রাজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অতীতে ‘কাটমানি’ চাওয়ার অভিযোগ উঠলেও, এ বার সেই বেআইনি কারবার পৌঁছে গেল কারাগারের অন্দরেও! বন্দিদের বিশেষ সুযোগসুবিধা পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা তোলার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। আর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। পুরো বিষয়টি নিয়ে জেল কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট তলব করেছে কলকাতা হাই কোর্ট।
অভিযোগের নেপথ্যে কী?
সূত্রপাতের কেন্দ্রবিন্দু দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট সংশোধনাগার। অভিযোগ উঠেছে, এই জেলের অন্দরে সুসংগঠিত বা ‘সিস্টেমেটিক’ উপায়ে বন্দিদের কাছ থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লক্ষ টাকা তোলা হতো।
জানা গেছে, ২০২৩ সালের মে ও জুন মাসের দিকে টানা ২৭ দিন ওই জেলে বন্দি ছিলেন আইনজীবী তৌহিদ ইসলাম। তাঁর দাবি, তিনি নিজের চোখে জেলের ভিতরের দুর্নীতি এবং এই লাগাতার তোলাবাজি দেখেছেন। পরবর্তীকালে এই ঘটনার জেরে রাজ্যজুড়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবিতে হাই কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেন তিনি।
হাই কোর্টে কী সওয়াল?
মঙ্গলবার বিচারপতি অরিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিচারপতি ঋতব্রতকুমার মিত্রের ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানি ছিল। মামলাকারীর পক্ষে আদালতে সওয়াল করেন আইনজীবী ফিরদৌস শামিম।
আদালতে পেশ করা অভিযোগে জানানো হয়:
- জেলের ভিতরে ভালো খাবার এবং ভালো জায়গায় ঘুমানোর মতো সাধারণ পরিষেবা দিতেও বন্দিদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হতো।
- বন্দি পিছু মাসে ৭ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো।
- এমনকি, ভালো পরিষেবা পাওয়ার জন্য বন্দিদের অনলাইনে টাকা দিতে বাধ্য করা হতো বলে অভিযোগ। তোলাবাজির মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ নাকি সরাসরি বন্দিদের মাধ্যমেই লেনদেন হতো।
এই সমস্ত গুরুতর অভিযোগ শোনার পর মঙ্গলবার হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ দুই সপ্তাহের মধ্যে রাজ্য সরকারকে এই আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দেওয়ার কড়া নির্দেশ দিয়েছে।
প্রাসঙ্গিক অন্যান্য জেল বিতর্ক
সাম্প্রতিককালে রাজ্যের বিভিন্ন সংশোধনাগারের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার। মাত্র কিছুদিন আগেই প্রেসিডেন্সি জেলের কুঠুরি থেকে আমেরিকান সেন্টারে হামলার ঘটনায় সাজাপ্রাপ্ত বন্দি আফতাব আনসারির কাছ থেকে একাধিক মোবাইল ফোন, আইফোন, ওয়াইফাই রাউটারসহ নানা যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং ৩১ হাজার টাকা উদ্ধার করেন জেল আধিকারিকেরা। ওই ঘটনার তদন্তভার বর্তমানে রাজ্য পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্সের (এসটিএফ) হাতে রয়েছে।
এ ছাড়া জেলবন্দিদের ফোন ব্যবহার করে বাইরে তোলাবাজি চালানোর অভিযোগও অতীতে প্রকাশ্যে এসেছে। এই ধারাবাহিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ও দুর্নীতির আবহেই এ বার জেলের অন্দরে বন্দিদের থেকে ‘কাটমানি’ আদায়ের অভিযোগ সামনে এল, যা এখন বিচারাধীন রয়েছে আদালতের অন্দরে।
এই মামলার পরবর্তী শুনানিতে রাজ্যের জমা দেওয়া রিপোর্ট কী তথ্য উঠে আসে, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে আইনি মহলের।

