কঠোর নিরাপত্তার বন্দোবস্ত এবং চব্বিশ ঘণ্টার সিসিটিভি নজরদারি এড়িয়ে প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের ভিতরে অপরাধী চক্র চালানোর অভিযোগ উঠল মার্কিন তথ্যকেন্দ্রে হামলা ও খাদিম কর্তা অপহরণের মূল চক্রী আফতাব আনসারির বিরুদ্ধে। সম্প্রতি তাঁর সেল থেকে আইফোনসহ একাধিক দামি স্মার্টফোন, ওয়াইফাই রাউটার এবং নগদ ৩১ হাজার টাকা উদ্ধারের ঘটনায় জেলখানার নিরাপত্তা ও কারা কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।
আফতাব আনসারিকে প্রথম থেকেই ‘হাই সিকিউরিটি ইনমেট’ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে কারা কর্তৃপক্ষ। আলিপুর কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে থাকাকালীন ২০১৩ সাল থেকে তাঁকে আলাদা সেলে রাখার পাশাপাশি ৬টি সিসিটিভি ক্যামেরা ও একজন নির্দিষ্ট কারারক্ষী পাহারায় মোতায়েন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আলিপুর সংশোধনাগার বন্ধ হওয়ার পর তাঁকে প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের ১/২২ ওয়ার্ডের ১৪ নম্বর সেলে স্থানান্তর করা হয় এবং একই রকমের কড়া নিরাপত্তার বন্দোবস্ত বজায় রাখা হয় বলে কারা দফতরের নথি থেকে জানা যায়।
গত রবিবার (২৩ আগস্ট) সেই ‘নিরাপদ’ সেলেই চালানো তল্লাশিতে উদ্ধার হয় একটি আইফোন সহ তিনটি দামি স্মার্টফোন, তিনটি জিও সিম কার্ড, দুটি জিও রাউটার, একটি ওয়াইফাই হটস্পট, দুটি কার্ড রিডার, ১২৮ জিবির একটি পেনড্রাইভ, তিনটি ওটিজি, একটি হেডফোন এবং ৫০০ টাকার নোটে মোট ৩১ হাজার টাকা নগদ। খাতায়-কলমে এমন কঠোর নিরাপত্তা থাকার পরেও এই সমস্ত গ্যাজেট ও নগদ টাকা কী ভাবে সেলের ভিতরে পৌঁছাল এবং চব্বিশ ঘণ্টার নজরদারি এড়িয়ে কীভাবে তা ব্যবহৃত হচ্ছিল, তা নিয়ে বড়সড় ধন্দ তৈরি হয়েছে। গোয়েন্দাদের একাংশের মতে, কারাকর্মীদের একাংশের সরাসরি সহযোগিতা ছাড়া এই ধরনের নেটওয়ার্ক চালানো অসম্ভব।
জেলে অপরাধীদের মোবাইল ব্যবহার এবং মাদকের কারবার নিয়ে রাজ্য সরকার কঠোর অবস্থান নেওয়ার পর থেকেই তৎপরতা শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই জেলের অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। গত ১৪ মে প্রেসিডেন্সি জেলে পুলিশের তল্লাশিতে ২৩টি মোবাইল ফোন উদ্ধারের ঘটনায় সুপার ও মুখ্য কনট্রোলার পদমর্যাদার দুই আধিকারিককে সাসপেন্ড করা হয়েছিল। পাশাপাশি, বন্দিদের হাতে মোবাইল পৌঁছানো এবং তাঁদের যোগাযোগের উৎস খতিয়ে দেখতে সিআইডি তদন্তের নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। বর্তমানে সিআইডির প্রধান নটরাজ রমেশ বাবুই কারা দফতরেরও অধিকর্তা। তবে আফতাবের সেল থেকে নতুন করে এই সমস্ত সামগ্রী উদ্ধারের ঘটনায় প্রমাণিত যে, সিআইডির দীর্ঘ তদন্তও এখনও পর্যন্ত এই জালের গভীরে পৌঁছাতে পারেনি।
উত্তরপ্রদেশের বারাণসীর বাসিন্দা আফতাব ২০০২ সাল থেকে কারাবন্দি রয়েছেন। এত বছর ধরে বন্দি থাকার পরেও তাঁর কাছে নিয়মিত কীভাবে হাজার হাজার টাকা আসছে এবং কারা তাঁকে আর্থিক সহায়তা করছে, তা নিয়েও তদন্ত শুরু হয়েছে। এর আগেও জেল থেকে তোলাবাজির বড় চক্র চালানোর অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। সাম্প্রতিক এই উদ্ধারের পর কারা দফতরের শীর্ষ আধিকারিকেরা অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছেন। সিসিটিভি ক্যামেরাগুলি আদতে সচল ছিল কি না কিংবা নিরাপত্তার ফাঁকফোকড় কোথায় ছিল, তা খতিয়ে দেখতে আইজি কারা সহ উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা গত শনিবারও জেলে গিয়ে কারারক্ষীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। সিআইডির পাশাপাশি গোয়েন্দারাও এখন এই বিস্তীর্ণ জেলের অন্তরালে চলা অপরাধের সাম্রাজ্যের মূল উৎসের সন্ধানে তল্লাশি চালাচ্ছেন।

