ঋষি অরবিন্দের জীবন ও দর্শন

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ সংযোগ ছিল ১৯০৫ থেকে ১৯১০— এই চারবছর , কিন্তু তাঁর প্রভাব পড়েছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের সমস্ত পন্থার ওপরই।তাই স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে ঋষি অরবিন্দের পরিচয় কোনোভাবেই ছোটো নয় কিন্তু তাঁর নামের আগে আমরা ‘ঋষি’ বলতেই অভ্যস্ত কারণ ভারতবর্ষ ‘ঋষি’ পরিচয়কেই সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করেছে।আর ভারতীয় দর্শন কে ইউরোপীয় দর্শনের সঙ্গে তূলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে আধুনিকভাবে উপস্থাপিত করার কারণে তিনি নিঃসন্দেহে , আক্ষরিক অর্থেই আধুনিক ভারতের একজন ‘ঋষি’।ঋষি অরবিন্দের জীবনের শেষ চল্লিশ বছর কাটে পন্ডিচেরীতে যোগসাধনায় এবং সেই সময়ের উপলব্ধি তিনি লিপিবদ্ধ করেন ‘The Life Divine’ (দিব্যজীবন) বইতে। প্রাচীন ভারতের সত্যদ্রষ্টা ঋষির মতোই ‘অতিমানস তত্ত্ব’ উপলব্ধিই ছিল শ্রী অরবিন্দের ‘সিদ্ধিলাভ’।
ঋষি অরবিন্দের সাহিত্য প্রতিভা তাঁর এক স্বতন্ত্র পরিচয়ের দাবি রাখে।মাত্র ৭ বছর বয়সে পিতার ইচ্ছায় প্রবাসী হয়েছিলেন কারণ পিতা কৃষ্ণধন ঘোষ চেয়েছিলেন তাঁর চার পুত্র ইংরেজের আদব-কায়দায় বড় হয়ে উঠুক—ভারতীয় সংস্কৃতির বিন্দুমাত্র প্রভাব যেনো তাদের উপর না পড়ে। অরবিন্দের মাতামহ রাজনারায়ণ বসু , সনাতন ধর্ম-সংস্কৃতির প্রসারে সেইসময়ের অগ্ৰগণ্য ব্যক্তি। উপনিষদের গভীর জ্ঞান ছিল রাজনারায়ণ বসুর , ‘হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠতা’ নামক প্রবন্ধ লিখেছিলেন , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জীবনস্মৃতি’ প্রবন্ধে যে সঞ্জীবনী সমিতির উল্লেখ পাওয়া যায় তার প্রতিষ্ঠাতা রাজনারায়ণ বসু।১৪ বছর পর দেশে ফিরে বরোদায় চাকরির সময় প্রতিবছর ছুটিতে অরবিন্দ দেওঘরে যেতেন মাতামহের সঙ্গে সময় কাটাতে।তাই একদিকে পিতার ইচ্ছায় ইউরোপীয় ভাষা-সাহিত্য , ইতিহাসে অরবিন্দ যেমন পারদর্শী হয়েছিলেন ; মাতামহের প্রভাবে ভারতীয় শাস্ত্র , সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আগ্ৰহ জন্মায়। বিলেতে থাকাকালীন তাঁর গ্ৰীক , লাতিন ভাষায় দক্ষতা বিশেষজ্ঞদের প্রশংসা লাভ করেছিল।মাত্র ১৪ বছর বয়সে প্রথম ইংরেজি কবিতা লিখেছিলেন।বরোদায় থাকার সময় তিনি সংস্কৃত ও বাংলা শিখেছিলেন।মারাঠী , গুজরাটি , হিন্দিও ভালো বুঝতেন।এই সময়ে কালিদাসের বিক্রমোর্বশী নাটকের ইংরেজি তে অনুবাদ করেন।রামায়ণ ও মহাভারতের বিভিন্ন ঘটনার উপর আধারিত ইংরেজি কবিতা লেখেন।

ইউরোপীয় ভাষা ও ভারতীয় ভাষা বিশেষ করে সংস্কৃতের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন বলেই , সমস্ত দর্শনের মূল গ্ৰন্থের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল শ্রী অরবিন্দের— এই সুযোগ সমসাময়িক বিখ্যাত অনেক দার্শনিকদের ঘটে নি।বিকৃত অনুবাদের উপর নির্ভর করে দর্শনের আলোচনার অপবাদ থেকে শ্রী অরবিন্দ মুক্ত ছিলেন।বাংলা ভালো বলতে পারতেন না বলে ইংরেজি তে বক্তৃতা দিতে কুন্ঠাবোধ করতেন।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ এর সন্ন্যাসী সন্তানদের দেশভক্তির আদর্শ তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। অরবিন্দ আনন্দমঠের অনুরূপ ভবানী মন্দির নামক আশ্রমের কল্পনা করেন এবং ‘ভবানী মন্দির’ পুস্তকে শক্তি উপাসনার মাধ্যমে ভারতবাসী কে রজোগুণের বিকাশের আহ্বান জানিয়েছিলেন।ব্রক্ষ্মচর্য ব্রত নিয়ে বিশ্বজননী ভবানীর পূজা দ্বারা কী করে স্বাধীনতা লাভ করতে হবে , শ্রীঅরবিন্দ এই পুস্তকে তা দেখিয়েছেন।
‘ভবানী মন্দির’ এ লেখেন—-
আহ্বান পাঠাও তবে
যেথা যত আছ সনাতন
ভারত-সন্তান
মা ভৈঃ মন্ত্রে জাগো সংগ্ৰামের সাজে।
কোথা ধনু খড়্ গ তব ?চিরঞ্জয় জাগো
জাগো সুপ্তসিংহ জাগো
জননী জাগ্ৰতা ।। (৩১) (অনূদিত)
অরবিন্দ ‘ধর্ম ও জাতীয়তা’ বইয়ে লিখেছেন “প্রায়ই যাঁহারা জাতি-রক্ষার্থে যুদ্ধ করিয়াছেন , প্রতাপ সিংহ , শিবাজী , প্রতাপাদিত্য , চাঁদ রায় প্রভৃতি সকলেই শক্তি উপাসক বা তান্ত্রিক যোগীর শিষ্য ছিলেন।”
সন্ন্যাস গ্ৰহণ না করলেও পারিবারিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য অরবিন্দ ত্যাগ করেছিলেন এবং তাঁর স্ত্রীকেও সাধারণ স্ত্রীদের সুখ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছিল।

দেশে ফেরার প্রায় দশ বছরের মধ্যেই ১৯০২ সালে বাংলায় গুপ্তসমিতির প্রতিষ্ঠা করেন এবং পূর্ব ও পশ্চিম ভারতের গুপ্তসমিতির মধ্যে যোগাস্থাপনে সচেষ্ট হন।১৯০৬ সালে বরোদা ত্যাগের পূর্বে প্রতিবছর পূজার ছুটিতে অরবিন্দ কলকাতায় আসতেন।
বরোদায় থাকাকালীন কংগ্রেসের গঠন-পদ্ধতি ও কার্যপদ্ধতির সমালোচনা করে পুণের ‘ইন্দুপ্রকাশ’ পত্রিকায় একটি ধারাবাহিক প্রবন্ধ লেখেন—‘New Lamps for Old’ । সেসময়ে কংগ্রেসের লক্ষ্য ছিল শুধুমাত্র শাসন-সংস্কার কিন্তু শ্রীঅরবিন্দের ইচ্ছা ছিল জনগণের মনে স্বাধীনতার আকাঙ্খা জাগানো এবং শুধুমাত্র উচ্চবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ কংগ্রেসের সঙ্গে সাধারণ জনগণের যোগস্থাপন।

শ্রী অরবিন্দ নিজের লেখনী শক্তিকে জনজাগরণের কাজে লাগাতে ‘বন্দেমাতরম্’ , ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় রাষ্ট্রবাদের প্রচার করতে থাকেন।বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে দেশবাসীর একাত্মতা ও দেশভক্তির উদ্দীপনাকে কাজে লাগাতে সশস্ত্র আন্দোলনকে গতি দেওয়ার চেষ্টা করেন।
১৯০৬ সালে বরোদা কলেজের সহকারী অধ্যক্ষের পদ ত্যাগ করে অপেক্ষাকৃত কম বেতনে জাতীয় শিক্ষা পরিষদের অধ্যক্ষের পদ গ্ৰহণ করেন।
রাজনৈতিক পথে স্বাধীনতালাভের জন্য একদিকে জাতীয় কংগ্রেসের মঞ্চকে কাজে লাগান এবং পূর্ণ স্বরাজের প্রস্তাব পাশ করানোর দাবিতে কংগ্রেসের অভ্যন্তরে সরব হন আর অন্যদিকে গুপ্তসমিতির সঙ্গে যুক্ত যুবকদের উৎসাহ দিতে থাকেন।বালক গঙ্গাধর তিলক ও শ্রী অরবিন্দের উদ্যোগেই কংগ্রেসের সুরাট অধিবেশন ভেস্তে যায় এবং কংগ্রেস তথাকথিত ‘নরম’ ও ‘চরম’ বা ‘জাতীয়তাবাদী’ দলে ভাগ হয়ে যায়। তাঁর নিজের কথায় , “very few people know that it was I (without consulting Tilak) who gave the order that led to the breaking of the Congress and was responsible for the refusal to join the new-bangled Moderate Convention which were the two decisive happenings at Surat”.( Sri Aurobindo on Himself and on the Mother)

‘বন্দেমাতরম্’ পত্রিকার বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের অভিযোগে , পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তাঁর উপর দায়ভার এলে , তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য যাতে ‘জাতীয় শিক্ষা পরিষদ’ ক্ষতি না হয় সেজন্য পরিষদের অধ্যক্ষের পদ ত্যাগ করেন।১৯০৭ সালের অগাস্ট মাসে জামিনে মুক্ত অরবিন্দ ছাত্রদের উদ্দেশ্য বলেন ” ভারতকে তোমরা বড় করো । একদিন ভারত ছিল জগতের গুরু ; তখন জগৎ ভারতের জ্ঞানের প্রতীক্ষায় থাকতো । আবার যেনো ভারত আগের ন্যায় মাথা উন্নত করে জগৎ-সভায় দাঁড়াতে পারে। জাতীয় বিদ্যালয়ের উদ্দ্যেশ্য ছাত্রদের শুধু জ্ঞানদান নয় , কিংবা জীবিকা অর্জনের জন্য ছাত্রদের যোগ্য করে তোলা নয় । তারা মাতৃভূমির জন্য কাজ করবে , দরকার হলে দুঃখবরণ করবে— এমন সব মায়ের সন্তান তৈরি করাই জাতীয় শিক্ষার লক্ষ্য।”
বন্দেমাতরম পত্রিকার বিরুদ্ধে মামলার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নমস্কার’ কবিতায়। অরবিন্দের ত্যাগ , পান্ডিত্য , প্রতিভা ও নির্ভীকতা কে রবীন্দ্রনাথ প্রণাম জানান এইভাবে— “অরবিন্দ , রবীন্দ্রের লহ নমস্কার”।
অরবিন্দ-প্রশস্তির সঙ্গে সঙ্গেই রবীন্দ্রনাথ দেশের বিপদে চুপ করে থাকা ভীরু নেতাদের তিরস্কার করে বলেন —
“যে নপুংস কোনোদিন
চাহিয়া ধর্মের পানে নির্ভীক স্বাধীন
অন্যায়েরে বলেনি অন্যায়,…..
সেই ভীরু নতশির , চিরশান্তি তা’রে
রাজকারা বাহিরেতে নিত্য কারাগারে ।”

শ্রীঅরবিন্দের জীবনে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি সম্ভবত ‘আলিপুর বোমা মামলা’ — এই ঘটনার পরে শ্রীঅরবিন্দ রাষ্ট্রসেবার অন্য এক পথ বেছে নিয়েছিলেন।
অরবিন্দ গ্ৰেফতার হন ১৯০৮ সালের ২রা মে ; তার আগে ১৯০৭ সালের ৬ই ডিসেম্বর তারিখে স্ত্রী মৃণালিনী দেবী কে লেখেন ; “আমার এইখানে এক মুহূর্তও সময় নাই ; লেখার ভার আমার উপর ,কংগ্রেস সংক্রান্ত সকল কাজের ভার আমার উপর , “বন্দেমাতরমের” গোলমাল মিটাইবার ভার আমার উপর । আমি আর পেরে উঠছি না। তাহা ছাড়া আমার নিজের কাজও আছে।” ‘নিজের কাজ’ অর্থাৎ সাধন-ভজন।’আলিপুর বোমা মামলা’ অরবিন্দ কে নিভৃতে যোগসাধনার সুযোগ এনে দেয়।
এই মামলাতে তল্লাশির সময় শ্রী অরবিন্দের লেখা বিভিন্ন প্রবন্ধ তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।এর মধ্যে একটি প্রবন্ধ ‘What is extreamism’ সম্পর্কে জজ বিচক্রফ্ট মন্তব্য করেন ‘As an essay the article is a splendid piece of writing’— অভিযুক্তের লেখনী প্রতিভার প্রশংসা করে বিচারকের এহেন মন্তব্যের আর একটি উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।

মামলা চলাকালীন অরবিন্দ নিজের অভিজ্ঞতা ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধি ‘কারাকাহিনী’ বইতে লিপিবদ্ধ করেন। কারাবাসের সময় শ্রী অরবিন্দের ‘বাসুদেবঃ সর্বমিতি’ অনুভব হয় অর্থাৎ জেলের দেওয়াল , পুলিশ , বিচারক , বন্দী , গাছ সর্বত্র শ্রীকৃষ্ণ কে দেখতে পান।কারামুক্তির পর তাঁর বিখ্যাত উত্তরপাড়া অভিভাষণে শ্রী অরবিন্দ কারাবাসের(১৯০৮ সালের ৫ই মে থেকে ১৯০৯ সালের ৫ই মে) সময়ে তাঁর ভবিষ্যতের লক্ষ্য ও কাজ সম্পর্কে যোগসাধনায় প্রাপ্ত অন্তরাত্মার নির্দেশ জনসমক্ষে বলেন—- “যখন তুমি বাইরে যাবে তোমার জাতিকে সর্ব্বদা এই বাণী শোনাবে যে সনাতন ধর্মের জন্যেই তারা উঠছে নিজেদের জন্যে নয় পড়ন্ত সমস্ত জগতের জন্যেই তারা উঠছে। আমি তাদের স্বাধীনতা দিচ্ছি জগতের সেবার জন্যে। অতএব যখন বলা হয় যে ,ভারত উঠবে , তার অর্থ এই যে, সনাতন ধর্ম্ম উঠবে। যখন বলা হয় যে , ভারত মহান্ হবে , তার অর্থ এই যে , সনাতন ধর্ম্ম মহান্ হবে । যখন বলা হয় যে ,ভারত নিজেকে বর্দ্ধিত ও প্রসারিত করবে, তার অর্থ এই যে সনাতন ধর্ম নিজেকে বর্দ্ধিত ও প্রসারিত করবে। এই ধর্ম্মের জন্যে এবং এই ধর্ম্মের দ্বারাই ভারত বেঁচে আছে।ধর্ম্মটিকে বড় করে তোলার অর্থ দেশকেই বড় করে তোলা।”
সনাতন ধর্মের মহানতা নিয়ে শ্রী অরবিন্দ ঐ বক্তৃতায়(‘উত্তরপাড়া অভিভাষণ’ , ১৯০৯ সালের ৩০শে মে) বলেন– “….হিমালয় ও সমুদ্রের যারা পরিবেষ্টিত এই উপদ্বীপে নিরালায় এই ধর্ম্ম গড়ে উঠেছে , এই পুণ্য ও প্রাচীন ভূমিতে আর্য্যজাতির উপর ভার দেওয়া হয়েছিল এই ধর্ম্মকে যুগ যুগান্তরের ভিতর দিয়ে রক্ষা করতে ।
….এইটিই হচ্ছে একমাত্র ধর্ম্ম যা মানবজাতিকে ভাল করে বুঝিয়ে দেয় , ভগবান আমাদের কত নিকট , কত আপনার , মানুষ যত রকম সাধনার দ্বারা ভগবানের দিকে অগ্ৰসর হতে পারে সবই এর অন্তর্গত।”
‘সনাতন ধর্ম্ম , এইটিই হচ্ছে জাতীয়তা ‘ — এই ছিল অরবিন্দের উপলব্ধি।
কারামুক্তির পর অরবিন্দ দেখলেন , দেশে একবছর আগের সেই উদ্দীপনা আর নেই , চারিদিক যেনো নিস্তব্ধ— এই নিস্তব্ধতাকে তিনি ঈশ্বরের পরিকল্পনা বলে মেনে নিলেন। রাজনৈতিক আন্দোলনে তাঁর অন্যতম সহযোগী বাল গঙ্গাধর তিলক মান্দালয়ের জেলে কারাবন্দী , বিপিনচন্দ্র পাল স্বেচ্ছায় প্রবাসী হয়েছেন। শ্রী অরবিন্দ তখন একমাত্র সক্রিয় জাতীয়তাবাদী নেতা— গভর্নমেন্টের এক নম্বর শত্রু।তবু নিরাশ না হয়ে , ‘কর্মযোগীণ’ ও ‘ধর্ম’ পত্রিকায় প্রাচীন ভারতীয় শিক্ষার আদর্শ ও পাশ্চাত্যের অনুকরণ ত্যাগ করে শিল্পজগতের সর্বত্র ভারতবর্ষের মহিমা সম্পর্কে জনজাগরণের কাজ , বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা চলতে থাকে। এইসময় তাঁর ভাষণ ,উপনিষদের বিভিন্ন ঘটনার উদাহরণে প্রাচীন ভারতের কোনো ঋষির মতোই লাগতো।এরই মধ্যে সিস্টার নিবেদিতার বিশ্বস্ত সূত্র মারফত জানতে পারলেন গভর্নমেন্ট যে কোনো সময় তার বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের অভিযোগ আনতে পারে।
যে সময় রাজদ্রোহের অভিযোগ আনা হলো অরবিন্দ তখন বাংলার বাইরে। প্রথমে ফরাসী উপনিবেশ চন্দনগরে দেড়মাস , তারপর পন্ডিচেরীতে।
‘কারাকাহিনী’তে শ্রী অরবিন্দ বলেছিলেন “আবার যখন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করিব তখন সেই পুরাতন অরবিন্দ ঘোষ প্রবেশ করিবে না , কিন্তু একটি নূতন মানুষ নূতন চরিত্র লইয়া নূতন কর্মভার গ্রহণ করিয়া আলিপুরস্থ আশ্রম হইতে বাহির হইবে।”
শ্রীঅরবিন্দ , তাঁর সেই নতুন কাজের জন্য প্রায় ৪০ বছর কাটালেন পন্ডিচেরীতে। এর মধ্যে একাধিকবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , চিত্তরঞ্জন দাশ সহ বিভিন্ন বিশিষ্টজনদের অনুরোধ সত্ত্বেও রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করেননি তাঁর অন্তরাত্মার নির্দেশিত বৃহত্তর লক্ষ্যপূরণের জন্য।
অরবিন্দ , নিজের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেও যোগাভ্যাস করতেন কিন্তু সেই যোগ ছিল দেশের সেবায় নিজের কর্মদক্ষতা বাড়ানোর জন্য কিন্তু পন্ডিচেরী পর্বে যে অরবিন্দকে আমরা পাই তাঁর ‘সাধনা’ ছিল সমস্ত মানবজাতির কল্যানের জন্য। পন্ডিচেরীতে যোগসাধনার সঙ্গেই চলতে থাকে ‘আর্য’ পত্রিকায় লেখার কাজ , তাঁর নিজের কথায় ‘The Arya is the the intellectual side of my work for the world’।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , ১৯২৮ সালে ইউরোপ যাত্রার সময় পন্ডিচেরীতে শ্রী অরবিন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং নিজের বিবরণে লিখেছেন , “প্রথম দৃষ্টিতেই বুঝলুম— ইনি আত্মাকেই সবচেয়ে সত্য করে চেয়েছেন , সত্য করে পেয়েছেন।সেই তাঁর দীর্ঘ তপস্যার চাওয়া ও পাওয়ার দ্বারা তাঁর সত্তা ওতপ্রোত। আমার মন বললে , ইনি এঁর অন্তরের আলো দিয়েই বাহিরের আলো জ্বালাবেন।
…… অরবিন্দকে তাঁর যৌবনের মুখে ক্ষুব্ধ আন্দোলনের মধ্যে যে তপস্যার সামনে দেখেছিলাম সেখানে তাঁকে জানিয়েছি—
অরবিন্দ, রবীন্দ্র লহ নমস্কার
আজ তাকে দেখলুম তার দ্বিতীয় তপস্যার সামনে, অপ্রগলভ স্তব্ধতায়—- আজও তাঁকে মনে মনে বলে এলুম—-
অরবিন্দ , রবীন্দ্রের লহ নমস্কার।”
জাতীয় কংগ্রেস ১৯২৯ সালে লাহোর অধিবেশনে প্রথম ‘পূর্ণ স্বরাজ’ এর প্রস্তাব পাশ করে কিন্তু অরবিন্দের উদ্যোগেই স্বরাজ , স্বদেশী , বয়কট ও জাতীয় শিক্ষার প্রস্তাব পাশ করানোর দাবিতে ১৯০৭ সালে জাতীয়তাবাদী নেতারা নিজেদের একত্রিত করে ‘মডারেট’ কংগ্রেস থেকে পৃথক হন। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে সঠিক পথ ও গতি দিতে শ্রী অরবিন্দের প্রচেষ্টা ও সফলতা তুলনাহীন।একথা সেসময়ের জাতীয়তাবাদী নেতারা ও বিপ্লবীরা যেমন জানতেন , ব্রিটিশ সরকারও অরবিন্দের প্রভাব ও কাজ সম্পর্কে সবসময় সজাগ থাকতো। পন্ডিচেরীতেও তাঁর কাজকর্মে নজর রাখার জন্য গুপ্তচর নিয়োগ করেছিলো ইংরেজ সরকার। এইরকম অবস্থায় প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদান তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল কিন্তু যোগের মাধ্যমে সমস্ত বিশ্বকে তাঁর ‘দান’ , স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে তাঁর পরিচয়ের থেকেও বড়ো। তিনি প্রাণের ‘বিবর্তন’কে , চেতনতত্ত্বের অভিব্যক্তির ক্রমান্বয়ে উন্নততর সোপানে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া হিসেবে উপলব্ধি করেছেন এবং এই বিবর্তনের ধারা বেয়ে মানুষ একদিন সজ্ঞানে সাধনার মাধ্যমে বিবর্তিত হয়ে দিব্য মানুষে পরিণত হবে। তাঁর মতে , জড় হতে প্রাণের উদ্ভব কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় , জড়ের মধ্যেই চেতনশক্তি আছে অভিব্যক্তির অপেক্ষায় ; ‘অতিমানস তত্ত্বের’ সাহায্যে বুঝিয়েছেন উপনিষদের সমর্থিত বাণী ‘সর্বং খল্বিদং ব্রক্ষ্ম’। দার্শনিক হিসেবে শ্রী অরবিন্দ দেশের গন্ডী পেরিয়ে সমগ্ৰ মানবজাতির প্রতিনিধিরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। ফ্রান্সের বিখ্যাত মনিষী রোঁমা রোঁলার মতে , শ্রীঅরবিন্দ ছিলেন “ভারতের মহান ঋষিকুলের শেষ ঋষি”।ঋষি অরবিন্দ নিজের দিব্যদৃষ্টিতে ভারতবর্ষের যে ‘নবজন্ম’ দেখেছিলেন ,তার সঞ্জীবনী শক্তির উৎস সম্পর্কে বলেছেন….
“একটি কথা এখানে স্মরণে রাখিতে হইবে এবং অনেকেই ন্যায্যাতঃ এ কথাটির উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন মনে করিয়াছেন।তাহা এই যে , ভারত চিরদিনই — এমন কি জাতীয় জীবনের ঘোর অবসাদের মধ্যেও , অক্ষত রাখিয়াছে তাহার অধ্যাত্ম প্রতিভা।এই বস্তুটিই ভারতকে রক্ষা করিয়াছে ভারতের প্রত্যেক সন্ধি-মুহুর্তে– আর আজকের যে নবজন্ম দেখা দিয়াছে , তাহারও গোড়ার অনুপ্রেরণা ঐ বস্তুটির মধ্যে।” (ভারতের নবজন্ম)
আজ আমরা যখন স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসব পালন করছি ; সেইসময় ‘বিশ্বগুরুর’ আসনে স্থান পেতে ঋষি অরবিন্দের দর্শনের উপলব্ধি ও রূপায়ণ একান্ত আবশ্যক।

পিন্টু সান্যাল

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.