প্যারিসের ঐতিহ্যবাহী ফিলিপে শঁতিয়ে কোর্টে শনিবার এক অনবদ্য রূপকথার জন্ম দিলেন রাশিয়ার উদীয়মান তারকা মীরা আন্দ্রিভা। ফরাসি ওপেনের ফাইনালে টুর্নামেন্টের অন্যতম চমক পোল্যান্ডের অবাছাই খেলোয়াড় মাজ়া খোয়ালিনস্কাকে স্ট্রেট সেটে হারিয়ে কর্মজীবনের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয় করলেন ১৯ বছর বয়সী এই তরুণী। খেলার ফলাফল আন্দ্রিভার পক্ষে ৬-৩, ৬-২। এই জয়ের সাথে সাথেই রোলঁ গারোজের লাল সুরকির কোর্ট পেল তার নতুন রানিকে।
খেলা শুরুর আগে থেকেই আন্দ্রিভার চোখেমুখে এক দৃঢ় আত্মবিশ্বাস লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। প্রথমবার গ্র্যান্ড স্ল্যামের ফাইনাল খেলার স্নায়ুর চাপকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে নিজের স্বাভাবিক ও আক্রমণাত্মক খেলা বজায় রাখেন অষ্টম বাছাই আন্দ্রিভা। পুরো টুর্নামেন্টে ফাইনালের পথ অতিক্রম করতে তিনি মাত্র একটি সেট খুইয়েছিলেন এবং প্রথম সারির কোনো প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হয়নি তাকে। যদিও ক্যারিয়ারে এর আগে কোনো গ্র্যান্ড স্ল্যামে কোয়ার্টার ফাইনালের গণ্ডি পার করতে পারেননি তিনি, তবে ফাইনালের মঞ্চে সমস্ত সংশয় দূর করে এক নিখুঁত ও লেটার মার্কস পাওয়ার মতো পরিণত পারফরম্যান্স উপহার দিলেন এই রুশ কন্যা।
কৌশলগত পরিবর্তন ও টপস্পিনের জাদু
ম্যাচের শুরু থেকেই আন্দ্রিভা তাঁর প্রতিপক্ষ খোয়ালিনস্কাকে ব্যাক হ্যান্ডে খেলতে বাধ্য করেন। পোল্যান্ডের বাঁহাতি খেলোয়াড় খোয়ালিনস্কা (২৪) কোর্টের কোণ ব্যবহার করার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পেলেও, আন্দ্রিভার নিখুঁত পরিকল্পনার সামনে তাঁর ‘পাওয়ার গেম’ কার্যকর হয়নি। দীর্ঘ র্যালি হলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল রুশ তারকার হাতেই।
প্রথম সেটের তৃতীয় গেমেই খোয়ালিনস্কার সার্ভিস ভেঙে এগিয়ে যান আন্দ্রিভা। তবে পরের গেমেই পাল্টা সার্ভিস ব্রেক করে খেলায় সমতা ফেরান পোলিশ তারকা। ঠিক এই মুহূর্তেই ম্যাচ রিডিংয়ের ওপর ভর করে নিজের রণকৌশল বদলে ফেলেন আন্দ্রিভা। দুপুরের চড়া রোদে লাল সুরকির কোর্টে পাওয়ার টেনিসের পরিবর্তে তিনি দারুণভাবে টপস্পিন ব্যবহার করতে শুরু করেন। এই কৌশলগত পরিবর্তনই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। সপ্তম গেমে খোয়ালিনস্কার পর পর দুটি আনফোর্সড এররের সুযোগ নিয়ে পুনরায় সার্ভিস ব্রেক করেন আন্দ্রিভা এবং শেষ পর্যন্ত প্রথম সেটটি ৬-৩ ব্যবধানে নিজের পকেটে পুরে নেন।
পরিসংখ্যান ও সার্ভিস বিশ্লেষণ
গোটা ম্যাচে সার্ভিসের ক্ষেত্রে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখান আন্দ্রিভা। তিনি তাঁর প্রথম সার্ভিসের ৫৮ শতাংশ এবং দ্বিতীয় সার্ভিসের ক্ষেত্রে আরও উন্নত পারফরম্যান্স করে ৬৭ শতাংশ পয়েন্ট তুলে নেন। অন্যদিকে, দ্বিতীয় সার্ভিস বড় ধরনের সমস্যায় ফেলেছিল খোয়ালিনস্কাকে; তিনি তাঁর দ্বিতীয় সার্ভিসের মাত্র ২০ শতাংশ থেকে পয়েন্ট তুলতে সক্ষম হন। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পুরো ম্যাচে ১২ বার খোয়ালিনস্কার সার্ভিস ভাঙার সুযোগ পান আন্দ্রিভা এবং তার মধ্যে ৭ বারই সফল হন।
দ্বিতীয় সেটে একচ্ছত্র আধিপত্য ও ঐতিহাসিক জয়
প্রথম সেট জিতে আত্মবিশ্বাসে ফুটতে থাকা আন্দ্রিভা দ্বিতীয় সেটের শুরুতেই খোয়ালিনস্কার সার্ভিস ভেঙে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যান। তবে তৃতীয় গেমে এক সময় ০-৪০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েছিলেন তিনি। দেখে মনে হচ্ছিল খোয়ালিনস্কা হয়তো খেলায় ফিরবেন, কিন্তু সেখান থেকে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে পর পর চারটি পয়েন্ট জিতে গেমটি নিজের নামে করেন আন্দ্রিভা।
এই মানসিক ধাক্কা আর সামলে উঠতে পারেননি বিশ্ব র্যাংকিংয়ের ১১৩ নম্বরে থাকা খোয়ালিনস্কা। প্রথমবার গ্র্যান্ড স্ল্যামের ফাইনালে ওঠার চাপ ও একের পর এক ভুলের মাশুল দিয়ে একপর্যায়ে ০-৫ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েন পোলিশ খেলোয়াড়। এরপর টানা দুটি গেম জিতে তিনি ম্যাচে ফেরার সামান্য চেষ্টা করলেও তা ব্যবধান কমানো ছাড়া কোনো কাজে আসেনি। অষ্টম গেমে নিজের সার্ভিস ধরে রেখে সেট ও ম্যাচ জিতে নেন আন্দ্রিভা। জয়ের শেষ বিন্দুটি নিশ্চিত হতেই লাল সুরকির কোর্টে পিঠ ঠেকিয়ে শুয়ে পড়েন নতুন চ্যাম্পিয়ন; যেন নিজের এই অবিস্মরণীয় কীর্তি নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
কৈশোরের সাফল্য ও আগামীর ইঙ্গিত
মাত্র ১৯ বছর বয়সেই বিশ্ব টেনিস মঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা জোরালোভাবে দিলেন মীরা আন্দ্রিভা। তিন বছর আগে যিনি ছিলেন মেয়েদের জুনিয়র বিশ্ব নম্বর ওয়ান, আজ তিনি সিনিয়র পর্যায়ের গ্র্যান্ড স্ল্যাম বিজয়ী। পেশাদার টেনিসে এর আগে প্যারিস অলিম্পিক্সে মহিলাদের ডাবলসে রুপো জয় এবং দুটি ডব্লিউটিএ (WTA) ১০০০ ট্রফি জয়ের কীর্তি থাকলেও, একক প্রতিযোগিতায় গ্র্যান্ড স্ল্যামের ট্রফিতে এবারই প্রথম নিজের নাম খোদাই করলেন তিনি।
ম্যাচ শেষে গ্যালারিতে উপস্থিত পরিবারের সদস্যদের সাথে উল্লাসে মেতে ওঠেন আন্দ্রিভা। অন্যদিকে, রানার্স-আপ খোয়ালিনস্কা ট্রফি না পেলেও ফিলিপে শঁতিয়ে কোর্টের করতালি ও প্রশংসা কুড়িয়েছেন। টুর্নামেন্টের অন্যতম চমক হিসেবে গত দুই সপ্তাহে তিনি যে লড়াকু খেলা দেখিয়েছেন, তা টেনিস বিশ্বে তাঁর এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতেরই ইঙ্গিত দেয়।

