নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে আন্দোলন জোরদার করছে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের উপর চাপ বাড়াতে মঙ্গলবার দিল্লিতে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর বাসভবনে চা-চক্রে বৈঠকে বসেন বিরোধী নেতারা। বৈঠকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি ছাত্র সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে রাহুলের হুঁশিয়ারি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে ‘জাল গুটিয়ে আসছে’। তবে আগামী দিনে কী ভাবে আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে, তা এখনই প্রকাশ্যে আনতে চাননি তিনি।
মঙ্গলবার বিকেলে দিল্লির ৫, সুনেরি বাগ রোডে রাহুলের বাসভবনে আয়োজিত ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেসের প্রবীণ নেত্রী সনিয়া গান্ধী, দলের সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে, আরজেডি সাংসদ মনোজ ঝা, কংগ্রেস সাংসদ শশী তারুর, সিপিএম সাংসদ জন ব্রিটাস, কংগ্রেস নেতা সচিন পায়লট, সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব এবং আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ-সহ একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে খড়্গে জানান, সম্ভবত এই প্রথম দিল্লিতে এত সংখ্যক রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের প্রতিনিধি একত্রিত হয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, দেশবাসীকে রক্ষা করার লক্ষ্যেই এই ঐক্য গড়ে উঠেছে। আগামী দিনে কী ভাবে আন্দোলন এগোবে, তা পরে জানানো হবে বলে জানান তিনি।
একই সুর শোনা যায় রাহুলের কথাতেও। তাঁর কথায়, ‘‘এখনই পরিকল্পনার বিষয়ে আপনাদের জানানো সম্ভব নয়। কিন্তু এই লড়াই চলবে।’’
বিচারব্যবস্থার উপর আস্থা রাহুলের
আন্দোলনের পরবর্তী পর্যায়ে দেশের বিচারব্যবস্থা এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন রাহুল। তিনি বলেন, ‘‘ভারতের বিচারব্যবস্থা এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে শ্রদ্ধা করি। তাঁদেরও ভূমিকা রয়েছে এই লড়াইয়ে। আমরা আশা রাখি, তাঁরা সেই ভূমিকা পালন করবেন। রাজনৈতিক বাধা থাকবে, মানুষের সদিচ্ছাও থাকবে। আমরা জয়ী হব।’’
রাহুলের বক্তব্য, বিরোধীদের লক্ষ্য একটাই—দেশে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তাঁর দাবি, এই আন্দোলনে কোনও সমান্তরাল কর্মসূচি নেই। বিরোধীরা একজোট হয়েই লড়াই চালিয়ে যাবেন। জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-ও ধারাবাহিক আন্দোলন চালাচ্ছে। বিরোধী জোটের অভিন্ন কর্মসূচির প্রসঙ্গে রাহুল সেই আন্দোলনের কথাই ইঙ্গিত করে থাকতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।
যন্তর মন্তরে প্রতিবাদে বাধা, সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জের ঘোষণা
মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সুর আরও চড়িয়ে রাহুল বলেন, ‘‘দেশে গণতন্ত্র ধ্বংস হয়েছে। ভোট ধ্বংস হয়েছে। দেশে যাতে গণতন্ত্রের শাসন ফিরে আসে, তাই লড়াই করছি।’’
যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের উপর নিষেধাজ্ঞা নিয়েও সরব হন তিনি। সোমবার দিল্লি পুলিশের তরফে জানানো হয়েছিল, মধ্য দিল্লির যন্তর মন্তরে আর প্রতিবাদ কর্মসূচি করা যাবে না। পরিবর্তে রাজধানীর তিনটি জায়গাকে প্রতিবাদের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে রাহুল বলেন, ‘‘সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যন্তর মন্তরে আর গণতান্ত্রিক মতামত তুলে ধরা যাবে না। আমরা এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করব।’’
এর পরেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে নিশানা করে তাঁর মন্তব্য, ‘‘যাঁরা এই কাজ করেছেন— নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ, জ্ঞানেশ কুমার— তাঁদের এ বার বুঝতে হবে যে, তাঁদের ঘিরে জাল গুটিয়ে এসেছে। সংবিধান ধ্বংস করে পালিয়ে যাওয়া সহজ নয়।’’
বিরোধী নেতাদের এক সুর, ভোটচুরির অভিযোগে সরব তেজস্বী
রাহুলের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেছেন বৈঠকে উপস্থিত অন্যান্য বিরোধী নেতারাও। এনসিপি (শরদচন্দ্র পওয়ার) সাংসদ সুপ্রিয়া সুলে বলেন, সংবিধান আজ হুমকির মুখে বলেই বিরোধীরা এক জায়গায় জড়ো হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।
আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদবের অভিযোগ, ‘ভোটচুরি’র জবাব দিতে হবে। জ্ঞানেশ কুমারকে নিশানা করে তিনি বলেন, ‘‘জ্ঞানেশ পাপেটের মতো কাজ করেছেন। ওঁদের সাজা হবে। এই লড়াই চালিয়ে যাব এবং জয়ী হব।’’
শিবসেনার (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে) নেতা সঞ্জয় রাউত আরও আক্রমণাত্মক সুরে জ্ঞানেশকে ‘মাফিয়া’ বলে কটাক্ষ করেন। তৃণমূল সাংসদ সাগরিকা ঘোষের হুঁশিয়ারি, জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না করা পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন চলবে।
বৈঠকে উপস্থিত নেহা বোরা বলেন, ‘‘শত্রু একটাই, বিজেপি। সংবিধান তৈরিতে ওদের কোনও ভূমিকা নেই। সব বিরোধী দল একজোট হয়েছে, এটা খুব ভাল বিষয়। আমাদের লড়াই শুধুই বিজেপির বিরুদ্ধে। ওরা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।’’
সমাজবাদী পার্টির নেতা হরেন্দ্র মালিকও জানান, তাঁদের দল এই লড়াইয়ে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের পাশে রয়েছে।
এসআইআর-এ অনিয়মের অভিযোগ তুলে সুপ্রিম কোর্টে বিরোধীরা
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের আন্দোলন অবশ্য মঙ্গলবারের বৈঠকেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আগে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করেছেন রাহুল গান্ধী-সহ বিরোধী নেতারা। এসআইআর-এ অনিয়মের অভিযোগ তুলে সোমবার মিছিল করে সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে মামলা দায়ের করেন রাহুল, প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা এবং অন্য বিরোধী নেতারা। ওই মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন সিজেপি আন্দোলনের অন্যতম মুখ তথা আইসার সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা বোরা।
ওই মিছিলকে কেন্দ্র করে দিল্লি পুলিশ দু’টি এফআইআর দায়ের করেছে। পুলিশের অভিযোগ, আগাম অনুমতি ছাড়াই বারাখম্বা রোড থেকে সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করা হয়েছিল। মিছিল আটকাতে সুপ্রিম কোর্টমুখী রাস্তার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ব্যারিকেড বসানো হয়। বিরোধী নেতারা যে ট্রাকে ছিলেন, তার ধাক্কায় ব্যারিকেড ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও অভিযোগ। এই দুই অভিযোগের ভিত্তিতে বারাখম্বা রোড ও তিলক মার্গ থানায় পৃথক দু’টি এফআইআর দায়ের করা হয়েছে।
সোমবার মিছিল শুরুর আগে সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে আক্রমণ করেছিলেন রাহুল। তাঁর দাবি ছিল, আন্দোলনের চাপে জ্ঞানেশের ঘুম কমে গিয়েছে এবং তিনি ভয়ে রয়েছেন।
দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে বৈঠকের পর বাসে চড়ে সুপ্রিম কোর্টের দিকে রওনা দেন বিরোধী নেতারা। ওই বৈঠকে রাহুল, প্রিয়ঙ্কা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদব ও তেজস্বী যাদব-সহ একাধিক নেতা উপস্থিত ছিলেন। বাসের সঙ্গে থাকা বিপুল সংখ্যক সমর্থককে নিয়ে মিছিল এগোতে থাকে। মাঝপথে বারাখম্বার কাছে বাস থেকে নেমে রাহুল, প্রিয়ঙ্কা এবং আইসা নেত্রী নেহাও কর্মীদের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করেন। পরে ভগবান দাস মার্গে বিরোধী জোটের মিছিল আটকে দেন নিরাপত্তারক্ষীরা। সেখানে মানবশৃঙ্খল তৈরি করে দাঁড়িয়ে পড়েন আধাসেনার জওয়ানেরা।
জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে মামলায় বিরোধী নেতাদের স্বাক্ষর
সোমবার সুপ্রিম কোর্টে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় একাধিক বিরোধী নেতার স্বাক্ষর রয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা তথা কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে, তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায়, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব, শিবসেনার (উদ্ধব শিবির) নেতা সঞ্জয় রাউত, সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবি, সিপিআইয়ের সাধারণ সম্পাদক ডি রাজা, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার নেত্রী মহুয়া মাজি, এনসিপি (শরদচন্দ্র পওয়ার)-এর নেত্রী সুপ্রিয়া সুলে এবং আইইউএমএল নেতা ইটি মহম্মদ বশির।
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে চাপ বাড়াতেই মঙ্গলবার বৈঠকে বসেছিলেন বিরোধী জোটের নেতারা। বৈঠক শেষে রাহুল স্পষ্ট করে দিয়েছেন, নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তাঁদের আন্দোলন চলবে। তবে আগামী দিনে সেই আন্দোলনের রূপরেখা কী হবে, তা পরে জানানো হবে।

