(পূর্ব অংশের পর)

।।৫।।

পাঞ্জাবে মুগলদের বৃহৎ ক্ষমতা ছিল দুই বড় কেন্দ্র সরহিন্দ এবং লাহোর। সরহিন্দ এর নবাব ছিলেন বজির খান। সে অতীব দুষ্ট, অত্যাচারী ও ক্রুর ব্যক্তি ছিল। ১৭০৫ সালে ২৬ শে ডিসেম্বর গুরু গোবিন্দ সিং জির দুই নাবালক পুত্র বাবা ফতে সিং ও বাবা জোহার সিং কে দেয়ালের মধ্যে গেঁথে শহীদ করা হয় এই বজির খানের আদেশে।

উল্লেখ্য বজির কেবল শাসক ছিল না বরং বহু ভারতীয়দের বলপূর্বক নিজের সাম্রাজ্যবাদী বৈদেশিক ধর্মে ধর্মান্তর একজন বড় গাজীও হয়েছিলেন। এহেন অত্যাচারী শাসক তথা মুঘলদের নিকট পাঞ্জাব ও গুরু গোবিন্দ সিং এর খালসা একটি বৃহৎ প্রতিদ্বন্দ্বীতার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

গুরুজীর দীক্ষায় বৈরাগী মাধো যোদ্ধা বান্দা সিং বাহাদুরে পরিনত হলেন। ক্ষত্রিয় ধর্ম তার শিরায় শিরায় নেচে উঠল। গুরুজী তাঁকে মহারাষ্ট্রের গোদাবরী নদীর তীর পরিত্যাগ করে পাঞ্জাবের দিকে প্রস্থানের আদেশ দিলেন। সেই পাঞ্জাব যেখানে খালসারা নিজেদের দেশভূমি ও ধর্ম রক্ষার্থের মহান যজ্ঞে নিজেদের জীবন আহুতি দিচ্ছিলেন। সেই যজ্ঞের আগুন প্রজ্জ্বলিত রাখাবার উদ্দেশ্য নিয়েই গুরু গোবিন্দ সিং জি বান্দা সিং বাহাদুরকে নেতৃত্ব হিসাবে পাঞ্জাবে পাঠান।

১৭০৫ সালে গুরু গোবিন্দ সিং যখন মহারাষ্ট্রে এসেছিলেন তখন সঙ্গে করে একটি জাফরনামা এনে ছিলেন। জাফরনামা মানে বিজয় চিঠি। এতে তিনি একপ্রকার ভবিষৎ বাণী করেই দিয়েছিলেন যে মুঘল সাম্রাজ্য ধ্বংস খুবই শীঘ্রই হবে। বান্দা বাহাদুরকে সেই ভবিষৎবাণী সম্পূর্ণ করতে হত।

১৭০৮ সালের সেপ্টেম্বর, সেই যজ্ঞে বান্দা অংশ নিলেন যে যজ্ঞে গুরুজী যে যজ্ঞে নিজের সব এমনকি নিজের সংসার , সন্তান কেও আহুতি দিয়েছিলেন। ওই দিকে সরহিন্দ এর নবাব বজির খান ও চুপ করে বসে ছিল না। দক্ষিণাত্যে গুরুজীর পদধ্বনিতে সে কান লাগিয়ে বসে ছিল। এদিকে বান্দা মহারাষ্ট্র , গোদাবরী ত্যাগ করলেন অন্য দিকে বজিরের পাঠানো পাঠান গুপ্ত ঘাতক এল গুরু গোবিন্দ সিং এর নিকট।

গুরুজী ধর্মের জন্য লড়াই তো করছিলেন। কিন্তু আর্তের জন্য তাঁর হৃদয় মন্দির সদা খোলা থাকত। পাঠান গুরুজীর মহানতাকে দুর্বলতা হিসাবেই নিয়েছিল। সেই সুযোগের সৎ ব্যবহার করে একদিন গুরুজীর বুকে ছুরি মারল।রণক্লান্ত গুরুজী সেই আঘাত সহ্য করতে পারলেন না। এক শরতের সকালকে রাতের থেকেও অন্ধকার করে তিনি ঈশ্বরের প্রিয় হলেন। ভারতের বুকে এক যোদ্ধা নক্ষত্রের পতন হল।

বান্দা বন্ধুর পথ নানা বাধা পেরিয়ে পাঞ্জাবের দিকে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তাঁর মন কু গেয়ে উঠল। কি হল ? এমন ভাবে হৃদয় কোনো দিন আন্দোলিত হয় নাই। মন[ হল তারঁ নিজের, খুব আপন কেউ তাঁকে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। পথে একস্থানে ভারতের সূর্য অস্তের সংবাদ পেলেন। গুরু জী নেই.বান্দার মনে হল এক ছুটে তিনি ফিরে যান গোদাবরী.।এক ছুটে গিয়ে তিনি গুরুর অন্তিম সৎকার করেন। কিন্তু গুরুজী কোনো কারণে পিছন ফিরে তাকাতে বারণ করেছে। তার গন্তব্য পাঞ্জাব। যে দায় গুরুজী তাকে প্রদান করেছেন তা পূর্ণ করতেই হবে। বান্দা সিং বাহাদুর চরৈবেতী মন্ত্রে এগিয়ে চললেন যঞ্জ ভূমির দিকে।


।। ৬।।

মুঘলবংশের শাসক আওরঙ্গজেব ততদিনে দেহ রেখেছে। ১৭০৭ – ১৭১২ সালে দিল্লির সুলতানাতে আসে প্রথম বাহাদুর শাহ। মুঘল সাম্রাজ্য তখন ধিকি ধিকি জ্বলছে। প্রথম বাহাদুর শাহের নিকটও খবর পৌঁছাল , যে গোদাবরী তীরের এক সন্ন্যাসী , গুরু গোবিন্দ সিং এর আদর্শে সন্ন্যাসী যোদ্ধায় পরিনত হয়েছেন।.তিনি স্বতন্ত্রতার মশাল নিয়ে এগিয়ে আসছেন মুঘল সাম্রাজ্যের কাল রূপে। অর্থাৎ সেই সন্ন্যাসী যোদ্ধাকে শুরুতেই রুখে দিতে হবে।

পথ মধ্যে মুঘল সেনা , গুপ্তচর বার বার বাধা দিল বান্দা বাহাদুরকে।.তারা পথে অনেক বার গ্রেপ্তারের চেষ্টা ,এমনকি প্রাণ হানির চেষ্টাও করল।.কিন্তু বান্দা ছোট থেকে বনে জঙ্গলে ঘুরে, পাহাড়ে চড়ে অসম্ভব ক্ষিপ্রতা অর্জন করেছিলেন। তীব্র চিতার মত নিজেকে বার বার বাঁচিয়ে তিনি চললেন গন্তব্যের দিকে। সরহিন্দ এর ভূমি তাঁর জন্য অপেক্ষমান।..পূর্বেই বলেছি এখানেই গুরু গোবিন্দ সিং এর দুই পুত্রকে নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করা হয়। বান্দা সিং বাহাদুর প্রতিজ্ঞা করেছেন যে , যেকোনো মূল্যে বজিরের বলি দিয়ে গুরু ও ভুমিমাতার ঋণ চোকাবেন।

বান্দা সিং বাহাদুর মহারাষ্ট্র থেকে রাজস্থানের মরু অতিক্রম করে হিসার উপস্থিত হন। রাজস্থান মুঘল সাম্রাজ্যবাদী আক্রমনের বিরুদ্ধে নিজেদের তরবারী বহু পূর্বেই উত্তলিত করে মহাসংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন। সে দিক থেকে দেখলে রাজস্থানের প্রখর মরুভূমি বান্দা সিং বাহাদুরের নিমিত্ত অনেক সুরক্ষিত ছিল। এই কারনেই তাঁর গোদাবরী তট হতে হিসার পৌঁছতে এক বছর সময় লেগে গিয়েছিল। কিন্তু এর লাভও হয়েছিল।

দক্ষিণাত্যে মহারাষ্ট্র থেকে পাঞ্জাব পর্যন্ত একই কথা গুঞ্জিত হচ্ছিল যে পাঞ্জাবের ময়দানে মুঘলদের কবর খোঁড়া হয়েছে। বান্দা সিং বাহাদুর হিসার থেকে চৌহানা, সোনিপথ, কৈথল , সামানা হয়ে সাতৌরা এসে পৌঁছলেন। আর সব থেকে বৃহৎ ঘটনা হল যে , এসব জায়গার ছোট বড় রাজ্য বান্দা সিং বাহাদুর নিজের অধীনে করে নিয়েছিলেন। তিনিই প্রথম জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে জন আন্দোলন ও প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।.

জমিদারী প্রথা সরিয়ে তিনি সব জমি কৃষকদের ফিরিয়ে দেন। উনি বলেছিলেন , ” কৃষক আমাদের খাদ্য দেন। তাই সম্মান তাঁরই পাওয়া উচিৎ। এই সব জমি দরিদ্র ও পরিশ্রমী কৃষকদের। জমি নিয়ে উৎপাদন করে তাঁরা সম্মানের সঙ্গে বাঁচুক। ” শুধু তাই নয়। বান্দা সিং বাহাদুরের রাজত্বের পূর্বে এসব বর্গাদার রা দরিদ্র প্রজাদের উপর প্রচন্ড জুলুম করত ও প্রচুর কর চাপিয়ে ছিল। কর , হপ্তা আদায়, ঘুষ ইত্যাদি নিয়ে জমিদারগণ ফুলে ফেঁপে উঠেছিল। বান্দা বাহাদুরের প্রতিরোধ সে সব কিছুকে নস্যাৎ করে। বান্দা বাহাদুর ও তাঁর অনুগামী শিখরা নিজ শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দুষ্টের দমন করে , প্রজাদের জন্য মঙ্গল সাধন করে, ফলত , প্রজারা দীর্ঘদিন বাদে সুশাসনের নিশ্বাস নিতে সচেষ্ট হন।

দুর্গেশনন্দিনী

(ক্রমশ)

(পরবর্তি অংশ)

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.