওয়া একটি দেশও যেন প্রতিবন্ধকতার হাত থেকে রক্ষা না পায়। সমস্ত দেশকে এটি মনে রাখতে হবে আতঙ্কবাদকে প্রশ্রয় দিলে আখেরে ক্ষতিই হবে। আতঙ্কবাদকে তখনই খতম করা যাবে যখন সকলেই এর ভয়ানক দিক সম্পর্কে সচেতন হয়ে একযোগে লড়াইয়ে নামব।

মহাত্মা গান্ধী বলেছেন – পৃথিবী আমাদের সকল চাহিদা পূরণ করতে পারে কিন্তু সকল লালসা পূরণ করতে পারে না, এই মুহূর্তে টেকনোলজির অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটেছে তাকে কাজে লাগিয়ে উন্নতিশীল দেশে উন্নয়নের কাজ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে, প্রাকৃতিক সম্পদের অকারণ দোহন বন্ধ করতে হবে। দিল্লীতে জালিয়ানওয়ালাবাগ সংগ্রহালয় স্থাপিত হয়েছে যেখানে এই ঘটনার ছবি, সংবাদ পত্রে পরিবেশিত খবর ইত্যাদি প্রদর্শিত হচ্ছে যা এই ঘটনার আধিকারিক বিবরণ পেশ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.