ভারতের ওপর উপুর্যপরি পাক মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের অভ্যন্তরে মানুষের ক্ষোভ এখন উচ্চগ্রামে, আবেগ সীমা তুঙ্গে। কাশ্মীরে সম্প্রতি জইশ-ই-মহম্মদ সমর্থিত আত্মঘাতী হামলায় ৪০ জন সি আর পি এফ জওয়ানের মৃত্যুতে উভয়দেশের মধ্যে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। এই জঙ্গিবাহিনী পাকিস্তান থেকে এদের অভিযানের পরিকল্পনা করে। পাকিস্তানে মাসুদ আজহার এদের মাথা, একথা সুবিদিত। পাকিস্তান কোনােদিনই জইশ ও তার সহযােগী সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে কোনাে ব্যবস্থা নেয়নি। পাকিস্তানে নব গঠিত সরকার বিশ্ববাসীকে এমনটা দেখাতে তৎপর যে তারা পারস্পরিক আলােচনার মাধ্যমে বিশ্ব শান্তি ফিরিয়ে আনতে চায়।

পাকিস্তানের মিথ্যে ভাষণের পর মিথ্যে ভাষণের পাহাড় জমে উঠেছে। অন্যদিকে ভারতে আসমুদ্র হিমাচল দেশের সেনাবাহিনীর রক্তে রঞ্জিত হয়ে উঠেছে। দেশের মানুষ চাক্ষুষ করেছে অনেক কিছুই। তবে সবেরই একটা সীমা আছে। সেই ১৯৯২ সাল থেকে ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেই চলেছে। ২০০১, ২০০৮, ২০১৬ আর এই ২০১৯-এর সর্বাপেক্ষা ভয়ংকর হামলা।

আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গনের প্রান্তসীমায়। পাকিস্তান কিন্তু সন্ত্রাসবাদী আর বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যে সীমারেখা সফলভাবে মুছে ফেলছে। আজকের কাশ্মীর উপত্যকা এক আশ্চর্য স্থান। সবচেয়ে উপদ্রুত অঞ্চলটিতে যেন সন্ত্রাসবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সহােদর ভাই হিসেবে বাস করছে। সাম্প্রতিক পুলওয়ামার আক্রমণ এই সত্যই আশঙ্কাজনকভাবে মনে করাচ্ছে। এই পরিণতিতে ভারতের সামনে অবলম্বন করার মতাে পথ জটিল।

আচ্ছা, সঠিক পথ সন্ধানের আগে আমরা বরং কাশ্মীর ইস্যুতে আমাদের শত্রু কারা তাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করি। নিশ্চিতভাবেই বলতে হবে সর্বাপেক্ষা ক্ষতিকারক শত্রু পাকিস্তান। পাকিস্তানের বর্তমান নির্বাচিত সরকার ছদ্মবেশে সামরিক শাসনেরই প্রকারান্তর। ধরেই নেওয়া যায় পাকিস্তানে অবস্থানকারী সন্ত্রাসবাদীরা আরও সক্রিয় হয়ে উঠবে। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনাদের অপসারণের পর পাকিস্তানের বৃহত্তর অঞ্চল জুড়ে কাজ করতে সুবিধে হচ্ছে। মার্কিন সেনা হটে যাওয়ার পর কাবুলে ভারতের প্রভাব ও উপস্থিতির ওপর চাপ বাড়ছে।ইদানীংকালে কাবুল সরকারের মধ্যস্থতায় আফগানিস্তানে ভারত প্রচুর পরিকাঠামাে নির্মাণের কাজ করছিল। এই মুহূর্তে তালিবানরা সেখানে চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। আর তাদের পরিচালন দণ্ডটিও থামবে পাকিস্তানের হাতে। তথাকথিত ভালাে তালিবান ও মন্দ তালিবান এক সঙ্গে মিশে যাবে আর তাদের লক্ষ্য হয়ে উঠবে ভারত। এরই অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়ায় কাশ্মীর উপত্যকায় আতঙ্কবাদী হামলার পুনরাবৃত্তির ঘটনায় বাড় বাড়ন্ত হওয়ার সম্ভাবনা।

দ্বিতীয় শত্রু হলাে চীন। চীন তার নিজের স্বার্থ ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাগুলি নিয়ে এগিয়ে চলবে। ক্রম বিকাশশীল ও শক্তিশালী ভারতকে চীন এক সম্ভাব্য বিপদের উৎস বলেই গণ্য করে। গত বছর quad formation-এর প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে ভারত চীনের কাছে সংকেত পাঠিয়েছে যে ভবিষ্যতে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে তাদের আধিপত্যকে ভারত চ্যালেঞ্জ জানাতে চলেছে। চতুর চীন ভারতকে এদিক থেকে দৃষ্টি ফেরাতে অন্য অঞ্চলে ব্যস্ত রাখতে চায়। এই কৌশল পরিষ্কার হয় যখন রাষ্ট্রসঙ্ঘে বারবার অনুরােধ করা সত্ত্বেও হাফিজ সইদকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ঘােষণায় চীন বাধা দিতে থাকে। এর ফলে ধুর্ত চীনের সুবিধে হয়ে যায়।

তৃতীয় শত্রু ঘরের শত্রু। কাশ্মীরের হুরিয়ত নেতাবাহিনী ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল। এঁরা সদাই এমনভাবে দেশকে সচকিত করে রাখতে চায় যেন বা কাশ্মীর কেউ লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ইচ্ছে করে কাশ্মীর সমস্যার আন্তর্জাতিককরণের প্রয়াস চলছে। এই সূত্রে সময়ে সময়ে ধরা পড়া সন্ত্রাসবাদীদের মধ্যে আশিক বাবা নামের এক সন্ত্রাসী জম্মু-কাশ্মীরের সেনা ছাউনিতে এক সময় আক্রমণ চালিয়েছিল। ভিসা পেতে পরিচয় পত্র দিয়েছিল হুরিয়ত নেতারা। জাতীয় তদন্ত সংস্থার বয়ানে এ তথ্য উঠে এসেছে। জইশের কমান্ডাররাই তাকে নাগরােটা সেনা ছাউনি আক্রমণের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। এই জঙ্গিরা সর্বদাই হােয়াটসআপ ও টেক্সট মেসেজের মাধ্যমে পাক অধিকৃত মুজাফফরাবাদের জঙ্গি মৌলানা মুফতি আসগরের সঙ্গে যােগাযােগ রক্ষা করে চলত। এরই বিশ্বস্ত ভাগনা ওয়াকস দক্ষিণ কাশ্মীরে জইশ-এর কম্যান্ডার ছিল যে পুলওয়ামা পরবর্তী এনকাউন্টারে মারা যায়। আসগর ছাড়াও সন্ত্রাসবাদীরা রাওয়ালপিণ্ডির কারি জরার ও ওয়াসিমের সঙ্গে যােগাযােগ রক্ষা করে, যারা উপত্যকা ও জম্মুতে নিয়মিত সন্ত্রাসবাদী ঢােকানাের কাজে লিপ্ত। কাশ্মীরের রাজনৈতিক নেতারা রুটিন করে কাশ্মীরের শান্তি বিঘ্নিত করে থাকে। তারা নিজেদের স্বার্থের রাজনীতিকে প্রথম গুরুত্ব দেয়, তারপর কাশ্মীর প্রসঙ্গে ভাবে। রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তগত করতে তারা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদত দেয়। তারা পাথরবাজদের পক্ষ অবলম্বন করতেও দ্বিধা করে না। আর যেটা করে তাহলাে সদাসর্বদা সমস্ত দোষ সেনাবাহিনীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার হীন কাজ। কাশ্মীরের সমস্যাটিকে তারা কখনই সামগ্রিক ভারতীয় প্রেক্ষাপটে স্থাপন করতে দেয় না ফলে সুবিধে করে দেয় চক্রী পাকিস্তানের নাক গলানাের।

সর্বশেষ কিন্তু মােটেই ফেলনা নয়, বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা। কংগ্রেসের মদতে সর্বদা মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্ন তুলে তারা কী সেনাবাহিনী কী আধা সামরিকবাহিনীর উভয়কেই ভিলেন বানিয়ে ছাড়ে।

বিকল্প পন্থা

‌শত্রুদের চিহ্নিত করার পর প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা চিকিৎসার ব্যবস্থা করা দরকার। শুরুর পদক্ষেপে ভারত পাকিস্তানকে এ যাবৎ প্রথম পছন্দের দেশের তকমা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। সে দেশ থেক ভারতে ঢােকা পণ্যের ওপর শুল্ক ২০০ শতাংশ হারে বাড়ানাে হয়েছে। পাকিস্তানের ভারতস্থিত হাই কমিশনারকে ডেকে সতর্ক পত্র দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী কূটনৈতিক পন্থা শীঘ্রই নির্ধারণ করা হবে। সম্ভবত ভারত হয়তাে দু’দেশের মধ্যে বলবৎ থাকা সিন্ধুনদ সংক্রান্ত জলচুক্তি বাতিল করতে পারে। এর পরিণতিতে পাকিস্তানের ভয়াবহ জলসঙ্কটের মুখােমুখি হওয়ার সম্ভাবনা। উপসাগরীয় দেশগুলিকে এই সূত্রে পাকিস্তান-বিমুখ করে তােলার সক্রিয়তায় দেখা মিলেছে। এই ধরনের কূটনৈতিক অবস্থানের ফলে তারা নিশ্চতভাবেই পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। দেনায় জর্জরিত বহুমুখী পাকিস্তানকে আই এম এফ-ও চট করে দায়মুক্ত করবে না। এই কূটনৈতিক চাপ একত্রে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সঙ্কটকে আরও ঘনীভূত করবে।

তবু বলা দরকার শুধুমাত্র কূটনৈতিক চাপই যথেষ্ট নয়, মানুষ কড়া নিদান প্রত্যাশা করছে। আর সেটা দ্বিতীয় সার্জিকাল স্ট্রাইকের ভাবনা। কিন্তু এরও কয়েকটা অসুবিধে আছে। এর প্রলম্বিত রূপ পুরাে দস্তুর যুদ্ধ। ঠিক এই মুহূর্তে সেই সম্ভাবনার বিষয়টা সেনা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবেচনায় রেখেছে।

এবার দ্বিতীয় শত্রু চীনের প্রসঙ্গ। এক্ষেত্রে দীর্ঘকালীন কৌশল অবলম্বন করা জরুরি। চীন-পাকিস্তান পারস্পরিক সহযােগিতা খুবই টেকসই। এক্ষেত্রে ভারতের চাণক্য নীতি অনুসরণ জরুরি। সেই কারণে আফগানিস্তানের পরিকাঠামাে উন্নয়নে আমাদের আর জড়িয়ে থাকার প্রয়ােজন নেই। বরং সেখানে তালিবান বিরােধী গােষ্ঠীকে ভালােরকম মদত দেওয়া দরকার। বিশেষ করে সেই সমস্ত তালিবানিদের যারা একই সঙ্গে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে সক্রিয় তালিবানিদের বিরােধিতা করবে। তাজিক ও পাখতুন সম্প্রদায়ের লােকজন এই টার্গেট গ্রুপের মধ্যে পড়বে। অর্থ ও প্রয়ােজনীয় অস্ত্র দিয়ে তাদের হাত শক্ত করা জরুরি প্রয়ােজন। তারাই গােটা খেলায় গেম চেঞ্জার হওয়ার হিম্মত রাখে। চীনের বিশাল প্রকল্প এই ভূমিপুত্রদের বিরােধিতায় মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।

তৃতীয় ঘরের শত্রু হুরিয়ত নেতারা। সরকার ইতিমধ্যেই তাদের অভিজাত জীবনশৈলীর সহায়ক নানান ধরনের সুবিধে গুটিয়ে নিয়েছে। ভারত তাদের মূল্যবান নিরাপত্তা দিত। হায়! তারা পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বনে সদা তৎপর। এমন থেকে তাদের সব ধরনের কাজকর্মের ওপর সেনার তীক্ষ্ণ নজর রাখা প্রয়ােজন। কোনাে ভাবে তাদের সন্ধিগ্ধ বলে মনে হলেই তাদের বিরুদ্ধে দেশবিরােধী চক্রান্তের মামলা দিয়ে শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। কাশ্মীরের অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষেত্রেও একই নিদান।

চতুর্থ বামবাদী শহরবিলাসী বুদ্ধিজীবীর দলের ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ প্রয়ােজন। সকলেই জানে জ্বরের তাপ বাড়লে ওষুধের ডােজও বাড়ানাে হয়। ভারতের বর্তমান জাতীয়তাবাদী সরকার এ চিকিৎসায় দক্ষ। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি যথেষ্ট জটিল ও ঘরে বাইরে বিস্তৃত। চিন্তা ভাবনা না করে দুমদাম কিছু করে ফেললে হঠকারী কিছু ঘটে যেতে পারে। যাই হােক না কেন একথা নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করা যায় যে প্রধানমন্ত্রী মােদী পাকিস্তানকে যােগ্য শিক্ষা না দিয়ে ক্ষান্ত হবেন না।

ড. সতীশ কুমার

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.