বয়সের ভারে সামান্য নুয়ে পড়া শরীর, কিন্তু হাতের কাজে নিখুঁত নিপুণতা। টেবিলে পরম যত্নে সাদা, ধূসর ও হালকা গোলাপি রঙের নানা বর্ণের কাগজ সাজাচ্ছেন জাপানের বিশ্বখ্যাত ‘মাস্টার পেপারমেকার’ আসাও শিমুরা। ষাটের দশক থেকে প্রাচীন জাপানি ‘ওয়াশি’ (Washi) কাগজের পুনর্জাগরণ ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করা এই শিল্পী এখন সুদূর জাপান থেকে পশ্চিমবঙ্গে এসে বাঙালি শিল্পীদের হাতেকলমে শেখাচ্ছেন সেই বিরল কৌশল। সম্প্রতি কলকাতার সিমা আর্ট গ্যালারিতে তাঁর শিল্পকলা ও কলাকৌশলের এক বিশেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী জাপানি ‘ওয়াশি’ কাগজ সম্পূর্ণ উদ্ভিজ তন্তু দিয়ে তৈরি হয়। ‘ওয়া’ অর্থ জাপান এবং ‘শি’ অর্থ কাগজ। প্রকৃতির রূপ ও রঙের ছোঁয়ায় তৈরি এই কাগজ শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও ছিঁড়ে যায় না বা তাতে হলুদচে ছোপ ধরে না। অবিভক্ত বাংলায় মধ্যযুগীয় পাণ্ডুলিপির জন্য হাতে তৈরি কাগজ ব্যবহারের প্রচলন থাকলেও তার স্থায়িত্ব ছিল কম। সেই ঘাটতি দূর করতেই শান্তিনিকেতনভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী ‘ক্রিয়া আর্ট কালেক্টিভ’-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ শুরু করেছেন শিমুরা। বিশ্বভারতীর প্রাক্তনী তথা জাপানের কিয়োতো ইউনিভার্সিটি অফ আর্ট অ্যান্ড ডিজাইন থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিল্পী কিংশুক সরকার এবং তাঁর স্ত্রী রেশমি বাগচী সরকার এই উদ্যোগের মূল দায়িত্বে রয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে গবেষণার কাজে সহায়তা করছেন জাপানের হিগাশিয়োসাকা কলেজের সহ-অধ্যাপক মিদোরি ইয়ামামোতো।
তবে জাপানে ব্যবহৃত সব উপকরণ পশ্চিমবঙ্গে সুলভ নয়। তাই জাপানি পদ্ধতিকে বাঙালি মেজাজের উপযোগী করে তুলেছেন কিংশুক ও রেশমি। পাট ও বাঁশের তন্তু ছাড়াও আনারসের বর্জ্য, রান্নাঘরের বর্জ্য এবং ওল কিংবা কচুর মতো উদ্ভিজ্জ উপাদান ব্যবহার করে সম্পূর্ণ জৈব উপায়ে কাগজ তৈরি করা হচ্ছে। কৃত্রিম উপাদানের সম্পূর্ণ বর্জন ঘটিয়ে তৈরি হচ্ছে ‘বায়োফিলিক লেদার’, যা স্টিলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব এবং এতটাই শক্ত যে তার উপর সবজিও কাটা যায়। বীরভূমের রাঢ়বাংলার লালমাটির খনিজ এবং প্রাকৃতিক পাথরচূর্ণ পিষে প্রায় ২৭০ থেকে ২৮০ রকমের ভেষজ রং তৈরি করা হচ্ছে, যা কাগজ বা কাপড় রাঙানোর পাশাপাশি প্রসাধনীতেও ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
শান্তিনিকেতনের সঙ্গে জাপানের শতবর্ষের পুরোনো প্রীতির সম্পর্ককে সুদৃঢ় করে কবিগুরুর প্রাঙ্গণে এই আন্তর্জাতিক শিল্পচেতনার মেলবন্ধন ঘটাচ্ছেন আসাও শিমুরা ও বাঙালি শিল্পীরা। কৃত্রিমতার যুগে প্রকৃতির শিকড়ে ফিরে যাওয়ার এই অনন্য প্রচেষ্টায় বাংলার লোকশিল্প ও জাপানি ঐতিহ্য আজ একাকার হয়ে গেছে।

