“দক্ষিণেশ্বর থেকে শিকাগো : শ্রীরামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ” থেকে একটি অনুভব যোগ্য অংশ

Spread the article

আজ যখন বিশেষ বিশেষ ধর্ম, ধর্ম-ভাবনা ও নানা বিষয়ে ধর্মকে সর্বথা দোষারোপের অভস্ত্যতায় আমরা, তখন স্বামী বিবেকানন্দের বিশ্বজনীন ধর্ম সমন্ধে আমাদের বোঝার মতো উদ্বোধন পত্রিকার জানুয়ারী ২০১৯ সংখ্যায় স্বামী বলভদ্রানন্দজী মহারাজের একটি লেখা “দক্ষিণেশ্বর থেকে শিকাগো : শ্রীরামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ” থেকে একটি অনুভব যোগ্য অংশ :

ধর্মমহাসভার শেষ দিনের ভাষণেও স্বামীজী বাগ্মিতার শিখরে পৌঁছে গিয়ে সেই সর্বধর্মগ্রহীষ্ণুতা ও সর্বধর্মসমন্বয়ের কথাই বললেন এবং সেইসঙ্গে বিশ্বজনীন ধর্মে পৌঁছানোর পথ নির্দেশ দিলেন।

বললেন : “আমি কি চাই খ্রিস্টান হিন্দু বা বৌদ্ধ হয়ে যাক? ভগবান না করুন।”

“আমি কি চাই হিন্দু বা বৌদ্ধরা খ্রিস্টান হয়ে যাক? ভগবান না করুন।”

তারপরে বললেন: “খ্রিস্টানকে হিন্দু বা বৌদ্ধ হতে হবে না; কিংবা হিন্দু বা বৌদ্ধকে খ্রিস্টান হতে হবে না ; কিন্তু প্রত্যেক ধর্মই অন্য ধর্মের ভাব গুলিকে আত্মস্থ করবে এবং নিজের নিজের বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে নিজস্ব প্রকৃতি অনুযায়ী অগ্রসর হবে।”

এই কথাগুলির মধ্যেই স্বামীজী বিশ্বজনীন ধর্মের আদর্শে পৌছানোর পথনির্দেশ দিলেন।

স্বামীজী বিশ্বজনীন ধর্ম বলতে এটা বোঝাননি যে, একটিমাত্র ধর্মকে বিশ্বজুড়ে সকলে অনুসরণ করবে।

যারা এরকম আশা প্রকাশ করেন বা এই উদ্দেশ্যে সময় ও শ্রম ব্যয় করেন, স্বামীজী তাঁর শেষ দিনের ভাষণে তাদের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শন করেছেন; কারণ তাদের এই স্বপ্ন কখনই বাস্তবায়িত হবে না।

আসলে স্বামীজীর ‘বিশ্বজনীন ধর্ম’ কোন নতুন ধর্ম নয়—এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।

খ্রিস্টান খ্রিস্টধর্ম ছাড়বে না; বরং সে আরও ভাল খ্রিস্টান হয়ে উঠুক; শুধু এই মুক্ত শ্রদ্ধার দৃষ্টিটি তাঁকে আনতে হবে যে, অন্য ধর্মও সত্য এবং অন্য ধর্মে যদি গ্রহণযোগ্য কিছু পাই, আমি সেটি খোলা মনে গ্রহণ করতে প্রস্তুত আমার ধর্মে দৃঢ় থেকেই।

স্বামীজী পরবর্তিকালে একটি বক্তৃতাতে বলেছেন (‘The Way to the realisation of a Universal Religion’, C.W., Vol.II, pp. 359–374)— পৃথিবীর প্রধান প্রধান ধর্মগুলির প্রতিটিই বেশ পুরানো।

যদি ঈশ্বরের এরকম ইচ্ছা হতো যে, একটি ধর্মই শুধু পৃথিবীর সব মানুষের জন্য থাকবে, তাহলে এতদিনে সেটি ছাড়া বাকি সবকটি ধর্ম বিলীন হয়ে যেত। তা যে হয়নি, সেটিই প্রমাণ করে—এটি ঈশ্বরের ইচ্ছা নয়। তাছাড়া প্রয়োজন ছাড়া পৃথিবীতে কিছু বাঁচে না; কাজেই ধর্মগুলি যে এতদিন পৃথিবীতে রয়েছে—এটিই প্রমাণ যে, প্রতিটি ধর্মই পৃথিবীর মানুষের জন্য প্রয়োজনীয়।

স্বামীজীর মতে, প্রতিটি ধর্মই বিশ্বজনীন ধর্ম।

যে-মুহূর্তে কোন ধর্ম বিশ্বাসী মানুষ অন্য ধর্মকেও সত্য বলে বুঝতে শেখে, সেই মুহূর্তেই তার কাছে সেই ধর্মটি বিশ্বজনীন ধর্ম হয়ে যায়।

ধর্মজগতের মানুষদের শুধু দেখার এই বিশেষ চোখটি আয়ত্ত করতে হবে।

স্বামীজী এক জায়গায় বলেছেন : “… it is good to be born in a Church, but it is bad to die there.”

অর্থাৎ একটি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের মধ্যে জন্মগ্রহণ করা ভাল, কিন্তু সেই ধর্মের মধ্যেই সীমিত থেকে গেলাম চিরকাল, অন্য ধর্মের প্রতি আমার বিরূপ-বিমুখ-বৈরী মনোভাব থেকেই গেল— এটা ভাল নয়।

হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান যে-ধর্মানুসারী হয়েই যাত্রা শুরু করি না কেন, পরিশেষে বিশ্বজনীন ধর্মের খোলা প্রান্তরে উপস্থিত হয়েই আমাদের প্রত্যেকের ধর্ম জীবনকে সার্থক করতে হবে—এটিই স্বামীজী ধর্মমহাসভায় বলেছেন, বিশেষ করে বলেছেন তাঁর ‘হিন্দুধর্ম’ বক্তৃতায় এবং শেষ দিনের ভাষণটিতে।

স্বামী বলভদ্রানন্দ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *