ক্রায়োজেনিক রকেট বিজ্ঞানী নাম্বি নারায়ণনকে এ বছরের পদ্ম ভূষণ পুরস্কার প্রদান করেছে মোদি সরকার। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণাকারী সংস্থা ইসরোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্রায়োজেনিক রকেট প্রযুক্তির প্রধান ছিলেন নাম্বি নারায়ণন। ভারতের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ সরকারগুলি তাঁকে গুপ্তচর বৃত্তির মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করেছিল। যা শেষ পর্যন্ত তার কর্মজীবন সহ ভারতের সর্বাধিক মূল্যবান ক্রায়োজেনিক রকেট প্রকল্পকে ধ্বংস করেছিল। এমন একজন বিজ্ঞানীকে পুরষ্কৃত করায় মোদি সরকারকে পদক্ষেপ তাই স্বাগত।

ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এবং মহাকাশ গবেষণা কর্মসূচিগুলির জন্য ক্রায়োজেনিক রকেট প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নাম্বি নারায়ণন ছিলেন একমাত্র বিজ্ঞানী যিনি এই প্রযুক্তি আয়ত্ত করেছিলেন। ভারী উপগ্রহ বা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপন ক্রায়োজেনিক প্রযুক্তি ব্যতীত অসম্ভব ছিল। প্রযুক্তির সাফল্য আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে শক্তিশালী করতে পারত। কারণ তখন পর্যন্ত রাশিয়া ও আমেরিকা এই প্রযুক্তিটির সফল প্রয়োগে অসংখ্য উপগ্রহ এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপন করেছিল। তার ফলে তারা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশে পরিনত হয়েছিল।

যে গোষ্ঠী, ব্যক্তি বা দল গুলি আমাদের সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করে, তাদের সততা নিয়ে প্রশ্ন করে কিন্তু পাকিস্তান ও চীনকে সমর্থন করতে কুন্ঠা বোধ করে না সেই সব তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি বা দল গুলিই নম্বি নারায়ণনকে সেদিন আক্রমন করেছিল। 

কি এই ক্রায়োজেনিক রকেট প্রযুক্তি

এককথায় সুপার-কুলড লিকুইড ফুয়েল বা অতিশীতল তরল জ্বালানি ব্যবহার করে মহাশূন্যে ভারী ওজন উত্তোলন করার জন্য প্রচুর পরিমাণে ঘাত তৈরির পদ্ধতিকেই ক্রায়োজেনিক রকেট প্রযুক্তি বলে। ভবিষ্যতে ভারতীয় মহাকাশচারীকে চাঁদে নিয়ে যাবার জন্য ব্যবহৃত জিএসএলভি রকেটের প্রাণকেন্দ্রে আছে এই প্রযুক্তি। জিএসএলভি রকেট প্রযুক্তিতে সক্ষম না হওয়া পর্যন্ত ভারতকে বিদেশী মহাকাশ সংস্থাগুলিকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিতে হবে। এই সময় নম্বি নারায়ণন স্বল্প খরচে মহাকাশে ভারী ওজন উত্তোলনের ক্ষমতা সম্পন্ন ক্রায়োজেনিক রকেট প্রযুক্তিটিতে কাজ শুরু করেন। ক্রায়োজেনিক রকেট প্রযুক্তিটিতে সেদিন ভারত সফল হলে NASA সহ অন্যান্য বিদেশী মহাকাশ সংস্থাগুলির প্রগতিতে ও ব্যবসায় বাধা হতে পারত। 

ক্রায়োজেনিক রকেট প্রযুক্তি পেতে ভারতের প্রচেষ্টা ও বাধা

১৯৮০র সময় থেকে, ভারত এই প্রযুক্তি সন্ধান করছিল এবং জাপানের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনার শুরু হলেও তা বেশি দূর এগোয়নি। পরে আমেরিকার জেনারেল ডাইনামিক্স কর্পোরেশনের সাথে যোগাযোগ করা হলে অত্যধিক খরচের কারনে তাও ভেস্তে যায়। এরম সময় রাশিয়া ২00 মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ইসাইয়েভ ডিজাইন ব্যুরোর তৈরি দুটি গোপন ইঞ্জিন, RD-56 বা KVD-1 এবং প্রযুক্তি হস্থান্তরের প্রস্তাব দেয়। এই বিশেষ প্রযুক্তি NASA র থেকে অনেক উন্নত ছিল। ১৯৯১ এর ১৮ই জানুয়ারী ভারতীয় মহাকাশ সংস্থা ইসরোর সঙ্গে রাশিয়ার গ্লাভকসমসের সাথে ক্রায়োজেনিক রকেট প্রযুক্তি হস্থান্তরের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়া জানত যে আমেরিকা এই প্রযুক্তি যেকোনে উপায়ে চুরি করার চেষ্টা করবে। তাই মিসাইল টেকনোলজি কন্ট্রোল রেজিম (এমটিসিআর) এর নিয়ম লঙ্ঘন না করেই, রাশিয়ান মহাকাশ সংস্থা গ্লাভকসমস এবং ইসরো ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিনগুলি কেরালা-হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (কেইএলটিইসি) কে আউটসোর্স করার সিদ্ধান্ত নেয় । 

এই প্রযুক্তির ব্যবহারে ভারত এক শক্তিশালী দেশে পরিনত হবে অনুমান করে সেই ভয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ভারত ও রাশিয়ার মধ্যকার চুক্তিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন এটি বিভিন্ন মানদণ্ড লঙ্ঘন করেছে। ভারত দৃঢ়ভাবে আপত্তি জানিয়ে বলে আমেরিকা ১৯৮৮-৯২ এর মধ্যে এরকম প্রযুক্তি ভারতকে সরবরাহ করেছিল সেসময় কোনো আপত্তি জানানো হয়নি। তাছাড়া উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন হাইড্রোজেন-জ্বালানী যুক্ত রকেট প্রযুক্তির উচ্চতর পর্যায়গুলি প্রস্তুত করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন যার সামরিক মূল্য খুবই সামান্য।

ক্লিনটন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব গ্রহন করার পর কূটনৈতিক ভাবে ভারতকে সমস্ত সহায়তা প্রদান থেকে রাশিয়াকে আটকানের চেষ্টা করে। তাই রাশিয়ানরা ভারত থেকে প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রস্তাবগুলি প্রত্যাহার করে এবং চুক্তিটি স্থগিত হয়ে যায়।

নম্বি নারায়ণনের বিরুদ্ধে চক্রান্ত, মিথ্যা অভিযোগে তাকে অভিযুক্ত করা ও শেষে নির্দোশ প্রমান

কিন্তু বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ হওয়ার কারণে রাশিয়া উৎপাদন প্রযুক্তিতে ভারতকে সহায়তা প্রদানের প্রস্তাব দেয় এবং গোপনে সমস্ত প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পাঠানোর পরিকল্পনা করে।

ইসরো এবং রাশিয়ানরা তাই চুক্তি মতো একটি গোপন অভিযানে ইউরাল বিমান সংস্থার মাধ্যমে মস্কো থেকে দিল্লিতে চারটি চালানে  সমস্ত নথি, যন্ত্রাদি এবং সরঞ্জাম হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নেয়। ঘটনাচক্রে মস্কো থেকে দিল্লিতে সমস্ত নথি স্থানান্তরকারী বিমানে নাম্বি নারায়ণন উপস্থিত ছিলেন।

আমেরিকা জানতে পেরেছিল যে রাশিয়া ভারতকে সাহায্য করছে কিন্তু তাদের কাছে কোনো প্রমাণ ছিল না। তখন তারা সিআইএ-কে এই বিষয়টি জানালে সমগ্র ক্রায়োজেনিক প্রকল্পটি অভ্যন্তরীণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়। ভারতীয় পুলিশ বিভাগের কয়েকজন, গোয়েন্দা ব্যুরো ও কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সহায়তায় সিআইএ নাম্বি নারায়ণনকে আটকাতে একটি প্ল্যান বানায়।

১৯৯৪ সালে, হঠাৎ নাম্বি নারায়ণনকে শত্রুদেশের কাছে ক্রায়োজেনিক প্রকল্পটির তথ্য ফাঁস ও গুপ্তচর বৃত্তির জন্য গ্রেফতার করে জেলে রাখা হয়। তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলের সরকার ও তাদের প্রশাশন তাকে বিশ্বাসঘাতক বলে নির্যাতন এবং মানসিক হয়রানি করতে থাকে।

১৯৯৮ সালে আউটলুক পত্রিকার একটি প্রবন্ধে নাম্বি নারায়ণনের মত নিরীহ মানুষকে আটকাতে গোয়েন্দা কর্মকর্তা, পুলিশ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর জড়িত থাকার বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানা যায়। পরে বোঝা যায় যে এটি ভারতের ক্রায়োজেনিক রকেট প্রযুক্তির কর্মসূচি বন্ধ করার জন্য সিআইএ এবং অন্যান্য সংস্থাগুলির যোগসাজসের ফল। সিবিআই এই পরিকল্পিত অভ্যুত্থানে জড়িত সবার নাম প্রকাশ করেছে। উল্লেখ্য নাম্বি নারায়ণানের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ও চক্রান্তে জড়িত ব্যক্তিদের কেরালার কংগ্রেস ও সিপিআইএম উভয় সরকারই সম্মান প্রদানে এত একটুও পিছপা হয়নি।

মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১৪ সালে এই মামলাটি যৌক্তিকভাবে শেষ হয় এবং অবশেষে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট নাম্বি নারায়ণানের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ খারিজ করে দিয়ে কেরালা সরকারকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়।

যদিও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে তার জীবনের ২০ বছর কেউ ফেরৎ দেবে কি?

ভারতের মহাকাশ কর্মসূচি যে সময় হারালো সেটাই বা কে ফেরত দেবে?

ভারতকে বিশ্বের কাছে পিছিয়ে দিয়ে দুর্বল জাতি বানানোর জন্য যে বিশ্বাসঘাতকেরা এগিয়ে এসেছিল তারা ফেরত দেবে? কখনোই এটা বিশ্বাস করা যায় না।

অবশেষে মোদি সরকার যখন নাম্বি নারায়ণানের প্রচেষ্টার স্বিকৃতি হিসেবে তাঁকে পুরস্কৃত করছে তখন প্রত্যেক ভারতীয়ের উচিত তাঁর মত একজন অকৃত্রিম দেশভক্তের প্রতি গর্ব বোধ করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.