উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটা এবং মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ান— রাজ্যের দুই প্রান্তে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ঘটে যাওয়া দুটি পুলিশি এনকাউন্টারের ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। দুটি ঘটনাই যেন অবিকল এক সূত্রে গাঁথা। পুলিশের হেফাজত থেকে ধৃত আসামিকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময় নির্জন স্থানে যাওয়া, পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা, ছিনতাই করা অস্ত্র থেকে ঠিক তিন রাউন্ড গুলি চালানো এবং শেষ পর্যন্ত পুলিশের আত্মরক্ষার পাল্টা গুলিতে দুই অভিযুক্তেরই নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
গাইঘাটা ও ধুলিয়ানের ঘটনার মিল
প্রথম ঘটনাটি ঘটে উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায়, যেখানে ১৭ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনে অভিযুক্ত প্রহ্লাদ দাস পুলিশের গুলিতে নিহত হন। দ্বিতীয় ঘটনাটি মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে, যেখানে সামশেরগঞ্জের ব্যবসায়ী তথা বিজেপিকর্মী সুজিত মণ্ডল হত্যা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত সামাউন শেখ পুলিশের গুলিতে মারা যান। এর আগে প্রায় সাড়ে তিন মাস আগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরেও এক নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনে অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের এনকাউন্টারের সঙ্গে এই দুই ঘটনার মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে। তবে আগের বার ধৃত এক রাউন্ড গুলি ছোড়ার সুযোগ পেলেও, গাইঘাটা ও ধুলিয়ানের ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা ঠিক তিন রাউন্ড করে গুলি চালিয়েছিলেন বলে পুলিশ সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
গাইঘাটার ঘটনার বিবরণ
পুলিশের দাবি, মঙ্গলবার ভোররাতে গাইঘাটায় কিশোরী ধর্ষণ ও খুনে অভিযুক্ত প্রহ্লাদকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণ শেষে থানায় ফেরার পথে বৈদ্যবাড়ি এলাকার কাছে প্রস্রাব করার নাম করে গাড়ি থামাতে বলেন অভিযুক্ত। এর পরেই তিনি এক পুলিশকর্মীর বন্দুক কেড়ে নিয়ে পর পর তিন রাউন্ড গুলি চালান, যার একটি পুলিশের গাড়িতে লাগে। আকস্মিক এই হামলায় এক পুলিশকর্মী জখম হন এবং অপর এক জন জলাশয়ে ঝাঁপ দেন। এরপর আত্মরক্ষার্থে পুলিশ চার রাউন্ড পাল্টা গুলি চালালে প্রহ্লাদের বাঁ পায়ে ও বুকে আঘাত লাগে। চাঁদপাড়া গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। গত রবিবার এক কিশোরীর বিবস্ত্র ও ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধারের ঘটনায় প্রহ্লাদকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ।
ধুলিয়ানের গুলি-‘রহস্য’
অন্যদিকে, ধুলিয়ানের সামশেরগঞ্জের পুরাতন ডাকবাংলা এলাকায় ব্যবসায়ী সুজিত মণ্ডল খুন হওয়ার ঘটনায় ধৃত সামাউন শেখকে মঙ্গলবার দুপুরে পুনর্নির্মাণের জন্য অকুস্থলে নিয়ে গিয়েছিল সিআইডি ও পুলিশ। পুলিশের দাবি, সেই সময় এক পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন এবং তিন রাউন্ড গুলি চালান সামাউন। পুলিশের পাল্টা গুলিতে জখম ওই যুবককে জঙ্গিপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে জানান। গত অগস্টে সুজিত মণ্ডলকে নৃশংসভাবে খুনের অভিযোগে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, যার মধ্যে সামাউন এই এনকাউন্টার নিহত হলেন।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক
এই জোড়া এনকাউন্টারকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। রাজ্যের শীর্ষ নেতৃত্বের মতে, অপরাধ দমনে পুলিশকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা ফেরাতে এই কঠোর পদক্ষেপ জরুরি। মন্ত্রীদের একাংশের বক্তব্য, সাধারণ মানুষের মনে ভরসা ফেরাতে পুলিশকে কিছু ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ করতে হয়। অন্যদিকে, এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও তথাকথিত ‘এনকাউন্টার’ সংস্কৃতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে বিরোধী দলগুলি। কংগ্রেস ও সিপিএমের পক্ষ থেকে এর নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করার পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর-ও এই ধরনের গভীর রাতের পুনর্নির্মাণ ও মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

