বিধানসভায় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বিদ্রোহী’ শিবিরে কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের যোগদানের পর এবার আরও এক বড় ধাক্কা খেল মমতা শিবির। তৃণমূলের অন্দরে একদা মমতার ‘বাঁ কান’ বলে পরিচিত হেভিওয়েট নেতা অরূপ বিশ্বাস এবার দলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ‘ফ্রিজ’ বা লেনদেন বন্ধ করার আর্জি জানিয়ে একটি বেসরকারি ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে নিজেকে তৃণমূলের কোষাধ্যক্ষ দাবি করে তিনি এই পদক্ষেপ করেছেন, যা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর বলে মনে করা হচ্ছে।
সাড়ে চারশো কোটি টাকার তহবিল ও আইনি জটিলতা
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া দলের শেষ অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, তৃণমূলের ওই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রায় ৬৭৫ কোটি টাকা জমা ছিল। বর্তমান দলীয় সূত্রের খবর, অঙ্কটা কিছুটা কমলেও তা কোনোভাবেই সাড়ে চারশো কোটি টাকার নিচে নয়। নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে বিপুল অর্থ পাওয়া দলটির এই বিপুল পরিমাণ তহবিল এখন কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তা নিয়েই শুরু হয়েছে মূল টানাটানি।
মমতাপন্থী বিধায়ক কুণাল ঘোষ দাবি করেছেন যে, গত ৫ জুনের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে সাংগঠনিক রদবদল ঘটিয়ে শুভাশিস চক্রবর্তীকে নতুন কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছে। তবে ব্যাঙ্কের খাতায় সেই পরিবর্তন এখনও কার্যকর হয়নি। নতুন কোষাধ্যক্ষের সই ব্যাঙ্কে নথিভুক্ত না হওয়ায় খাতায়-কলমে এখনও অরূপ বিশ্বাসই দলের কোষাধ্যক্ষ রয়ে গেছেন।
কেন অ্যাকাউন্ট ফ্রিজের আর্জি জানালেন অরূপ?
অতীতে ‘মেসি-কাণ্ডে’র জেরে ক্রীড়ামন্ত্রীর পদ খোয়ালেও মমতার ঘনিষ্ঠ বৃত্তেই ছিলেন অরূপ। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজের পিঠ বাঁচাতেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা। ব্যাঙ্ককে দেওয়া চিঠিতে অরূপ বিশ্বাস তাঁর আশঙ্কার কথা স্পষ্ট করেছেন:
- আগে থেকে সই করা চেকের অপব্যবহার: দলের আপৎকালীন প্রয়োজনের কথা ভেবে অরূপবাবু কিছু চেকে আগাম সই করে পার্টি অফিসে রেখেছিলেন। দলের বর্তমান নেতৃত্ব নিয়ে তৈরি হওয়া দ্বন্দ্বে সেই চেকগুলির অপব্যবহার হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।
- আইনি হেনস্থার ভয়: অতীতে দলের আর্থিক লেনদেনের অনিয়ম নিয়ে তাঁকে হেনস্থার শিকার হতে হয়েছিল। এবারও তহবিল তছরুপ হলে দায় তাঁর ওপর আসতে পারে, এই ভয় থেকেই তিনি লেনদেন বন্ধের আর্জি জানিয়েছেন।
“এখন দলের নেতৃত্ব এবং সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েই যখন প্রশ্ন উঠেছে, তখন আমার আশঙ্কা, যাঁদের নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে এমন ব্যক্তিরা ওই সই করা চেকগুলি ব্যবহার করে টাকা তুলে নিতে পারেন।” — অরূপ বিশ্বাস (ব্যাঙ্ককে দেওয়া চিঠিতে)
মেসি-কাণ্ডের তদন্তে বিধাননগর দক্ষিণ থানায় হাজিরা দিয়ে বেরোনোর সময় অবশ্য এই বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে চাননি অরূপ। তিনি শুধু বলেন, “এখনই কিছু বলব না। পরে বলব।”
তহবিল বাঁচানোর লড়াই ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
তৃণমূলের অন্দরে ভাঙন ধরার পর দলের প্রতীক এবং এই বিপুল তহবিল কার দখলে থাকবে, তা নিয়ে জোর লড়াই শুরু হয়েছে। একদিকে ঋতব্রতপন্থীরা নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করে সংগঠন দখলের চেষ্টা করছেন; অন্যদিকে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কাকলি ঘোষ দস্তিদারেরা ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ নামক দলে যোগ দিলেও তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে মরিয়া।
অভিযোগ উঠেছে, বিদ্রোহীদের হাত থেকে তহবিল বাঁচাতে মমতা শিবির সেই টাকা সমমনস্ক অন্য দলের অ্যাকাউন্টে সরানোর জন্য আইনি পরামর্শ নিচ্ছিল। আর এই খবর পেয়েই বিদ্রোহী শিবির অরূপ বিশ্বাসের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলশ্রুতি এই চিঠি।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া:
- বিদ্রোহী শিবির: ঋতব্রতের ডেপুটি তথা এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহা বলেন, “অরূপ বিশ্বাস হয়তো মনে করেছেন তহবিল নিয়ে কোনো অনিয়ম হতে পারে, তাই তিনি চিঠি দিয়েছেন।”
- বিরোধী শিবির: আইএসএফ (ISF) বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী তীব্র কটাক্ষ করে বলেন, “অরূপ বিশ্বাসের এই চিঠি আসলে বিজেপি-কে মিস্ কল দেওয়া। তিনি এখন মমতা-অভিষেককে টাইট দিয়ে ‘ভালো তৃণমূল’ সাজতে চাইছেন।”

