কীর্তিযস্য সঃ জীবতী

“কীর্তিযস্য সঃ জীবতী” – যিনি কীর্তিমান তিনি চিরঞ্জীবী । ভারতবর্ষের ইতিহাসে অনেক কীর্তিমান পুরুষ ও নারী আছেন, এদের মধ্যে স্বতন্ত্র ভাবে যাঁকে চিহ্নিত করা যায় , তিনি ভারতকেশরী ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় । তার অন্যতম প্রধান কারণ , ভারতবর্ষের এক রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে তাঁর আবির্ভাব ও দেশহিতে তাঁর সার্থক ভূমিকা গ্রহণ।


১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট দেশ স্বাধীন হবার পর তৎকালীন কংগ্রেসী নেতা ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু গঠন করলেন অন্তর্বতী জাতীয় মন্ত্রীসভা। এই মন্ত্রীসভায় তিনি কয়েকজন বিরোধী দলনেতাকে মন্ত্রীত্ব গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানান। তাঁদের মধ্যে শ্যামাপ্রসাদ অন্যতম। এই বিষয়ে তিনি বিশেষভাবে মহাত্মা গান্ধীর পরামর্শ নিয়েছিলেন। পন্ডিত নেহেরু এই সভায় শ্যামাপ্রসাদকে শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রকের দায়িত্ব অর্পন করেন।


বিগত কয়েক শত বৎসরের লাগাতার ব্রিটিশ শাসনের কারণে ভারতবর্ষ তখন জরাজীর্ণ। ভারতীয় শিল্প ব্যবস্থা বা পরিকাঠামো ছিল অতি দুর্বল। ভারতের শিল্প বলতে তখন হাতেগোনা কটি শিল্পদ্যোগ – মহারাষ্ট্রের কিছু বস্ত্র শিল্প, জামশেদপুর ও বানপুর এর টাটা স্টিল ও ইন্ডিয়ান অয়েল ও বাংলার পাট শিল্প। তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিল্প দপ্তরটি বস্তুতপক্ষে ছিল গুরুত্বহীন। শ্যামাপ্রসাদ শিল্প ও সরবরাহ দপ্তরের দায়িত্ব পেয়ে প্রথমে নজর দিলে পরিকাঠামো নির্মাণের দিকে। কারণ তার বিশ্বাস ছিল – প্রথমে একটা পরিকাঠামো যদি তৈরি করে নেওয়া যায়, তাহলে সেটিকে ভিত্তি করে শিল্প উন্নয়ন সম্ভব। তাই পরিকাঠামো তৈরীর সময় তিনি প্রথম গুরুত্ব দিয়েছিলেন পরিবহন ব্যবস্থার দিকে। সেই সময় সারা ভারতে রেল লাইন এর দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র ৫৪০০০০ কিমি। ভারতের ট্রেন চলত স্টিম ইঞ্জিন এর সাহায্যে। স্টিম ইঞ্জিন গুলিও বিদেশের তৈরি। মূলত কানাডা, ইংল্যান্ড , আমেরিকা থেকে তখন সিমেন্ট আমদানি করা হতো। এমনকি, এইসব রেল ইঞ্জিন এর রক্ষণাবেক্ষণ মেরামতি করতো ঐ সব বিদেশি কোম্পানি। এসব ক্ষেত্রে বিদেশনির্ভরতা কমাতে অথবা নির্ভর না করতে , ভারতে স্টিম লিকোমট নির্মাণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। সেই পরিকল্পনা রূপায়ণে তিনি ছিলেন অত্যন্ত তৎপর।


স্টিম লোকোমোটিভ স্থাপনে উদ্যোগী শ্যামাপ্রসাদ পূর্ব রেলের মিহিজাম অঞ্চলটি নির্বাচন করেন। কিন্তু মিহিজাম তখন ছিল বিহার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। অথচ শ্যামাপ্রসাদ চান কারখানা পশ্চিমবাংলায় স্থাপন করতে। তাই কারখানার প্রয়োজনীয় জায়গা তিনি তদানীন্তন বিহার সরকারের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে পশ্চিমবাংলার অন্তর্ভুক্ত করেন। ১৯৪৮ সালে জানুয়ারি মাসে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের পত্নী বাসন্তী দেবীকে এনে তিনি স্টিম লোকোমোটিভ কারখানার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন।
১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতবর্ষের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। কারণ এই দিনে ভারতের পবিত্র সংবিধান রচিত হয়ে শাসনতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। শ্যামাপ্রসাদ অভূতপূর্ব তৎপরতায় এই দিন চিত্তরঞ্জনের লোকমোটিভ কারখানা কারখানা থেকে প্রথম ইঞ্জিন তৈরি হয় জাতির সেবায় উৎসর্গ করা হয়। বলাবাহুল্য ভারতীয় রেলে সেদিন সংযোজিত হয় একটি নতুন সম্পদ। এরপর থেকে ধীরে ধীরে ভারতীয় রেলটিম লোকোমোটিভের ইঞ্জিন তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে স্বনির্ভর হয়ে ওঠে।


শ্যামাপ্রসাদের সেই স্বপ্নের প্রকল্প এখন শুধু ভারতে নয়, বিদেশে ইঞ্জিন তৈরির ক্ষেত্রে পারদর্শী তো দেখাচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, শ্যামাপ্রসাদ যে প্রকল্পের প্রাণপুরুষ সেখানেই , সেই শহরে বা কারখানায় কোথাও শ্যামাপ্রসাদের কৃতিত্বের স্মরণে ফলক বা স্মারক বা নামকরণ করা হয়নি। এই বৃস্মৃতি উদ্দেশ্য মূলক ও দুর্ভাগ্যজনক বলেই মনে হয়।
শুধু চিত্তরঞ্জন নয়, চিত্তরঞ্জন এর কাছে দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন এর মাইথন বাঁধ প্রকল্প শ্যামাপ্রসাদের পরিকল্পিত ও রূপায়িত। শ্যামাপ্রসাদ চিত্তরঞ্জন ও মাইথন এসেছিলেন একাধিকবার। কিন্তু কোনো অজানা কারণে কোথাও আজ শ্যামাপ্রসাদ এর নামে চিহ্নমাত্র নেই। এটা ঐতিহাসিক না জাতীয় ভুল , তা ঠিক করবে কে?

সিন্ধ্রি সার কারখানা সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। এর পাশাপাশি খড়গপুরে ভারতের প্রথম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি স্থাপনা, কলকাতার প্রথম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সোশাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্টের মত গুরুত্বপূর্ণ ভাবনাগুলোও ছিল তার মস্তিষ্কপ্রসূত।

অনাথবন্ধু চট্টোপাধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.