অরুণাচল সীমান্তে চিনা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতের পরিস্থিতি, টহলদারির নিয়ম বদলেই উত্তেজনা বৃদ্ধির অভিযোগ ভারতের

অরুণাচল সীমান্তে চিনা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতের পরিস্থিতি, টহলদারির নিয়ম বদলেই উত্তেজনা বৃদ্ধির অভিযোগ ভারতের

অরুণাচল প্রদেশে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) বরাবর চিনা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতের পরিস্থিতির কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের (আইটিবিপি) ডিজি শত্রুজিৎ সিংহ কপূর। শুক্রবার বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জায়সবাল জানিয়েছেন, চিনা বাহিনী টহলদারির নির্ধারিত পদ্ধতি বদলানোর ফলেই অরুণাচল সীমান্তে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। অতীতে ডোকলাম এবং পূর্ব লাদাখেও চিনা বাহিনীর বিরুদ্ধে একই ধরনের কৌশল অবলম্বনের অভিযোগ উঠেছিল। ফলে অরুণাচল সীমান্তের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আইটিবিপি প্রধানের বক্তব্য অনুযায়ী, গত জুলাই মাসে অরুণাচলের আপার সুবনসিরি জেলার তাকসিং এলাকায় ভারতীয় বাহিনীকে নিয়মিত টহলদারি পয়েন্টে যেতে বাধা দিয়েছিল চিনা সেনা। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই উত্তেজনার সূত্রপাত। ‘ইন্ডিয়া টুডে’-র একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাকসিং সার্কেলের অন্তর্গত আসাফিলা এবং লংজুর টহলদারি পয়েন্ট বর্তমানে সবচেয়ে সংবেদনশীল এলাকাগুলির মধ্যে রয়েছে। এখনও পর্যন্ত সেখানে বড় ধরনের সংঘর্ষের খবর না মিললেও ভারত ও চিনের টহলদার বাহিনীর মধ্যে বার বার মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

পূর্ব লাদাখের ঘটনার সঙ্গে মিল

অরুণাচল সীমান্তে চিনা বাহিনীর সাম্প্রতিক আচরণের সঙ্গে ২০২০ সালে পূর্ব লাদাখে সংঘাতের পরিস্থিতির মিল খুঁজে পাচ্ছেন প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষকদের একাংশ। ওই বছরের এপ্রিল মাস থেকে গোগরা, হট স্প্রিং, ডেপসাং, গলওয়ান এবং প্যাংগং হ্রদের তীরবর্তী ফিঙ্গার এলাকায় ভারতীয় সেনার প্রচলিত টহলদারির পথে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি বা পিএলএ-র বিরুদ্ধে।

২০২২ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিরক্ষা গবেষণাপত্রে দাবি করা হয়েছিল, চিনের দীর্ঘমেয়াদি রণকৌশলের অংশ হিসেবেই এই ধরনের পদক্ষেপ করা হয়েছিল। গবেষণাপত্রে এই কৌশলকে ‘সালামি স্লাইসিং’ বলে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ, ধাপে ধাপে ছোট ছোট এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে প্রতিপক্ষের উপস্থিতি সীমিত করার কৌশল।

ওই গবেষণাপত্রের দাবি অনুযায়ী, কারাকোরাম পাস থেকে চুমুর পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় থাকা ৬৫টি টহলদারি পয়েন্টের মধ্যে ২৬টিতে ভারতীয় বাহিনীর টহলদারি সীমিত হয়ে পড়েছিল অথবা বন্ধ ছিল। তবে এই পরিসংখ্যান গবেষণাপত্রে উত্থাপিত দাবি হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে।

গলওয়ান সংঘর্ষের স্মৃতি

গত এক দশকে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর ভারত ও চিনের সেনার মধ্যে একাধিক বার উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। কোথাও হাতাহাতি, কোথাও পাথর ছোড়াছুড়ি, আবার কোথাও লাঠি নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। এর জেরে দু’পক্ষের সেনাকর্মীদের আহত হওয়ার খবর মিলেছে।

২০২০ সালের ১৫ জুন পূর্ব লাদাখের গলওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষ পরিস্থিতির ভয়াবহতা প্রকাশ্যে আসে। অভিযোগ, চিনা সেনা পেরেক বসানো লাঠি এবং ধারালো অস্ত্র নিয়ে ভারতীয় সেনার উপর হামলা চালিয়েছিল। ওই সংঘর্ষে এক কর্নেল-সহ ২০ জন ভারতীয় সেনার মৃত্যু হয়। ভারতীয় সেনার পাল্টা প্রতিরোধে চিনা বাহিনীরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।

অতীতে তিব্বতে বৌদ্ধদের বিক্ষোভ এবং জিনজিয়াংয়ে উইঘুর মুসলিমদের আন্দোলন দমনের সময় চিনা বাহিনীর বিরুদ্ধে পেরেক বসানো লাঠি ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছিল। গলওয়ানের ঘটনা সীমান্তে হাতাহাতির সংঘর্ষ কতটা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছিল।

আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের নিয়ম নিয়ে বিতর্ক

১৯৯৬ এবং ২০০৫ সালের ভারত-চিন সীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার দুই কিলোমিটারের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার না করার বিধিনিষেধ রয়েছে। এই নিয়মের ফলে সীমান্তে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হলেও সেনাদের অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা বজায় রাখতে হয়।

গলওয়ান সংঘর্ষের পর প্রতিরক্ষা মহলের একাংশ প্রশ্ন তুলেছিলেন, আত্মরক্ষার প্রয়োজনে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি আগে থেকে থাকলে প্রাণহানি কমানো সম্ভব হত কি না। একই সঙ্গে, সীমান্তে আকস্মিক সংঘাতের পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রত্যাঘাতের অনুমতি দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা মোকাবিলায় রণকৌশলগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছিলেন কয়েক জন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ। সেই সময় কিছু পরিবর্তন কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলেও জানা যায়।

সীমান্তে পরিকাঠামো নির্মাণে এগিয়ে চিন

অরুণাচল সীমান্তে সাম্প্রতিক উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগের আরও একটি কারণ হল চিনের সামরিক পরিকাঠামো নির্মাণ। আইটিবিপি প্রধান বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, সীমান্ত এলাকায় সামরিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চিন ভারতের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার ওপারে তিব্বত অঞ্চলে চিন দ্রুত সেনাশিবির, সড়ক, সেতু এবং নতুন জনপদ নির্মাণ করছে। আন্তর্জাতিক সামরিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই পরিকাঠামো চিনের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক পরিকল্পনার অংশ।

‘ইন্ডিয়া টুডে’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে তাকসিং সার্কেলের সংবেদনশীল এলাকাগুলিতে উত্তেজনা প্রশমিত করতে একাধিক বার পতাকা বৈঠক, হটলাইন যোগাযোগ এবং সামরিক আধিকারিক স্তরে আলোচনা হয়েছে। তবে তাতে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।

অরুণাচল সীমান্তে টহলদারি নিয়ে বিরোধ, চিনের সামরিক পরিকাঠামো বৃদ্ধি এবং দুই দেশের সেনার বার বার মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা—সব মিলিয়ে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, এমন কোনও তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। সীমান্তে উত্তেজনা প্রশমনে দুই দেশের সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.