দীনদয়াল উপাধ্যায় : একাত্ম মানবতায় নিবেদিত এক মহাজীবন

কষ্টময় শৈশব ও মেধাবী ছাত্রজীবন

দীনদয়াল উপাধ্যায়ের শৈশব এক অতি সাধারণ উত্তর ভারতীয় নিম্ন মধ্যবিত্ত সনাতন হিন্দু পরিবেশে কেটেছে। দীনদয়াল উপাধ্যায়ের প্রপিতামহ বিখ্যাত জ্যোতিষি পণ্ডিত হরিরাম উপাধ্যায় মথুরা জেলার ব্রজভূমির নাগলা চন্দ্রভাগ গ্রামে বসবাস করতেন। তাঁর ছোট ভাই ছিলেন শ্রী ঝন্ডুরাম। পণ্ডিত হরিরাম উপাধ্যায় মহাশয়ের তিন পুত্র ভূদেব, রামপ্রসাদ এবং রামপেয়ারে। ঝন্ডুরাম মহাশয়েরও দুই পুত্র শঙ্করলাল ও বংশীলাল।
শ্রী রামপ্রসাদের পুত্র ছিলেন ভগবতী প্রসাদ। ভগবতী প্রসাদের বিবাহ শ্রীমতি রামপ্যায়ারীর সঙ্গে হয়েছিল। তিনি খুব ধর্মপরায়না মহিলা ছিলেন। হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণ ত্রয়োদশী, বিক্রম সংবত ১৯৭৩, ইংরাজী ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে সেপ্টেম্বর শ্রী ভগবতী প্রসাদের ঘরে এক পুত্র সন্তান জন্ম লাভ করে। সেই সময় শ্রীমতী রামপ্যায়ারী পিতা শ্রী চুন্নীলাল শুক্লার নিকট ধনকিয়াতে ছিলেন। ওনার পিতা ধনকিয়াতে (রাজস্থানে) স্টেশন মাস্টার ছিলেন। বালকের নাম রাখা হল দীনদয়াল। ডাক নাম ‘দীনা’। দুই বৎসর পরে শ্রীমতী রামপেয়ারীর কোলে দ্বিতীয় সন্তান আসে। তার নাম রাখা হয় শিবদয়াল ডাক নাম শিবু।

‌একান্নবর্তী পরিবার ও পরম্পরা

পণ্ডিত হরিরাম মহাশয়ের একান্নবর্তী পরিবার। পরিবারও অনেক বড়। পরিবারের মহিলাদের মধ্যে কলহ লেগেই থাকত। দীনদয়ালের বয়স যখন আড়াই বৎসর, তার পিতা ভগবতী প্রসাদ সেইসময় জলেশ্বরে সহায়ক স্টেশন মাস্টার ছিলেন। তিনি পারিবারিক কলহকে শান্ত করার জন্য নিজের কাকীমা ও বিমাতাকে (সত্য) নিজের কাছে জলেশ্বরে নিয়ে চলে আসেন এবং দীনা, শিবু ও রামপ্যায়ারীকে রাজস্থানের ধনকিয়া গ্রামে পাঠিয়ে দেন। চুন্নীলালের গ্রাম অর্থাৎ রামপ্যায়ারীর বাপের বাড়ী এবং দীনদয়ালের মামাবাড়ী ছিল ফতেহপুর সীকরীর কাছে আগ্রা জেলার গুড়কী মঢ়াই গ্রামে। আড়াই বৎসর বয়সে পিতৃগৃহ থেকে চলে আসার পরে দীনদয়াল আর কোনদিন সেখানে ফিরে যাননি। তার পালন পোষণ ও বিকাশ এক অদ্ভূত পরিস্থিতিতে হয়েছিল। এমন পরিস্থিতি যেখানে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশে বাধা পায়, কিন্তু দীনদয়াল সেই পরিবেশে শক্তি সঞ্চয় করে নিজের ব্যক্তিত্বের বিকাশ করেন। দীনদয়ালের জীবন শৈশব অবস্থা থেকে সংস্কার পরিপূর্ণ ছিল।

মৃত্যু দর্শন

মৃত্যুর দর্শন জীবিত মানুষের মনে বৈরাগ্য এনে দেয়। দীনদয়াল উপাধ্যায় শৈশব কালেই নিজের প্রিয়জনেদের মৃত্যু দেখে বিয়োগ জনিত ব্যাথা উপলব্ধি করেছেন। মাত্র আড়াই বছর বয়সে যখন দীনদয়াল নিজের মামাবাড়ীতে দাদুর কাছে আসেন তার কিছুদিন পরেই খবর আসে যে তার পিতা ভগবতী প্রসাদের মৃত্যু হয়েছে। দীনদয়াল পিতৃহীন হলেন, মা রামপ্যায়ারী বিধবা হলেন। দীনদয়ালের শৈশব তাঁর মায়ের অশ্রুভরা চোখ, দাদুর বিষগ্ন চেহারা দেখেছে। বালক অবোধমন সংবেদনশীলতাকে গ্রহণ করেছিল। পিতৃহারা শিশু দীনদয়ালের শৈশব বিধবা মায়ের কোলে কাটাতে থাকে। এদিকে শোক-তাপ চিন্তায় কাতর রামপ্যায়ারী অসুস্থ হয়ে পড়েন। অপুষ্টিতে ভুগে অবশেষে ক্ষয় রোগে আক্রান্ত হন। সেই সময় ক্ষয়রোগের অর্থ ছিল নিশ্চিত মৃত্যু। দীনদয়ালের বয়স তখন সাত এবং শিবদয়ালের পাঁচ বৎসর। মা তাদেরকে দাদুর কাছে রেখে মৃত্যুর পথে পাড়ি দেন, রামপ্যায়ারী শ্রীরামের চরণে আশ্রয় লাভ করেন। বাল্যকালেই দীনদয়াল পিতামাতার স্নেহ-ছায়া থেকে বঞ্চিত হন।
হয়ত নিয়তি এই বালককে মৃতুর সার্বিক দর্শন করাতে বদ্ধপরিকর ছিল। মায়ের মৃত্যুর দুই বৎসর পরেই মাতামহ শ্রী চুন্নীলাল স্বর্গবাসী হন। তখন ১৯২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস। দীনদয়াল নিজে দশ বৎসর বয়সে পিতা-মাতা, এবং মাতামহের স্নেহছায়া থেকে বঞ্চিত হয়ে মামার কাছে আশ্রয় গ্রহণ করেন। মামী খুবই স্নেহশীলা মাতৃসমা ছিলেন। দীনদয়াল অত্যন্ত গম্ভীর প্রকৃতির ছিলেন এবং দশ বৎসর বয়স থেকেই নিজের ছোট ভাই শিবদয়ালের প্রতি যথেষ্ট চিন্তিত এবং স্নেহশীল ছিলেন।
দীনদয়াল রাজস্থানের কোটানগরে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। ১৯৩১ সালে তিনি কোটা থেকে রাজগড় জেলায় (অলওয়ার) চলে আসেন। সেইসময় তার মামীমার মৃত্যু হয়। মাত্র ১৫ বৎসর বয়সে এতজন আপনজনের মৃত্যু দীনদয়ালকে কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করায়। এই ছোট বয়সে তাঁর উপর ছোট ভাই শিবদয়ালের দেখাশোনার সম্পূর্ণ ভার এসে পড়ে। আপনজনের বিয়োগে দুই ভাই এর মধ্যে স্নেহের সম্পর্ক অত্যন্ত সুদৃঢ় হয়ে ওঠে। এতদিন পর্যন্ত দীনদয়াল নিজের পালনকর্তাদের মৃত্যু শোকে দুঃখিত ছিলেন। কিন্তু মৃত্যু তার পরিপূর্ণরূপ দেখাতে বদ্ধপরিকর ছিল। দীনদয়ালের বয়স তখন ১৮ এবং নবম শ্রেণীর ছাত্র। সেই সময় তার ছোট ভাই শিবদয়াল গুটি বসন্তে আক্রান্ত হয়। তিনি তার ভাইকে রোগমুক্ত করার সবরকম চেষ্টা করেন। কিন্তু সব চেষ্টা বিফল করে, ১৯৩৪ সালের ১৮ই নভেম্বর শিবদয়াল তার বড় ভাই দীনদয়ালকে একলা ফেলে চিরবিদায় নেয়।
এতকিছু ঘটনার পরেও দীনদয়ালের মাথার উপর এক স্নেহশীলার আশীর্বাদ ছিল। বৃদ্ধা দিদিমা দীনদয়ালকে ভীষণ ভালবাসতেন যদিও নিজের লেখাপড়া ও অন্যান্য পারিবারিক কারণে তিনি দিদিমার কাছে বেশী থাকতে পারতেন না তবুও দুজনের মধ্যে একটা আত্মিক টান ছিল। দীনদয়ালের বয়স যখন ১৯, দশম শ্রেণী পাশ করেছেন সেই সময় ১৯৩৫ সালে এক শীতের দিনে তাঁর দিদিমা অসুস্থ হয়ে সংসার ত্যাগ করেন।
বাবা, মা, দাদু, মামীমা, ছোটভাই অবশেষে দিদিমার মৃত্যু তাঁকে জীবনে অভিজ্ঞ করে তুলেছিল। মৃত্যুর এই প্রহার তাঁকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করতে পারেনি বরং তাঁকে এক সতেজ উদাসী যুবক তৈরী হতে সাহায্য করে। দীনদয়ালের এক মামাতো বোন ছিল। ভাই ও বোনের মধ্যে এক মধুর সম্পর্ক ছিল। তিনি তখন আগ্রাতে ইংরেজীতে এম.এ. পড়ছিলেন সেই সময় বোন রমাদেবী অসুস্থ হয়ে পড়েন। দীনদয়াল নিজের পড়া ছেড়ে রমাদেবীর সেবা শুশ্রষা করে তাকে সুস্থ করার সব রকম চেষ্টা করেন। কিন্তু নিয়তির পরিহাস—সব চেষ্টা বিফল করে রমাদেবীর মৃত্যু হয়। ১৯৪০ সালে ২৪ বৎসর বয়সে দীনদয়ালের মনে অনেক মৃত্যুর আঘাত তাকে বৈরাগ্যের পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

অক্ষরশঃ অনিকেত

দীনদয়াল শৈশবে আড়াই বৎসর বয়স পর্যন্ত পিতৃগৃহে ছিলেন। তারপরেই তাঁর প্রবাসী জীবন শুরু হয়, আর তিনি নিজ গৃহে ফিরে আসেননি। পারিবারিক কারণে তিনি তার দাদু চুন্নীলালের সাথে ধনকিয়াতে ছিলেন। চুন্নীলাল তার দুই পুত্র নখীলাল ও হরিনারায়ণ এবং জামাই ভগবতী প্রসাদ (দীনদয়ালের পিতা) এর মৃত্যুতে প্রচণ্ড শোক পেয়েছিলেন। তিনি চাকরী ছেড়ে নিজের বাড়ী গুড়কী মড়াই-এ ফিরে এসেছিলেন। দীনদয়ালও ধনকিয়া ছেড়ে গুড়কী মড়াই চলে এসেছিলেন। নয় বৎসর বয়স পর্যন্ত দীনদয়ালের পড়ার কোন সুব্যবস্থা হয়নি। তারপর তিনি নিজের মামা রাধারমনের কাছে চলে আসেন। মামা সেই সময় গঙ্গাপুরে সহায়ক স্টেশন মাষ্টার ছিলেন। সেখানে তিনি চার বৎসর লেখাপড়া করেন। গঙ্গাপুরে এর বেশী পড়ার ব্যবস্থা ছিলনা। সেইজন্য ১৯২৯ সালের ১২ই জুন তিনি কোটার একটি স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে তিনি ‘সেল্ফ সাপোর্টিং হাউস’ এ তিন বৎসর কাটান। তারপর তাকে রাজগড়ে (অলওয়ার জেলা) চলে আসতে হয়। মামা রাধারমনের খুড়তুত ভাই নারায়ণ শুক্ল সেখানে স্টেশন মাস্টার ছিলেন। দীনদয়াল তার কাছে দু বৎসর ছিলেন। ১৯৩৪ সালে নারায়ণ শুক্ল বদলী হয়ে সীকর চলে যান। এক বৎসর সীকর এ থেকে দীনদয়াল দশম শ্রেণী উত্তীর্ণ করেন। সেখান থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য পিলানী যান এবং সেখান থেকে ১৯৩৬ সালে ইন্টার মিডিয়েট পাশ করেন। সেই বৎসর বি.এ পড়ার জন্য কানপুর যান, সেখান থেকে বি.এ. পাশ করে এম.এ. পড়ার জন্য আগ্রা যান। সেখানে রাজমণ্ডীতে বাড়ী ভাড়া নিয়ে থাকেন। ১৯৪১ সালে ২৫ বছর বয়সে বি.টি করার জন্য প্রয়াগ চলে যান। এর পরেই তাঁর জীবন সার্বজনিক হয়ে পড়ে। তিনি অখণ্ড প্রবাসী হয়ে যান।
২৫ বৎসর বয়স পর্যন্ত দীনদয়াল উপাধ্যায় রাজস্থান ও উত্তর প্রদেশের ১১টি স্থানে কিছু কিছু সময় ঘুরে ঘুরে কাটিয়েছেন। নিজ বাসস্থান, দায়িত্ব এবং সুবিধা হয়ত মানুষের মনে মোহ জাগায়। দীনদয়ালের শৈশব এই মোহজাল থেকে শতহস্ত দূরে ছিল।
সামাজিক জীবনে চিরদিনই তিনি ভ্রমণশীল ছিলেন, নিজের ঘর বলতে কিছুই ছিল না। প্রতিদিন নতুন স্থানে, নতুন নূতন মানুষের সাথে পরিচয় ও তাদের সাথে আন্তরিক পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন এই কার্যশৈলি তিনি বালকাবস্থাতেই শিখে ছিলেন।

মেধাবী ছাত্র-জীবন

প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য নয় বৎসর বয়স পর্যন্ত দীনদয়াল লেখাপড়া শুরু করতে পারেননি। ১৯২৫ সালে গঙ্গাপুরে তার মামা রাধারমনের কাছে তাঁর লেখাপড়া শুরু হয়। বাড়ীতে অন্য কোন বিদ্যার্থী না থাকার কারণে সেখানে পড়ার কোন পরিবেশ ছিল না। সাংসারিক অবস্থা খুব টানাটানির মধ্যে ছিল, কোনরকম সুবিধা তিনি পড়ার জন্য পেতেন না। দীনদয়াল যখন দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়েন তখন তার মামা রাধারমন খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি মামার সেবা করার জন্য তাঁর সাথে আগ্রা চলে যান। পরীক্ষার কিছুদিন আগে রাধারমন গঙ্গাপুর ফিরে আসেন। সেই সময় দীনদয়াল পরীক্ষা দেন এবং প্রথম স্থান পান। মামার সেবা করতে করতে তিনি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর পরীক্ষায় ভালভাবে উত্তীর্ণ হন। সেই সময় থেকেই বাড়ীর সকলে এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিশ্চিত হন তিনি কতটা মেধাবী ছাত্র।
পঞ্চম থেকে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত তিনি কোটাতে লেখাপড়া করেন এবং অষ্টম শ্রেণীর জন্য তিনি রাজগঢ়ে যান। গণিতের ক্ষেত্রে তার অদ্ভুত ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়। যখন তিনি নবম শ্রেণীর ছাত্র সেইসময় দশম শ্রেণীর গণিতের প্রশ্ন সুন্দরভাবে সমাধান করতেন। পরের বছর তাঁর মামার চাকুরীর বদলির কারণে তাকে সীকর যেতে হয়। তিনি দশম শ্রেণীর পরীক্ষা সীকর কল্যাণ হাইস্কুল থেকে দেন। তিনি শুধুমাত্র স্কুলেই প্রথম হননি, বোর্ডের মধ্যে সর্বপ্রথম স্থান লাভ করেন। তৎকালীন সীকর এর মহারাজা কল্যাণ সিং সেইসময় তাঁকে স্বর্ণপদক, ১০টাকা মাসিক ছাত্রবৃত্তি এবং বইখাতা কেনার জন্য আড়াইশো টাকা বৃত্তি স্বরূপ দান করেন।
সেইসময় উচ্চশিক্ষার জন্য পিলানী খুব প্রসিদ্ধ ছিল। দীনদয়াল ইন্টারমিডিয়েট পড়ার জন্য ১৯৩৫ সালে পিলানী চলে যান। ১৯৩৭ সালে ইন্টার মেডিয়েট পরীক্ষায় তিনি সমস্ত বোর্ডের মধ্যে প্রথম স্থান লাভ করেন এবং সব বিষয়ে অত্যন্ত ভাল নম্বর পান। কলেজে তিনিই প্রথম এই সম্মান জনক নম্বর পেয়েছিলেন। সীকর মহারাজার মত ঘনশ্যাম দাস বিড়লাও একটি স্বর্ণপদক, ১০ টাকার মাসিক ছাত্রবৃত্তি এবং বইখাতা কেনার জন্য ২৫০টাকা বৃত্তি দিয়েছিলেন।
১৯৩৯ সালে কানপুরে সনাতম ধর্ম কলেজ থেকে তিনি প্রথম শ্রেণীতে বি. এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ইংরাজী সাহিত্যে এম.এ করার জন্য তিনি আগ্রাতে সেন্ট জোন্স কলেজে ভর্তি হন। এম.এ. প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণীর নম্বর পান কিন্তু বোনের অসুস্থতার কারণে এম.এ. ফাইনাল পরীক্ষায় বসতে পারেননি। মামার ইচ্ছানুযায়ী দীনদয়াল প্রশাসনিক পরীক্ষায় (সিভিল সার্ভিসে) বসেন, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, ইন্টারভিউতেও উত্তীর্ণ হয়ে নির্বাচিত হন। কিন্তু প্রশাসনিক কাজকর্মে ইচ্ছা না থাকয়ে তিনি প্রয়াগে চলে যান বি.টি পড়ার জন্য।
তাঁর এই গভীর অধ্যয়ন সামাজিক জীবনে প্রবেশ করার পর আরও বৃদ্ধি পায়। বিবিধ সামাজিক ও দার্শনিক সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষমতা যে তার মধ্যে আছে তা তার ছাত্র জীবনেই দেখা গিয়েছিল।
ছাত্র জীবনে আগ্রাতে নানাজী দেশমুখ এবং দীনদয়াল উপাধ্যায় একসাথে থাকতেন। দীনদয়ালের সহজ, সরল, সততার অভিব্যক্তি প্রকাশ করার জন্য নানাজী একটি ঘটনার কথা এইভাবে শুনিয়েছিলেন।
“একদিন সকালে আমরা দুজন বাজারে গিয়ে দু পয়সার সজি কিনে ঘরে ফিরছি, এমন সময় দীনদয়াল হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, নানাজী খুব সমস্যা হয়ে গেছে। আমি জিজ্ঞাসা করাতে সে বলল “আমার পকেটে চার পয়সা ছিল। তার মধ্যে একটা অচল পয়সা। ঐ অচল পয়সাটাই আমি সজিওয়ালীকে দিয়েছি। আমার পকেটের অবশিষ্ট দুটো পয়সাই ভাল। সে কি ভাবছে কে জানে? আমি তাকে ভাল পয়সাটা দিয়ে আসি।
ওনার চেহারায় কেমন একটা অপরাধীর ভাব ফুটে উঠল। আমরা আবার ফিরে সেই সজিওয়ালীর কাছে পৌঁছে তাকে সব ঘটনা বললাম, কিন্তু সে বলতে লাগল কে খুঁজবে তোমার অচল পয়সা? যা দিয়েছো সেটা থাক, তোমরা ফিরে যাও। কিন্তু দীনদয়াল ফিরতে নারাজ। অবশেষে দীনদয়াল নিজেই অনেক পয়সার মধ্যে থেকে তার অচল পয়সা খুঁজে বার করে নিজের পকেট থেকে ভাল পয়সা দিয়ে তবে শান্তি পেলেন। এই কাণ্ড দেখে বুড়ী সজীওয়ালীর চোখ জলে ভরে এসেছিল। সে বলতে লাগল, বাবা। তুমি কত ভাল মানুষ, ভগবান তোমার ভাল করবেন।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সঙ্গে সম্পর্ক

ভারতের স্বাধীনতার প্রাক্কালে এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দীনদয়ালজী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৩৭ সালের ভোটে উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেস জয় লাভ করার পরে মুসলীম লীগ এবং কংগ্রেসের মধ্যে বোঝাপড়া নষ্ট হয়ে যায়। মুসলীম লীগের নেতা চৌধুরী খালিক অজুমা কংগ্রেসের সাথে একত্রে কাজ করতে অস্বীকার করে, সেই সময় দ্বি-রাষ্ট্রবাদের সূচনা হয়। সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে পৃথক রাষ্ট্রের জন্য মূলসমানদের মধ্যে আক্রমণাত্মক মানসিকতা তৈরী করা হচ্ছিল। ১৯৪০ সালে লাহোর অধিবেশনে মুসলীম লীগ পাকিস্তান তৈরীর প্রস্তাব সমর্থন করে। এই পৃথক রাষ্ট্রের মনোভাব ভারতের প্রত্যেক রাষ্ট্রবাদী মনোভাবাপন্ন মানুষের মনে আঘাত হানে। দীনদয়াল উপাধ্যায়ের যুবক মন এই মানসিকতায় বিচলিত ও আহত হয়। সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজরা এই দ্বি-রাষ্ট্রবাদী সাম্প্রদায়িক মানসিকতাকে প্রশ্রয় দিয়ে চলছিল। দীনদয়াল উপাধ্যায় এই দ্বিরাষ্ট্রবাদী সাম্প্রদায়িক বিছিন্নতাবাদের প্রচণ্ড ভাবে বিরোধিতা করতে চেয়েছিলেন। এইরকম পরিস্থতিতে তিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত হলেন। সংঘের কাজকর্ম তার মানসিকতার অনুকুলে ছিল। কানপুরে সহপাঠী বালুজী মহাশব্দে তাকে সঙ্ঘে নিয়ে আসেন। সেখানে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ কেশররাও বলিরাম হেডগেওয়ারের এর সঙ্গে সাক্ষাত হয়। বাবা সাহেব আপটে এবং দাদা রাও পরমার্থ, ওনার ছাত্রাবাসেই এসে থাকতেন। স্বতন্ত্রবীর বিনায়ক দামোদর সাভারকার কানপুরে এলে দীনদয়াল উপাধ্যায় তাকে সঙ্ঘ শাখায় আমন্ত্রিত করে বৌদ্ধিক বর্গ করিয়েছিলেন। কানপুরে শ্রী সুন্দর সিং ভাণ্ডারী দীনদয়ালের সহপাঠী ছিলেন।
রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ অনুশাসিত যুবকদের একটি সংগঠন যেখানে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কার্যকর্তা তৈরী করা হয়। এই প্রশিক্ষণ তিন বৎসরের। সেইসময় গ্রীষ্মকালে নাগপুরে চল্লিশ দিনের এই প্রশিক্ষণ শিবির চলত এবং সেটাকে ‘সঙ্ শিক্ষা বর্গ’ বলা হত। দীনদয়াল উপাধ্যায় ১৯৩৯ সালে প্রথম বর্ষের শিক্ষাবর্গ এবং ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষাবর্গ শেষ করেন। প্রশিক্ষণের পরে তিনি উপলব্ধি করেন যে ঐক্যবদ্ধ ভাবে সংস্কারিত সমাজ দ্বারা স্বাধীনতার অধিকার অর্জন করা ও তার পরিপূর্ণ ব্যবহার সম্ভব।
দীনদয়াল উপাধ্যায় সঙ্ঘে শারীরিক কার্যক্রম খুব ভালভাবে করতে পারতেন না, কিন্তু বৌদ্ধিক পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অর্জন করেন।
এ সম্পর্কে শ্রী বাবা সাহেব আপ্তে লিখছেন—“উত্তর পত্রে দীনদয়ালজী অনেকটা অংশ পদ্যরূপে লিখতেন, কিন্তু তা শুধুমাত্র ছড়া বা কল্পনা ছিল না। গদ্যের স্থানে পদ্য আকারে লিখতেন, যা অত্যন্ত সঠিক ও শুদ্ধ থাকত। যেটা পড়ে যে কেউ প্রভাবিত হত।”
নিজের পড়া শেষ করে এবং সঙ্ঘের দ্বিতীয় বর্ষের প্রশিক্ষণ শেষে দীনদয়াল উপাধ্যায় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রচারক হয়ে যান। আজীবনকাল সংঘের প্রচারকই রয়ে যান। ১৯৪২ সাল থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত তিনি উত্তরপ্রদেশে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রচারক হিসাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন।
দীনদয়াল উপাধ্যায়ের পরিবার পরিজন-বিশেষতঃ মামা তার এই সিদ্ধান্তে খুবই বিরক্ত ছিলেন। প্রশাসনিক কাজকর্ম পছন্দ নয় সেইজন্য তিনি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা পাশ করেও চাকুরী করেননি, কিন্তু সকলে ভেবেছিল তিনি হয়ত অধ্যাপনার কাজে যুক্ত হবেন কারণ তিনি অধ্যাপনা খুবই পছন্দ করতেন। সেইজন্য কানপুর থেকে বিটি পাশ করেন। কিন্তু দীনদয়াল উপাধ্যায় ঘর ছেড়ে সন্ন্যাসীদের মত আজীবন প্রচারক হিসাবে সঙ্ঘে যোগ দিলে তার মামা খুবই দিলে দুঃখ পান। উত্তরপ্রদেশের লখীমপুর জেলায় জেলা প্রচারক হিসাবে তিনি নিযুক্ত হন। ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগ দ্বারা পাকিস্তান তৈরীর প্রস্তাব পাশ হওয়ার পরে সাম্প্রদায়িক সমস্যা, হিংসা বেড়ে গিয়েছিল। দীনদয়ালের মন এই পরিস্থিতির প্রতিকারের জন্য অস্থির হয়ে উঠল। তিনি পরিবার পরিজন ভুলে সম্পূর্ণ রূপে সঙ্ঘের কাজে লিপ্ত হয়ে গেলেন।
তিনি তার মামাকে একটি চিঠিতে লিখলেন “আমাদের পতনের কারণ আমাদের মধ্যে সংগঠনের অভাব। তাছাড়া অশিক্ষা, অন্ধবিশ্বাস ইত্যাদি আমাদের পিছিয়ে থাকার কারণ। আর ব্যক্তিগত নাম ও যশের কথা বলেছেন? সে তো আপনিও জানেন গোলামদের আবার কিবা নাম আর কিবা যশ।
নিজের কাজের প্রেরণা যুবকাবস্থায় ইতিহাসের যে ধারা থেকে তিনি। গ্রহণ করেছিলেন নীচের পত্র থেকে তা জানা যায়—
“যে সমাজ ও ধর্মের রক্ষার জন্য ‘রাম’ বনবাস গমন করেছিলেন, কৃষ্ণ অনেক কষ্ট করেছেন, রানা প্রতাপ জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরেছেন, শিবাজী তাঁর সর্বস্ব অর্পণ করেছেন, গুরু গোবিন্দ সিংহের ছোট ছোট দুটি সন্তানকে জীবন্ত দেওয়ালে গেঁথে দেওয়া হয়েছে তাদের জন্য আমরা আমাদের। জীবনের আকাঙ্খা, মিথ্যা বাসনাকে ত্যাগ করতে পারব না?”
১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত তিনি লখীমপুরে প্রচারক ছিলেন। প্রথমে তিনি জেলার এবং পরে বিভাগের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কাৰ্য্যসিদ্ধতা, সংস্কারক্ষমতা এবং বৌদ্ধিক প্রখরতা দেখে ১৯৪৫ সালে তাকে সম্পূর্ণ উত্তরপ্রদেশের সহ-প্রান্ত প্রচারক-এর দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই সময় উত্তর প্রদেশের প্রান্ত প্রচারক ছিলেন শ্রী ভাউরাও দেওরস। দীনদয়াল উপাধ্যায়ের সংগঠনাত্মক প্রতিভা এবং সঙ্ঘ কাৰ্য্যে তার যোগদানের বিষয়ে শ্রী ভাউরাও দেওরস লেখেন “সঙ্ঘের সেই প্রথম দিনে, যখন কাজ অনেক কন্টকাকীর্ণ ছিল, সেই সময় তুমি (শ্রী উপাধ্যায়) কাজের জন্য বেরিয়ে পড়েছিলে। সেইসময় সঙ্ঘের কার্যকারিতা সম্পর্কে সমগ্র উত্তর প্রদেশের জনতা কিছুই জানত না। তুমি স্বয়ংসেবক হিসাবে এই কাৰ্য্যভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলে। আজ সঙ্ঘের বিশাল এইরূপ এবং কাৰ্য্যকর্তারা তোমারই পরিশ্রম এবং কর্তব্যের ফল। অনেক সজ্ঞা কার্যকর্তা তোমার জীবনের আদর্শকে গ্রহণ করে এগিয়ে চলেছে। একজন আদর্শ স্বয়ংসেবকের যে সকল গুণের কথা শুনেছিলাম, তুমি ছিলে তার মূর্তিমান প্রতীক। তুমি প্রখর বুদ্ধিমত্তা, অসামান্য কৃতিত্ব, নিরহংকার ও নম্রতার এক উজ্জ্বল আদর্শ।
শুরুর সেই দিনগুলিতে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ উত্তরপ্রদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অধিক পল্লবিত হয়েছিল যার অন্যতম কারণ ছিল দীনদয়াল উপাধ্যায়।
গান্ধী হত্যার মিথ্যা অজুহাতে যখন সঙ্ঘ নিষিদ্ধ হল সেই সময় দীনদয়ালজী প্রচার ও সত্যাগ্রহ আন্দোলনের মূল সূত্রধার ছিলেন। সরকার ‘পাঞ্চজন্য পত্রিকাকে বন্ধ করে দিয়েছিল। অজ্ঞাতবাসে থেকেই দীনদয়ালজী ‘হিমালয় নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন সেটাও বন্ধ করে দেওয়া হলে তিনি রাষ্ট্রভক্ত’ প্রকাশ করেন। এই সময়েই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সংবিধান লেখা হয় যাতে দীনদয়ালজীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

লেখক এবং সাংবাদিক

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের রাষ্ট্রীয়তা এবং রাষ্ট্রীয় স্বাতন্ত্র সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার বাইরে ভিন্ন বিশ্লেষণ ছিল। সঙ্ঘে কিশোর বিদ্যার্থীর সংখ্যা অনেক। ১৯৪৬ সালের এপ্রিল মাসের কথা, এক প্রান্ত বৈঠকে প্রান্তপ্রচারক ভাউরাও খুব চিন্তিত ভাবে বললেন আমাদের চিন্তাধারা বালকের জন্য তাদের ভাষায় কোথাও ব্যক্ত করা নেই। বাস্তবে ছোটদের জন্য শিশু সাহিত্যের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। দীনদয়ালজী চুপচাপ সব কথা শুনলেন। তারপরে সারা রাত্রি জেগে তিনি লিখলেন। সকালে সেই পাণ্ডুলিপি ভাউরাও এর হাতে দিয়ে বললেন দেখুন তো এই বইটা। বালক স্বয়ংসেবকদের জন্য কেমন হবে? সকলে আশ্চর্য হয়ে দেখলেন যে দীনদয়ালজী এক রাতের মধ্যে একটি ছোটদের উপন্যাস লিখে ফেলেছেন। তাঁর প্রথম বই ‘সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত’ নামে প্রকাশিত হয়।
সেইসময় স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য যে পথ অবলম্বন করা হচ্ছিল তার সঙ্গে সঙ্ নীতিগত ভাবে একমত হতে পারছিল না। সঙ্ঘ রাজনৈতিক দৃঢ়তার অভাব বোধ করছিল। সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত’ বই এর ঐতিহাসিক চরিত্র চন্দ্রগুপ্ত এবং চাণক্যের মাধ্যমে দীনদয়াল উপাধ্যায় পরাক্রম এবং রণনীতি কুশলতায় কিশোর মনকে জাগ্রত করার চেষ্টা করেন। তিনি তার চেষ্টায় সফল হন। এই পুস্তকের ভাষা এতই প্রখর এবং আকর্ষক ছিল যে একবার পড়া শুরু করলে, শেষ পর্যন্ত পড়ার ইচ্ছা হত। ভাষার লালিত্য এবং বিচারের প্রখরতা এই লেখার বৈশিষ্ট ছিল।
শিশু সাহিত্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে তরুণদের জন্যও এইরকম কোন সাহিত্য লেখার চাহিদা বাড়ছিল। এই চাহিদা পূরণের জন্য দীনদয়ালজী দ্বিতীয় উপন্যাস ‘জগদগুরু শঙ্করাচার্য রচনা করেন।
দীনদয়াল উপাধ্যায়ের দ্বিতীয় উপন্যাসের চরিত্র এবং ঘটনা পুরানো, কিন্তু এর ভাব, বিচার, পরিবেশ সবই নতুন। দীনদয়াল যে শাখা পদ্ধতিতে সঙ্ঘের কাৰ্য্য করতেন, তাতে সময় দেওয়ার জন্য যুবকদের প্রেরণা দেওয়া, দেশের সাংস্কৃতিক গৌরব বাড়ানো এবং নিজের জীবনে সমর্পণ করার ইচ্ছা তৈরী করাই এই রচনার উদ্দেশ্য ছিল।
‘সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত এবং ‘জগদগুরু শঙ্করাচাৰ্য্য এই উপন্যাস গুলির প্রকাশন যথাক্রমে ১৯৪৬ এবং ১৯৪৭ সালে হয়। দীনদয়াল উপাধ্যায়ের সম্পূর্ণ সাহিত্য জীবনে, এইদুটি সাহিত্যই সৃষ্টি হয়। তার সাহিত্যিক রূপে প্রথম সৃষ্টি এতটাই প্রখর ছিল যে, তিনি যদি আগামী দিনে সাহিত্যের ক্ষেত্রে এগোতেন তাহেেল হয়ত ভারতবর্ষের একজন প্রথমসারির সাহিত্যিক হিসাবে গণ্য হতেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালের পরে তিনি আর কোন উপন্যাস রচনায় হাত দেন নি।
রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রচারক থাকাকালীন দীনদয়াল উপাধ্যায় অনেকগুলো পত্র-পত্রিকা বের করেন। তাঁর চেষ্টা ও প্রেরণায় ১৯৪৫ সালে মাসিক রাষ্ট্রধর্ম ও সাপ্তাহিক পাঞ্চজন্য প্রকাশিত হয়। কিছুদিন পরে দৈনিক পত্রিকা স্বদেশ প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকাগুলির প্রত্যক্ষ সম্পাদক হিসাবে দীনদয়ালজী কখনোই যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু বাস্তবিক সঞ্চালক, সম্পাদক ও আবশ্যকতা অনুসারে কম্পোজিটর মেসিন ম্যান এসব কাজও তিনি করতেন।

কেন অখণ্ড ভারত?

দীনদয়াল উপাধ্যায় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের মাধ্যমে প্রত্যেক মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রবাদের জাগরণ করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু কুটিল সাম্রাজ্যবাদী ইংরাজরা অন্যরকম চিন্তাভাবনা করে রেখেছিল। ইংরাজরা স্বাধীনতার আন্দোলনকে লালসার অভিযানে বদলে দিয়েছিল। ভারত ছেড়ে যাওয়ার শর্ত হিসাবে ইংরাজরা সম্প্রদায়িক আধারের উপর ভিত্তি করে ভারতকে বিভাজিত করতে দ্বি-রাষ্ট্রবাদের উপর জোর দেয়। সেইসময় ভারতের নেতৃত্বে থাকা কোন ব্যক্তি কোন প্রতিবাদ করেননি এবং ইংরাজরা ভারতকে বিভক্ত করে অবশেষে দেশ ছাড়ে। এই বিভাজনের ফলস্বরূপ প্রচুর রক্তপাত হয়। দেশ দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।
ভারত ভাগ দীনদয়াল উপাধ্যায়ের মনে আঘাত হেনেছিল।
দীনদয়াল উপাধ্যায়ের মত অনুসারে অখণ্ড ভারত কেবলমাত্র দেশের ভৌগোলিক একতার পরিচায়ক নয়, সমগ্র ভারতীয় জীবনের দৃষ্টিকোণ থেকে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের দর্শন করায়। অতএব আমাদের জন্য অখণ্ড ভারত কোন রাজনৈতিক শ্লোগান নয় বরং এটি আমাদের সমগ্র জীবনদর্শনের মূলাধার।
অখণ্ড ভারতের সঙ্গে সম্পর্কিত ঐতিহাসিক, ভৌগলিক এবং সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠভূমির বিশ্লেষণার্থে উপাধ্যায়জী ‘অখণ্ড ভারত কেন’ নামক একটি বই লেখেন। সেই বইয়ে তিনি প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের উপর নির্ভর করে যুগ যুগান্তর ধরে চলে আসা ভারতীয় সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পরম্পরার উল্লেখ করেছেন যা ভারতকে ভৌগলিক দিক থেকে একাত্ম-রাষ্ট্র রূপে বিকশিত করতে সাহায্য করেছে। বইটি অনেক তথ্য সমৃদ্ধ এবং এর ভাষা খুবই ভাবপ্রবণ।
উপাধ্যায়জী নিজের বইয়ে ভারতের দ্বিধাবিভক্ত হওয়ার কারণ হিসাবে মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদের নীতি, কংগ্রেসের রাষ্ট্রীয়তার বিকৃত ধারণা ও তুষ্টিকরণের নীতিকে দায়ী করেছেন। ১৮৮৭ সালের ২০ ডিসেম্বর স্যার সৈয়দ আহমেদ যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তাতে তিনি মুসলমানদের কংগ্রেস এবং হিন্দুদের থেকে পৃথক থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। উপাধ্যায়জী এই বই-এ সেটা সুবিস্তৃত বর্ণনা করেছেন। এই ভাষণ মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রথম ধাপ, যা আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ও মুসলিম লীগ পাকিস্তানের পৃথক হওয়ার চাহিদাকে বাস্তবিক রূপে বিকশিত করেছে।
কংগ্রেসের হিন্দু-মুসলিম নীতির এবং মিশ্রিত সংস্কৃতির সিদ্ধান্তকে পরোক্ষভাবে দ্বি-রাষ্ট্রবাদী নীতি হিসাবে উপাধ্যায়জী ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন মুসলিমদের আলাদা সংস্কৃতি এবং ঐ সংস্কৃতির পোষণের বিচারই তুষ্ঠিকরনের জন্ম দেয় এবং রাষ্ট্রীয়তার অবধারণাকে বিকৃত করে। তিনি বলেন খিলাফত আন্দোলনকে রাষ্ট্রীয় আন্দোলনের আখ্যা দিয়ে আমরা আমাদের রাষ্ট্রীয়তাকে কলঙ্কিতই করিনি উপরন্তু মুসলিমদের মনে এই ধারণার সৃষ্টি করেছি যে তাদের রাষ্ট্রীয় হওয়ার জন্য ইসলামের নামে প্রচলিত ভারত বাহ্য প্রবৃত্তির ত্যাগের কোন প্রয়োজন নেই বরং তাদের ইচ্ছা হলেই তারা ভারতের রাষ্ট্রীয়তার অঙ্গ হতে পারে ফলস্বরূপ ১৯২৩ সালে কাকীনাড়া কংগ্রেসের অধ্যক্ষ মহম্মদ আলী বন্দেমাতরম সঙ্গীতের বিরোধীতা করে।
কংগ্রেসের এই প্রবৃত্তিই সমগ্র মুসলিম সমাজকে বিচ্ছিন্নতাবাদী মুসলিম নেতৃত্বের পিছনে দাঁড় করিয়ে দেয়। যদিও ১৯৩৫-৩৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ সেইরকম ভাবে সফলতা পায়নি, কিন্তু কংগ্রেস সরকারের মুসলিম তোষণনীতির সুবিধা নিয়ে মুসলমানরা নিজেদের সংগঠনকে আরো মজবুত করে। জিন্না কংগ্রেসের সঙ্গে বোঝাপড়া করার জন্য প্রথমে ১৪ সূত্রীয় এবং ২১ সূত্রীয় কার্যক্রমের ব্যবস্থা করে। কিন্তু বোঝাপড়া সফল হয়নি, কারণ তারা সমঝোতাই চায়নি। কংগ্রেস মন্ত্রীমণ্ডলের পদত্যাগের ফলস্বরূপ মুসলীম লীগ মুক্তি দিবস পালন করে এবং ১৯৪০ সালে লাহোরে পাকিস্তানকে নিজেদের স্থান হিসাবে ঘোষণা করে।
ইংরাজদের শর্ত ছিল ভারত বিভাজন না মেনে নিলে ভারত স্বাধীনতা পাবে না এবং রক্তপাত হবে। দীনদয়ালজী এই তথ্য মেনে নিতে পারেনি নি। তাঁর বক্তব্য ছিল কংগ্রেসের নেতারা যদি নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থেকে ভারতের জনজাগৃতিতে সাহায্য করত তাহলে ইংরাজরা অখণ্ড ভারত ছেড়ে যেতে বাধ্য হত এবং কংগ্রেসের হাতেই সব ক্ষমতা সঁপে দিয়ে যেতো।
রক্তপাতের বিষয়ে তার মত ভারত বিভাজনের পূর্বে এবং পরে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে তত মৃত্যু দুই বিশ্বযুদ্ধে হয়নি। তাছাড়া লুট, অপহরণ এবং হত্যাকাণ্ডে মানুষের জঘন্যতম পশুবৃত্তির প্রকাশ দেখা গেছে, সে সব কোন যুদ্ধেই দেখা যায় না।


ভারত খন্ডিত হওয়ায় আমাদের কোন সমস্যার সমাধান তো হয়নি বরং সমস্যা আরো জটিল হয়েছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে বিবাদের কারণে আন্তঃরাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে ভারতের গৌরবজ্জ্বল মুখ বার বার নীচু হয়েছে। হিন্দু-মুসলীম সমস্যার কোন সমাধান হয়নি। সমাধানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দীনদয়াল উপাধ্যায় নিজের বই-এর শেষ অংশে বলেছেন বাস্তবে ভারতকে অখণ্ড রাখার জন্য যুদ্ধের কোন প্রয়োজন নেই। যুদ্ধ দ্বারা ভৌগলিক সীমা বাড়তে পারে কিন্তু রাষ্ট্রীয় একতা বাড়ে না। অখণ্ডতা শুধুমাত্র ভৌগলিক নয় রাষ্ট্রীয় আদর্শ। দুই রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত এবং সমঝোতার (বোঝাপড়ার) ফলস্বরূপ দেশ বিভক্ত হয়। একটি রাষ্ট্র যদি নিজেদের সিদ্ধান্ত এবং কর্মের উপর অবিচল থাকে তাহলেই অখণ্ড ভারত হওয়া সম্ভব। যে মুসলীমরা রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিতে পিছিয়ে রয়েছে তারাও আমাদের সহযোগী হতে পারে, যদি আমরা আমাদের রাষ্ট্রীয়তার সঙ্গে সমঝোতার প্রবৃত্তি ত্যাগ করি। হয়ত আজকের এই পরিস্থিতিতে যেটা অসম্ভব মনে হচ্ছে সেটাই আগামীকাল সম্ভব হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু আমাদের নিজেদের আদর্শের উপর অবিচল থাকতে হবে।
অন্য একটি লেখনীতে রাষ্ট্রীয়তার (দেশভক্তির) সঙ্গে আপস না করার মানসিকতাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দীনদয়ালজী বলেছেন “যদি আমরা একতা চাই তাহলে ভারতীয় রাষ্ট্রীয়তা যেটা হিন্দু রাষ্ট্রীয়তা হিসাবে গণ্য করা হয় এবং ভারতীয় সংস্কৃতি অর্থাৎ হিন্দু সংস্কৃতিকে মানদণ্ড মেনে এগিয়ে চলা উচিত। ভাগীরথীর এই পূণ্যধারায় সব প্রবাহের মিলন হওয়া উচিত। যমুনাও মিলিত হবে আর নিজের কালিমা দূর করে গঙ্গার স্বচ্ছ ধারায় এক হয়ে যাবে।
‘অখণ্ড ভারত কেন’ এই বইটি দীনদয়াল উপাধ্যায় যে সময় লিখেছিলেন, সেইসময় তিনি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিচরণ করেছিলেন। তাঁর লেখনী কাৰ্য্য সদা সতত চলতে থাকে।

রাজনীতিতে সংস্কৃতির রাজদূত

মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন এবার কংগ্রেস দলকে ভঙ্গ করে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে পৃথক-পৃথক দল তৈরী হওয়া উচিত। খামখেয়ালীপনার জন্য সমাজবাদীরা কংগ্রেস দল ছেড়ে দিয়েছিল। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী স্বাধীনভারতের মন্ত্রী মণ্ডলীতে প্রথম শ্রমমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৫০ সালে নেহেরু-লিয়াকত সমঝোতা হয়। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী এই সমঝোতার বিরুদ্ধে ছিলেন। সেই সময় তিনি পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। ১৯৫১ সালের ২১ শে অক্টোবর ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর অধ্যক্ষতায় ভারতীয় জনসংঘ’-এর স্থাপনা হয়। এই স্থাপনার পূর্বে ড. মুখার্জী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ততকালীন সরসংঘচালক শ্রী মাধব সদাশিব গোলওয়ালকরের সঙ্গে দেখা করেন। যেখানে রাষ্ট্রের অবধারণার উপরে দু-জনেই একমত হয়েছিলেন। শ্রী গুরুজী গোলওয়ালকর একস্থানে লিখেছেন “যখন এমন মতৈক্য হল তখন আমি আমার নিষ্ঠাবান-তপস্বী সহযোগীদের চয়ন করলাম যারা নিঃস্বার্থ ও দৃঢ় নিশ্চিত ছিল, যারা নূতন তৈরী হওয়া দলের ভার নিজের কাঁধে নিতে পারবে। এদের মাধ্যমেই শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী, জনসংঘরূপী তাঁর চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবেন।”


শ্রী গুরুজী আরও লিখেছেন “আমরা দুজন (ডাঃ মুখার্জী ও শ্রীগুরুজী) নিজেদের সংগঠন ও কার্যক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পরস্পর মত বিনিময় ছাড়া কখনও গ্রহণ করিনি। আমরা নজর রাখতাম যাতে কেউ একে অন্যের কাজে হস্তক্ষেপ না করে অথবা একের অন্যের সম্পর্কে ভুল ধারণা না তৈরি হয়।”
শ্রীগুরুজী গোলওয়ালকর যে সমস্ত নিঃস্বার্থ, দৃঢ় চরিত্রের কার্যকর্তাদের শ্যামপ্রসাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়। ভারতীয় জনসঙ্ঘের প্রথম সর্বভারতীয় অধিবেশন ২৯,৩০,৩১ ডিসেম্বর ১৯৫২ কানপুর শহরে হয়েছিল। দীনদয়াল এই নবগঠিত দলটির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এখান থেকেই দীনদয়ালজী সর্বভারতীয় স্তরে রাজনীতির আঙ্গিনায় পা রাখেন। তার তাত্ত্বিক ক্ষমতার পরিচয় প্রথম অধিবেশনেই বোঝা যায়। এই অধিবেশনের ১৫টি প্রস্তাবের মধ্যে দীনদয়ালজী একাই ৭টি তৈরী করেছিলেন। শ্যামাপ্রসাদ তাঁর নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদককে আগে দেখেন নি। কিন্তু কানপুর অধিবেশনে তার কর্মদক্ষতা, সংগঠন ক্ষমতা ও বৈচারিক গভীরতা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। শ্যামাপ্রসাদ পরবর্তীকালে দীনদয়ালজী সম্পর্কে বলেছিলেন ‘আমি যদি দুটি দীনদয়াল পেতাম তবে ভারতীয় রাজনীতির মানচিত্রই বদলে দিতাম।
দীনদয়ালজীর কোন ব্যক্তিগত জীবন ছিল না, তিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের জীবন সমর্পিত প্রচারক ছিলেন। ভারতীয় জনসঙ্ঘের কাজ তিনি একজন স্বয়ংসেবকের জীবনের ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। জনসংঘের কাজ ছাড়া তাঁর কোন সামাজিক বা ব্যক্তিগত জীবন ছিল না। জীবনের ১৭ বছর উনি জনসংঘের সাধারণ সম্পাদক ও মার্গদর্শক হিসাবে কাজ করেছেন।


সিদ্ধান্ত ও বিচারের বিষয়ে ডাঃ মুখার্জী ও গোলওয়ালকরজীর মধ্যে যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছিল সেই পথ ধরেই দীনদয়ালজী কানপুরের প্রথম অধিবেশনে জনসংঘের লক্ষ্য স্পষ্ট করতে ‘সাংস্কৃতিক পুনরুত্থান প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। ভৌগলিক অথবা আঞ্চলিক রাষ্ট্রবাদকে অস্বীকার করে তিনি বলেছিলেন ‘ভারত ও অন্যান্য দেশের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে বোঝা যায় কেবলমাত্র ভৌগলিক একতা রাষ্ট্রীয়তার জন্য যথেষ্ট নয়। এক দেশের অধিবাসীরা তখনই রাষ্ট্রীয় হতে পারে যখন একটি সংস্কৃতির বন্ধনে তারা বাঁধা পড়বে। যখন ভারতীয় সমাজ একটি মাত্র সংস্কৃতির অনুগামী ছিল তখন অনেক রাজ্য থাকলেও আন্তরিক একতা সব সময় বজায় ছিল। কিন্তু যখনই বিদেশী শাসক নিজের লোকেদের রক্ষার জন্য দেশের একাত্মতা ভেঙ্গে বিদেশী সংস্কৃতির আমদানি করল তখন থেকেই ভারতের রাষ্ট্রীয়তা বিপদের সম্মুখীন হল। বহু শতাব্দী ধরে যে এক রাষ্ট্রের ঘোষণা আমরা করেছিলাম ভারতে মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার কারণে দ্বি-রাষ্ট্রবাদের ধারণাই এখানে বিজয়ী হয়েছে। দেশ বিভক্ত হয়েছে এবং অমুসলিমদের পাকিস্তানে থাকা অসম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে ভারতে মুসলিম সংস্কৃতিকে আলাদা চিহ্নিত করে তাকে রক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করার কারণে দ্বি-রাষ্ট্রবাদের ধারণা আরও জোরদার হয়েছে যা আমাদের রাষ্ট্র নির্মাণের পক্ষে এক অন্যতম বাধা। এই কারণে ভারতে রাষ্ট্রীয়তা ও তার বিকাশের জন্য একান্ত প্রয়োজন ভারতে একই সংস্কৃতি, এই ধারণার প্রচার, প্রসার ও বৃদ্ধি। এই প্রস্তাবেই কোনও সম্প্রদায়ের নাম না করে সকলের ভারতীয়করণ করার আহবান জানিয়েছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতি সমাজের কর্তব্য হল ভারতীয় জনতার সমস্ত অংশকে ভারতীয়করণ করার দায়িত্ব নিজেদের হাতে গ্রহণ করা, বিদেশী ষড়যন্ত্রের কারণে যারা দেশের থেকে মুখ ফিরিয়ে বিদেশীদের অনুসরণ করছে, হিন্দু সমাজের কর্তব্য হল স্নেহের সাথে তাদের সংস্কৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে আসা। কেবলমাত্র এই রাস্তাতেই সাম্প্রদায়িকতা বন্ধ হবে। ও রাষ্ট্রের একতা ও দৃঢ়তা বৃদ্ধি পাবে।


ভারতের অন্য রাজনৈতিক দলগুলি থেকে ভারতীয় জনসংঘকে আলাদা করার জন্য এই প্রস্তাবটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কংগ্রেস, সমাজবাদী, সাম্যবাদী সবগুলি রাজনৈতিক দলই ভারতের হিন্দু-মুসলমান মিশ্র সংস্কৃতি, রাষ্ট্র-রাজ্যের কল্পনা ও ক্ষুদ্র আঞ্চলিক রাষ্ট্রবাদকে প্রাধান্য দেয় যেগুলি তারা বিদেশী শাসকদের ও পশ্চিমী চিন্তাধারার মানুষদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছে। তারা ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ভিত্তিতে ভারতীয় রাষ্ট্রবাদকে বিচার করেছে ও তাতেই বিশ্বাস রেখেছে। মুসলমানদের আলাদা সংস্কৃতি ও উপাসনা পদ্ধতির রক্ষা ও সংখ্যালঘু হিসাবে তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব যেমন আছে অন্যদিকে হিন্দু-মহাসভা মুসলমানদের ভারতীয় হিসাবে স্বীকারই করে না। সেই কারণেই ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী হিন্দু মহাসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন এবং জনসংঘের দরজা সমস্ত উপাসনা পদ্ধতির মানুষের জন্য খুলে রেখেছেন।
দীনদয়ালজী মুসলিম ও খৃষ্টান সম্প্রদায়ের জন্য হিন্দু সমাজেরই নিজস্ব অঙ্গ’ এই শব্দের প্রয়োগ করেছেন এবং তাদের ভারতীয় জন জীবনের অংশ হিসাবে স্বীকার করেছেন। অন্যদিকে এটাও মেনে নিয়েছেন যে মুসলমান সমাজকে আলাদা করার জন্য হিন্দু সমাজের নিজস্ব কিছু ভুলও আছে যেটি এখন স্নেহ ও আত্মীয়তার দ্বারা সংশোধন করা দরকার। মুসলমান ও খৃষ্টানদের আলাদা সংস্কৃতি ও তা সংরক্ষণের চিন্তা এবং সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরুর ভাবনা রাষ্ট্রের জন্য বিভেদকারী ও একান্ত ভাবে সাম্প্রদায়িক একথা তিনি বিশ্বাস করতেন। সমস্ত দলের নির্বাচনী ঘোষণা পত্র বিশ্লেষণ করে দীনদয়ালজী বলেছিলেন—কংগ্রেস, সমাজবাদী, স্বতন্ত্র পার্টি ও কমিউনিস্টদের ঘোষণা পত্র বিশ্লেষণ করলে মনে হয় এদেশে মুসলমানদের সাথে ন্যায় করা হচ্ছে না—ভারতীয় জনসংঘ এই প্রকার সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরুর বিভাজন স্বীকার করে না এবং তা করা উচিত একথাও মনে করে না। জনসংঘ ভারতকে একটি অখণ্ড, অবিভাজ্য রাষ্ট্র বলে মনে করে। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রের একটিই সংস্কৃতি একথা আমরা দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি ও তাতে আস্থা রাখি এবং ধর্মের আধারে ভিন্ন সংস্কৃতির অস্তিত্ব স্বীকার করি না। জনসংঘ ‘এক রাষ্ট্র ও এক সংস্কৃতি এই সিদ্ধান্তে বিশ্বাস রাখে। কোন ঐতিহাসিক অথবা অন্যকোন কারণে এই দেশের জন সমাজের একটা অংশ রাষ্ট্র জীবনের পবিত্র ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে আর কিছু অংশ রাষ্ট্র বিরোধী হয়েছে।
জনসংঘ এর নিরাময় চায় কিন্তু তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোবৃত্তিকে কখনও সমর্থন করে না। আমাদের মতে তারাও রাষ্ট্রজীবনের এক জীবন্ত অঙ্গ। রাষ্ট্রীয়তার এই সাংস্কৃতিক ধারণাই জনসংঘের বিশেষত্ব। অতএব কেবল লোক কল্যাণকারী রাষ্ট্র বা সেকুলারবাদী বা ভৌতিকতাবাদের (কমিউনিজম) রাজনীতি আমাদের প্রেরণা হয়নি। সাধারণত পশ্চিমের দেশগুলিই অন্য সমস্ত গণতান্ত্রিক দলের প্রেরণা। দীনদয়ালজী বলতেন ‘জনসংঘ মূলতঃ সংস্কৃতিবাদী। সংস্কৃতির আধারেই আমাদের আর্থিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তন দাঁড়িয়ে আছে।
দীনদয়ালজী ভারতীয় জনসংঘকে আকার দিয়েছেন, বিস্তার করেছেন এবং একটি বিশিষ্ট ব্যবহারিক পরিচয় দিয়েছেন কিন্তু প্রচলিত অর্থে রাজনৈতিক নেতা কখনও ছিলেন না। একটি ঘটনার উল্লেখ জরুরী। ১৯৬৪ সালে রাজস্থানের জয়পুরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের গ্রীষ্মকালীন শিবিরের বৌদ্ধিক বর্গে তিনি বলেন—স্বয়ংসেবকদের রাজনীতির প্রতি নির্লিপ্ত থাকা উচিত যেমন আমি আছি। তাকে প্রশ্ন করা হয়—“আপনি একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদক, আপনি কিভাবে রাজনীতির প্রতি নির্লিপ্ত হলেন? উত্তরে দীনদয়ালজী বলেন—আমি রাজনীতি করার জন্য রাজনীতিতে আসিনি, আমি রাজনীতিতে সাংস্কৃতিক রাজদূত। তার কথায় রাজনীতি সাংস্কৃতি শূন্য হয়ে যাওয়া ভালো নয়। তার বিশ্বাস ছিল ভারতীয় জনসঙ্ঘ একটি সাংস্কৃতিবাদী দল হিসাবে গড়ে উঠবে।

রাষ্ট্রীয় অখন্ডতার রাজনীতি

অখন্ড ভারতের যে বৈচারিক পটভূমিকায় ভারতীয় জনসংঘের জন্ম হয়েছিল তার ফলে জন্মের প্রথম দিন থেকেই রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার পক্ষে ও দ্বি-রাষ্ট্রবাদের ও দ্বি-জাতিতত্বের ধারণায় উৎপন্ন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জনসংঘ আওয়াজ তুলেছিল। আভ্যন্তরিন সমস্যা যেমন প্রাদেশিকতা, জাত-পাত ও ভাষা সমস্যার সমাধান ভারতীয় জনসংঘ যে আন্তরিকতা ও কুশলতার সাথে করেছে অন্য কোন রাজনৈতিক দল তা করতে পারে নি। এই সমস্ত রাষ্ট্রবাদী চিন্তার জনক ছিলেন দীনদয়ালজী। তার হাতে বিকশিত জনসংঘ দেশের অখন্ডতার বিষয়টি কখনও রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যম করেনি, দেশের অখন্ডতার বিষয়কে সংগঠিত করে সমাজকে বলিদান দেবার জন্য তৈরী করেছে।

কাশ্মীর আন্দোলন

ভারতীয় জনসংঘ কাশ্মীর নিয়ে যে আন্দোলন শুরু করেছিল তার তিনটি জনপ্রিয় শ্লোগান ছিল—এক দেশে দুটি বিধান, এক দেশে দুই প্রধান, এক দেশে দুই নিশান চলবে না, চলবে না। এই আন্দোলনটি প্রধানতঃ জম্মুর প্রজাপরিষদ দ্বারা চালিত হয়েছিল। ১৯৫৩ সালের ৬ মার্চ ডঃ শ্যমাপ্রসাদ মুখার্জী অনুমতি পত্র ছাড়াই কাশ্মীরে প্রবেশ করেন এবং কাশ্মীরকে সম্পূর্ণরূপে ভারতে মিলিয়ে দেবার দাবীতে সত্যাগ্রহ শুরু করেন। দেশের অখন্ডতা রক্ষায় নিজেকে বলি দেন। দীনদয়ালজী সত্যাগ্রহের জন্য সমস্ত দেশ থেকে সত্যাগ্রহী সংগ্রহ ও সংগঠনকে এই কাজের জন্য তৈরি করার প্রয়াস করতে থাকেন।
পাঞ্চজন্য পত্রিকায় কাশ্মীর সম্পর্কে তিনি—স্বাধীনতার পরই কাশ্মীরে পাকিস্তানের আক্রমণ ও সেই আক্রমণ প্রতিরোধে ভারত সরকারের উদাসীনতা, কাশ্মীর বিষয়টিকে রাষ্ট্রসংঘে নিয়ে যাওয়া, কাশ্মীরের ভবিষ্যতের জন্য জনমত সংগ্রহ করার কথা বলা, ৩৭০ ধারার মাধ্যমে বিশেষ অধিকার প্রদান, এই সমস্ত বিষয়গুলি সবিস্তারে ও বাস্তবিক অবস্থা সম্পর্কে বর্ণনা করেন।


এই সময় স্বতন্ত্র পার্টির ইচ্ছা ছিল যেহেতু জনসংঘ বাম বিরোধী সুতরাং দক্ষিণপন্থী স্বতন্ত্র পার্টির সঙ্গে জনসংঘ মিশে যাক। জনসংঘের কিছু কার্যকর্তা এই প্রস্তাবে রাজী ছিলেন, কথাবার্তাও শুরু হয়। নির্বাচনে আসন সমঝোতাও হয়। কিন্তু ঠিক এই সময়েই স্বতন্ত্র পার্টির সাধারণ সম্পাদক মাসানি বিবৃতি দিয়ে বলেন যে স্বতন্ত্র পার্টি কাশ্মীরের ব্যাপারে জনসংঘের সাথে একমত নয়। তাদের মতে কাশ্মীরের ব্যাপারে পাকিস্তানের সাথে কথাবার্তা বলা জরুরী ও বিষয়টিতে রাষ্ট্রসংঘের হস্তক্ষেপও জরুরী। দীনদয়ালজী এই বক্তব্যের সাথে একমত হতে পারেন নি। তিনি জনসংঘ ও স্বতন্ত্র পার্টির জোট ভেঙ্গে দিলেন, তিনি বললেন—
“আমি মসানিকে ধন্যবাদ জানাই কাশ্মীর প্রসঙ্গে তার স্পষ্ট বক্তব্য রাখার জন্য। তার এই বক্তব্যের কারণে আমি জনসংঘ ও স্বতন্ত্রপার্টির জোট ভঙ্গ করলাম। কাশ্মীর প্রসঙ্গে তাদের বক্তব্য আমাদের অস্বস্তির কারণ, আমরা এমন কোনও দলের সঙ্গে জোট করতে পারি না যারা দেশের একটি অংশকে আক্রমণকারীদের হাতে তুলে দিতে চায়। আমাদের ভালো-মন্দের জন্য মাসানির উপদেশের প্রয়োজন নেই। দেশের অখন্ডতা আমাদের কাছে শ্রদ্ধার বিষয়। দেশের অখন্ডতা রক্ষায় আমরা যে-কোনো কাজ করতে প্রস্তুত।

গোয়া মুক্তি আন্দোলন

একটি স্বাধীন দেশ যারা সম্পূর্ণরূপে উপনিবেশবাদের বিরোধী। কিন্তু স্বাধীনতার পরও সেই দেশের মাটিতে দুটি দেশের উপনিবেশ বর্তমান ছিল এবং দুটি অঞ্চলের স্বাধীনতার দাবীতে সদ্য গঠিত সরকারের বিরুদ্ধেই আন্দোলন করতে হয়েছিল। পন্ডীচেরীতে ফরাসী এবং গোয়া, দমন, দিউতে পোর্তুগাল উপনিবেশের বিরুদ্ধে ১৯৫২ সালে জনসংঘের প্রথম অধিবেশনে দীনদয়ালজী সবর হয়েছিলেন।
২মে ১৯৫৪ সাল, দেশ জুড়ে এই উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে জনজাগরণ কার্যক্রম শুরু হয়। নেহেরু সরকারের উপর চাপ সৃষ্টির জন্য বিলয় দিবস আয়োজিত হয়। দীনদয়ালজী ইন্দোরে তার বক্তব্যে বলেন—“ফরাসী উপনিবেশের বিরুদ্ধে ভারত এক শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করেছে। ভারত সরকারের দেখছি-দেখব নীতি ত্যাগ করে ভারতের বুকে বসে বিদেশী উপনিবেশিকরা যে অত্যাচার চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। অবিলম্বে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক।”
১৯৫৪ সালের ৯ থেকে ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় জনসংঘ গোয়া মুক্তি সপ্তাহ পালন করে এবং ১৯৫৫ সালের ১৪ এপ্রিল পুর্তুগালের হাত থেকে গোয়া মুক্তির দাবিতে ‘গোয়া মুক্তি সমিতি’ গঠিত হয় ও জনজাগরণের কার্যসূচি ঘোষিত হয় সারা দেশে। ২৩শে জুন ১৯৫৫, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর বলিদান দিবসে গোয়াতে ‘সত্যাগ্রহের কার্যক্রম গৃহীত হয়। ভারতীয় জনসংঘের তৎকালীন সম্পাদক জগন্নাথ রাও যোশীর নেতৃত্বে ১০১ জন সত্যাগ্রহী ঐদিন গোয়াতে প্রবেশ করেন। তাদের উপর অকথ্য অত্যাচার শুরু করে পর্তুগাল পুলিশ। মধ্যপ্রদেশের শ্রী রাজা ভাউ মহাকাল ও উত্তর প্রদেশের শ্রী আমিরাদ গুপ্তার প্রাণ যায় এই অত্যাচারে। দীনদয়ালজী এই সত্যাগ্রহ সংগঠিত করতে সারা দেশে প্রবাস করেন। সমাজবাদী দল এই সত্যাগ্রহে অংশ গ্রহণ করে কিন্তু ভারতের অন্য রাজনৈতিক দল বিশেষ করে কংগ্রেসের ভূমিকা এই সত্যাগ্রহে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ছিল। ভারতীয় জনসংঘের কর্মীদের আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত সরকার বাধ্য হয় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে এবং ভারতে উপনিবেশের চিহ্ন সমাপ্ত হয়। স্বাধীন হয় গোয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.