“আমি বিধায়ক হলেও অনেক জায়গায় নিজের পরিচয় দিতে পারি না, কারণ আমি এক নির্যাতিতার মা। তবে আমার প্রত্যাশা, পৃথিবী যতদিন থাকবে, আমার মেয়েকে কেউ ‘নির্যাতিতা’ হিসেবে নয়, একজন চিকিৎসক হিসেবেই মনে রাখবে।” আরজি কর কাণ্ডে প্রাণ হারানো চিকিৎসক-ছাত্রীর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে এভাবেই আবেগঘন আর্জি জানালেন পানিহাটির বিজেপি বিধায়ক তথা মৃতার মা রত্না দেবনাথ।
রবিবার উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটির লোকসংস্কৃতি ভবনে আয়োজিত ওই স্মরণসভায় উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নিহত চিকিৎসকের পরিবারের উদ্দেশ্যে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ঘটনার “শেষ দেখে ছাড়বে” রাজ্য সরকার। পাশাপাশি আরজি কর-কাণ্ডে সিবিআই ও আদালতের চলমান প্রক্রিয়া ছাড়াও ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেটকে একটি পৃথক ও নতুন মামলা রুজু করে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দেন তিনি।
“বড় ষড়যন্ত্রের বলি মেয়ে”, আক্ষেপ কন্যাহারা মায়ের স্মরণসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বিধায়ক রত্না দেবনাথ। ছোটবেলার স্মৃতি ও মেয়ের সাজানো বাগানের কথা বলতে গিয়ে চোখে জল এসে যায় তাঁর। তিনি বলেন, “আমি একটা ডায়মন্ড পেয়েছিলাম, কিন্তু হারিয়ে ফেলেছি। ২ বছর আগে কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে কেবল ধর্ষণের ঘটনাই ঘটেনি, এর নেপথ্যে বড় ষড়যন্ত্র ছিল। মেয়ে হয়তো কোনো গোপন তথ্য জেনে ফেলেছিল, তাই তাকে খুন করা হয়।”
ভবিষ্যতের জন্য বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, “আমি চাই না ভবিষ্যতে কোনো মেয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে ‘অভয়া’ বা ‘তিলোত্তমা’ হয়ে উঠুক। আমার মেয়েকে সকলে একজন ডক্টর হিসেবেই স্মরণ রাখুক।”
নতুন মামলার নির্দেশ ও বিতর্কিত ট্রায়াল প্রসঙ্গে স্পর্শকাতর ইঙ্গিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “ঐ ভয়ঙ্কর স্মৃতি চিরকাল আমাদের স্মরণে থাকবে। আমি যা করার করছি এবং করব, এর শেষ দেখে ছাড়ব।”
তদন্তের অগ্রগতি প্রসঙ্গে শুভেন্দু জানান, মামলাটি বিচারাধীন থাকায় তিনি সাংবিধানিক পদে থেকে বিশদ মন্তব্য করবেন না। তবে কর্তব্যে গাফিলতির জন্য পূর্বতন পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ তিন আধিকারিককে ইতিমধ্যে সাসপেন্ড করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি শ্মশানে তাড়াহুড়ো করে দেহ দাহ করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “যে শ্মশানঘাটে দেহ দাহ করা হয়েছিল, সেখানে নির্মল ঘোষ, সোমনাথ দে এবং সঞ্জীব মুখোপাধ্যায় নামে তিন ব্যক্তির ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাছাড়া দাহকার্যের বকেয়া টাকা বা ফি সংক্রান্ত যে প্রশ্নগুলি অনূত্তর রয়ে গিয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারকে বিশেষ কমিটি গঠন করে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও পৃথক মামলা রুজু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
নারী নিরাপত্তায় জিরো টলারেন্স নীতি সাম্প্রতিক বিভিন্ন নারী নির্যাতনের ঘটনাকে সামাজিক ব্যাধি উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, তাঁর সরকার অপরাধ দমনে কোনো পক্ষপাতিত্ব বা স্বজনপ্রীতি বরদাস্ত করবে না।
তিনি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি ভার্চুয়াল মাধ্যমে রাজ্যের সমস্ত থানার ওসি ও আইসি-দের সঙ্গে বৈঠক করে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—মহিলা নির্যাতনের অভিযোগ পেলে কারো নির্দেশের অপেক্ষা না করে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
বারুইপুরের সাম্প্রতিক ঘটনার উদাহরণ টেনে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, “আমি অতীত সরকারের মতো ‘ছোট ঘটনা’ বা ‘প্রেমের গল্প’ বলে দায় এড়ানোয় বিশ্বাসী নই। নারী ও শিশুদের ওপর অত্যাচারের ঘটনায় পুলিশ-প্রশাসনকে কঠোর হাতে আইন প্রয়োগ করার পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।”
স্মরণসভার শেষ লগ্নে কন্যাহারা পিতা-মাতার উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী পুনর্বার আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়ে ঘোষণা করেন, “এই বিচারপ্রক্রিয়ার একটি যুক্তিসঙ্গত উপসংহারে পৌঁছাবই, আপনারা সরকারের ওপর ভরসা রাখুন।”

