নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) গোপন আঁতাতের অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। পাশাপাশি, দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে বিভিন্ন দলের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি দাবি করেছেন, কংগ্রেস এবং অন্যান্য বিরোধী দলের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা দেখা গেলেও বিজেপির বেলায় তা রহস্যজনকভাবে অনুপস্থিত। এর পেছনে কমিশনের সহযোগিতায় ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ তুলেছেন তিনি। রাহুলের এই অভিযোগের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিজেপি।
বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র সুধাংশু ত্রিবেদী পশ্চিমবঙ্গসহ পাঁচ রাজ্যের উদাহরণ টেনে রাহুলের সমস্ত যুক্তি খারিজ করে দিয়েছেন।
কংগ্রেসের আমলেই প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা বেশি শক্তিশালী: সুধাংশু
সুধাংশু ত্রিবেদীর দাবি, ভারতে প্রতিষ্ঠানবিরোধী মানসিকতা মূলত কংগ্রেসের বিরুদ্ধেই সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী। সেই কারণেই পশ্চিমবঙ্গসহ একাধিক রাজ্যে বছরের পর বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে রয়েছে কংগ্রেস। তাঁর মতে, দেশে যখন থেকে নির্বাচন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হয়েছে, সিসি ক্যামেরার ব্যবহার বেড়েছে এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা জোরালো হয়েছে, ঠিক তখন থেকেই বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেসের ভরাডুবি শুরু হয়েছে।
সুধাংশু বলেন, “প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ধারাবাহিক, তবে তা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। যখন থেকে নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হয়েছে, তখন থেকেই কংগ্রেস সরকার গঠন করতে হিমশিম খাচ্ছে।”
যে রাজ্যগুলির কথা উল্লেখ করেছে বিজেপি
পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও তামিলনাড়ু, ওড়িশা, বিহার এবং উত্তরপ্রদেশের প্রসঙ্গ টেনেছেন বিজেপির মুখপাত্র। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী:
- তামিলনাড়ু: ১৯৬৭ সালের পর থেকে কংগ্রেস এই রাজ্যে আর ক্ষমতায় আসতে পারেনি। অথচ সেই সময় ওই রাজ্যে বিজেপির তেমন রাজনৈতিক শক্তিই ছিল না।
- পশ্চিমবঙ্গ: ১৯৭৭ সাল থেকে রাজ্যে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে রয়েছে কংগ্রেস।
- উত্তরপ্রদেশ ও বিহার: উত্তরপ্রদেশে ১৯৮৯ এবং বিহারে ১৯৯০ সাল থেকে ক্ষমতার বাইরে রয়েছে দলটি।
- ওড়িশা: ১৯৯৯ সালের পর থেকে ওড়িশায় কংগ্রেস আর সরকার গড়তে পারেনি।
বিজেপির দাবি, এই সমস্ত রাজ্যে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা এতটাই প্রবল যে, ভোটাররা আর দলটিকে ক্ষমতায় ফেরাতে আগ্রহী নন।
নির্বাচন কমিশনের অন্দরে বিতর্ক ও রাহুলের আক্রমণ
সম্প্রতি একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে অন্তর্কলহের খবর প্রকাশিত হয়। সেখানে দাবি করা হয়, অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার বিবেক জোশী এবং সুখবীর সিংহ সঁধুকে অন্ধকারে রেখে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার একের পর এক একক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গত ১০ মাসে তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন বাকি দুই কমিশনার।
এই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, অপসারণ এবং তাঁকে গ্রেফতারের দাবি তুলেছে বিরোধীরা। অভিযোগ উঠেছে, বিজেপির ইশারায় কাজ করে এসআইআর (SIR)-এর মাধ্যমে বহু মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে রাহুল গান্ধী জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভোট চোর’ ও ‘দেশদ্রোহী’ বলে আক্রমণ করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন বিজেপির বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার আঁচ দেখা যাচ্ছে না? ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ যুদ্ধজয়ের পর ইন্দিরা গান্ধীর জনপ্রিয়তার উদাহরণ দিয়ে রাহুল বলেন, জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা কাজ করেছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে বিজেপির ক্ষেত্রে তা দেখা যাচ্ছে না, যার মূল কারণ হিসেবে তিনি ‘ভোট চুরি’কে দায়ী করেছেন। রাহুলের এই অভিযোগেরই পাল্টা জবাব দিয়েছে পদ্মশিবির।

