রাজধানীর বুকে নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ফের তোলপাড় শুরু হয়েছে দিল্লি। উত্তর-পশ্চিম দিল্লির স্বরূপনগর এলাকায় ১৭ বছর বয়সি এক কিশোরীর ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধারের পাঁচ দিন পর এই নৃশংস ঘটনার রহস্যভেদ করল পুলিশ। এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখে চার অভিযুক্তকে চিহ্নিত করে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের মধ্যে তিন জনই নাবালক। এদিকে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে নারী সুরক্ষা নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। দিল্লি পুলিশের ভূমিকা ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী।
ভয়াবহ দেহ উদ্ধার ও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট
গত ১৩ সেপ্টেম্বর উত্তর-পশ্চিম দিল্লির স্বরূপনগর এলাকার একটি খোলা রাস্তার পাশে এক মর্মান্তিক দৃশ্য দেখতে পান স্থানীয় বাসিন্দারা। রাস্তায় পড়ে থাকা একটি ক্ষতবিক্ষত মানবদেহ থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ানোয় এলাকাবাসীর সন্দেহ হয়। সেই পচা মাংসের লোভে দেহের চারপাশে কুকুরের দল ভিড় জমিয়েছিল এবং একটি হাত দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
দৃশ্যটি এতটাই ভয়াবহ ও বিকৃত ছিল যে দেহটি মহিলা না পুরুষের, তা প্রথমে বোঝাই যাচ্ছিল না। খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ দেহটি উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে স্পষ্ট হয় যে মৃতদেহটি এক ১৭ বছর বয়সি কিশোরীর এবং তাঁর ওপর পাশবিক গণধর্ষণ চালানো হয়েছিল।
তদন্তের মোড় ও সিসিটিভি ফুটেজ রহস্যভেদ
তদন্তে নেমে পুলিশের প্রাথমিক অনুমান ছিল, অন্তত দু’-তিন দিন আগে ওই কিশোরীকে ধর্ষণ করে খুন করার পর রাতের অন্ধকারে ঘাতকরা দেহটি ওই রাস্তায় ফেলে গিয়েছিল। রাস্তায় পড়ে থেকে দেহে পচন ধরতে শুরু করে। এই ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী না থাকায় পুলিশের মূল ভরসা ছিল সিসিটিভি ফুটেজ।
এলাকার প্রায় ৫০টি সিসিটিভি ক্যামেরা খতিয়ে দেখে পুলিশ একটি সন্দেহজনক টেম্পোর গতিবিধি লক্ষ্য করে, যার নম্বরপ্লেট স্পষ্ট ছিল না। রাতভর অভিযানের পর ওই টেম্পোটিকে খুঁজে বার করে পুলিশ। চালককে জিজ্ঞাসাবাদ করে খাদ্দা কলোনি থেকে অভিযুক্তদের চিহ্নিত করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ ও গ্রেপ্তারির বিবরণ
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতরা ওই কিশোরীর পূর্বপরিচিত এবং তারা একই এলাকায় থাকত। একটি টেম্পোর ভিতরেই তাকে গণধর্ষণ করা হয় এবং পরে একটি মাঠে নিয়ে গিয়ে ছুরিকাঘাত করে খুন করা হয় বলে তদন্তকারীদের অনুমান।
ডিসিপি (আউটার নর্থ) শোভিত ডি সাক্সেনাকে উদ্ধৃত করে ‘দ্য হিন্দু’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূল অভিযুক্তের সঙ্গে মৃত কিশোরীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ঘটনার দিন পাঁচজন একসঙ্গে দেখা করার পর কোনো কারণে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়, যার পরিণতিতে এই গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনা ঘটে।
ধৃতদের কাছ থেকে অপরাধে ব্যবহৃত দু’টি ছুরি, অপরাধের সময় পরা পোশাক এবং ওই টেম্পোটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) এবং পকসো (POCSO) আইনে মামলা রুজু করেছে। বর্তমানে চার অভিযুক্তই পুলিশের হেফাজতে রয়েছে।
পুলিশের জেরায় আরও জানা যায়, কিশোরী গত দু’দিন ধরে নিখোঁজ থাকলেও তার পরিবার থানায় কোনো নিখোঁজ ডায়েরি করেনি। পরিবারের দাবি, মেয়েটি এর আগেও মাঝেমধ্যে দু’-তিন দিনের জন্য বাড়ি থেকে চলে যেত এবং পরে ফিরে আসত, তাই তারা প্রথমে কোনো সন্দেহ করেননি।
রাজনৈতিক বিতর্ক ও রাহুলের নিশানা
রাজধানীতে নারী নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভপ্রকাশ করেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে নিশানা করে তিনি সোশ্যাল মিডিয়া এক্স (X)-এ লেখেন, ‘‘দিল্লিতে ১৭ বছর বয়সি এক কিশোরীকে গণধর্ষণ ও হত্যা করে দেহ ফেলে দেওয়া হয়েছিল। রাজধানীর বুকে এমন এক নৃশংস এবং বর্বরোচিত ঘটনা ঘটল, অথচ দিনের পর দিন পুলিশের কাছে এ বিষয়ে কোনো সূত্রই ছিল না।’’
তিনি আরও বলেন, এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে দিল্লি কেবল দেশের রাজধানীই নয়, বরং নারীদের কাছে প্রতিদিনের একটি আতঙ্কের জায়গা হয়ে উঠেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সরাসরি প্রশ্ন করে রাহুল বলেন, ‘‘দিল্লি পুলিশ আপনার নিয়ন্ত্রণে। শেষপর্যন্ত নারী নিরাপত্তার দায়িত্ব কার?’’ নারীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা না গেলে দেশের অগ্রগতি সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। স্বরূপনগরের এই পশুবিক কাণ্ড ২০১২ সালের ভয়াবহ নির্ভয়াকাণ্ডের স্মৃতিকেই যেন উস্কে দিয়েছে।

