অর্ধশতাব্দীর রেকর্ড ভেঙে রক্তপাতহীন নির্বাচন দেখল পশ্চিমবঙ্গ: ২০২৬-এর সাফল্যের নেপথ্যে তিন কারিগর

অর্ধশতাব্দীর রেকর্ড ভেঙে রক্তপাতহীন নির্বাচন দেখল পশ্চিমবঙ্গ: ২০২৬-এর সাফল্যের নেপথ্যে তিন কারিগর

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে যোগ হলো এক নতুন অধ্যায়। ১৯৭১ এবং ২০১১ সালের পর ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন সাক্ষী থাকল এক নজিরবিহীন ‘অবাধ ও শান্তিপূর্ণ’ আবহের। সাতান্ন বছর আগে ১৯৬৯ সালে যে রাজ্যে ‘রিগিং’ শব্দটি প্রথম ডানা মেলেছিল, সেখানে দীর্ঘ ১৪টি নির্বাচনের পর এবারই প্রথম ঝরল না এক ফোঁটা রক্ত, ঘটল না একটিও প্রাণহানি।

হিংসামুক্ত নির্বাচনের খতিয়ান: নির্বাচন কমিশনের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে প্রচারপর্ব থেকে শুরু করে ভোটগ্রহণ—পুরো প্রক্রিয়াতেই নিহতের সংখ্যা ‘শূন্য’। অথচ ২০২১ সালের নির্বাচনেও ২৪ জন এবং ২০১৬ সালে ৭ জন নির্বাচনী হিংসার বলি হয়েছিলেন। গত নির্বাচনে যেখানে ৬০টিরও বেশি বোমাবাজির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল, সেখানে এবার রাজ্যের কোথাও একটিও বোমা পড়ার খবর মেলেনি। ভীতিমুক্ত পরিবেশের সুফল মিলেছে ভোটবাক্সেও; দুই দফাতেই ভোটদানের হার ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছে।

সাফল্যের নেপথ্যে তিন কারিগর: এই অভাবনীয় পরিবর্তনের কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের তিন শীর্ষ আধিকারিককে—সিইও মনোজ অগ্রবাল, বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত এবং বিশেষ পুলিশ পর্যবেক্ষক এনকে মিশ্র।

১. মনোজ অগ্রবাল (সিইও): ১৯৯০ ব্যাচের এই আইএএস আধিকারিক তাঁর ক্ষুরধার বুদ্ধি ও সোজাসাপ্টা সিদ্ধান্তের জন্য পরিচিত। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের আস্থাভাজন মনোজের নিখুঁত পরিকল্পনাই ছিল এই শান্তির মূল ভিত্তি। ২. সুব্রত গুপ্ত: তিনিও ১৯৯০ ব্যাচের আধিকারিক এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ। এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ায় ভোটারদের তথ্য যাচাইয়ে তাঁর প্রযুক্তিগত জ্ঞান কমিশনকে প্রভূত সাহায্য করেছে। ৩. এনকে মিশ্র (বিশেষ পুলিশ পর্যবেক্ষক): প্রাক্তন আইপিএস মিশ্র দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা দফতরে কাজ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি পুলিশ-প্রশাসনকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া: রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭১ সালের নির্বাচনকে অনেকে অবাধ বললেও সেখানে ৪ জন প্রার্থীর খুনের ঘটনা ঘটেছিল। ১৯৭২ সালের নির্বাচন বামেদের কাছে ‘কালো অধ্যায়’ হিসেবে পরিচিত, যেখানে জ্যোতি বসুর মতো নেতাও পরাজিত হয়েছিলেন ‘রিগিং’-এর অভিযোগে।

তৃণমূল কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা সৌগত রায়ের মতে, “১৯৬৯ সাল থেকেই রাজ্যে রিগিংয়ের সংস্কৃতি শুরু হয়েছিল। তবে ২০১১ সালের পর ২০২৬ সালের নির্বাচনকে অবশ্যই অবাধ ও শান্তিপূর্ণ বলতে হবে।” অন্যদিকে, প্রাক্তন রাজ্যপাল তথাগত রায় মনে করেন, ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের পরাজয় ছিল জরুরি অবস্থার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, কিন্তু সেখানেও স্বতঃস্ফূর্ততার অভাব ছিল।

২০২৬ সালের এই নির্বাচন প্রমাণ করল যে, রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে সংঘাতের পথে না গিয়ে প্রশাসনিক খোলনলচে বদলে এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে একটি অশান্তিপ্রবণ রাজ্যেও শান্তিপূর্ণ গণতন্ত্রের উৎসব পালন সম্ভব। নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত সদিচ্ছাকেই এই ‘শুন্য প্রাণহানি’র মডেলের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছে ওয়াকিবহাল মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.