আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের গতিপথ একটি নির্দিষ্ট দিকে ঘুরে গিয়েছে — এই বিষয়ে সমালোচক, সমর্থকদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। আজ আমরা সারা দেশেই ‘হিন্দুত্ব’ , ‘হিন্দু’ এই শব্দগুলো বেশি করে শুনতে পাচ্ছি, আলোচনা হচ্ছে শব্দগুলোর মর্মার্থ নিয়ে। শুধু আলোচনাই নয় রাষ্ট্র জীবনের আচরণগত পরিবর্তন হয়েছে। এই পরিবর্তন সুখকর কি না, এই পরিবর্তন ইতিবাচক কি না তার উত্তর পাওয়া যায় অন্য দেশের, ভারতের প্রতি আচরণের বিশ্লেষণ করলে। বিশ্বমঞ্চে আজ , ভারতের ভূমিকা দৃঢ়তর হয়েছে ; পৃথিবীর যে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিবাদ হোক বা দুই দেশের মধ্যের বিবাদ ভারত কথা বলার মতো জায়গায় এসেছে।
তাই ভারতের রাষ্ট্রজীবনের আচরণগত পরিবর্তন ভারতবাসীর কাছে যে গর্বের এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।
ঋষি অরবিন্দ বলেছিলেন —
“অধ্যাত্মের সত্য নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করা এবং তাহার সহায়ে জীবনকে সঞ্জীবিত , পুনর্গঠিত করা— ইহাই হইতেছে ভারতের প্রকৃতির সনাতন বৃত্তি।যখনই আসিয়াছে স্বাস্থ্যের , সামর্থ্যের , মহত্ত্বের যুগ , তখনই ভারত যে এই বৃত্তিটির কাছে ফিরিয়া যাইবে , তাহা অনিবার্য্য।” স্বামী বিবেকানন্দ আরো স্পষ্টভাবে বলেছিলেন — “অন্যান্য জাতির পক্ষে ধর্ম—সংসারের অন্যান্য কাজের মত একটা কাজ মাত্র। রাজনীতি-চর্চা আছে, সামাজিকতা আছে, ধন ও প্রভুত্বের দ্বারা যাহা পাওয়া যায় তাহা আছে, ইন্দ্রিয়নিচয় যাহাতে আনন্দ অনুভব করে, তাহার চেষ্টা আছে। এই-সব নানা কার্যের ভিতর এবং ভোগে নিস্তেজ ইন্দ্রিয়গ্রাম কিসে একটু উত্তেজিত হইবে—সেই চেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে একটু-আধটু ধর্মকর্মও অনুষ্ঠিত হয়। এখানে—এই ভারতের কিন্তু মানুষের সমগ্র চেষ্টা ধর্মের জন্য; ধর্মলাভই তাহার জীবনের একমাত্র কার্য।” (ভারতে বিবেকানন্দ , স্বামী বিবেকানন্দ রচনাবলী ৫ম খন্ড)
অর্থাৎ ভারত রাষ্ট্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ কেনো? পৃথিবীর জন্য ভারত আর ভারতীয় দর্শন তথা সংস্কৃতির বেঁচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ কেনো এর উত্তর আমরা সুভাষচন্দ্র বসু, বিপিনচন্দ্র পাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কথায় পাই।
বৃহত্তর লক্ষ্য সাধনের জন্য প্রস্তুত হতে গেলে ভারতকে বিদেশি জাতির পরাধীনতা থেকে মুক্ত হতে হবে। কিন্তু যে জাতি ষড়রিপু কেও একরকমের পরাধীনতা হিসেবে দেখেছে, সে জাতি কেমন করে তার জীবনের সর্বক্ষেত্রে অন্য জাতির পরাধীনতা স্বীকার করবে? ইসলামীয় আক্রমণের আগে থেকেই ভারত এই পরাধীনতার বিরুদ্ধে লড়েছে। গ্ৰীক আক্রমণের মুখে চাণক্য রাষ্ট্রভক্তির জাগরণ করেছিলেন, মোঘল আমলে সমর্থ রামদাস ভক্তির মাধ্যমে সমাজের বিশ্বাস জাগিয়েছিলেন, তার আগে হরিহর-বুক্বাকে আমরা পেলাম স্বামী বিদ্যারণ্যের ব্রহ্মতেজের ফল হিসেবে।
অর্থাৎ, বারবার বিদেশীয় শক্তি ভারতের রাষ্ট্রজীবন কে পরিবর্তন কে চেষ্টা করলে, ভারত-রাষ্ট্রের জীবনীশক্তির প্রাণপাখি ‘ধর্ম’ যা সমাজজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত তার থেকেই শক্তি সঞ্চয় করেছে ‘ভারত’।
ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকীরা দেশের জন্য প্রাণ দেওয়ার প্রেরণা পেলেন কোথা থেকে ? ইংরেজদের স্কুল ত্যাগ করে জাতীয় বিদ্যালয়ের উদ্যোক্তাদের ভারতীয় শিক্ষা দর্শন সম্পর্কে উপলব্ধি কি ছিল ? পরাধীন ভারতবর্ষে যারা বিশ্ববরেণ্য সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক হয়েছেন তাদের এই রাষ্ট্র সম্পর্কে ধারণা কি ছিল? ভারতবর্ষের হাজার হাজার বছরের জ্ঞান কি তাদের কাছে মূল্যহীন হয়ে গিয়েছিল?
শ্রীকৃষ্ণের মুখে উচ্চারিত গীতার বাণী যেমন করে অর্জুন কে ধর্মযুদ্ধে প্রবৃত্ত করেছিল ঠিক তেমন করেই বিপ্লবী অরবিন্দের শিষ্যরা স্বদেশী আন্দোলনের যুগে স্বাধীনতার অগ্নিপথ কে বেছে নিয়েছিলেন। রাষ্ট্রীয় শিক্ষা নিয়ে যারা উদ্যোগী হয়েছিলেন তারাও হিন্দু জীবন দর্শনকেই শিক্ষার আঙিনায় আনতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ লক্ষ্য হিন্দু জীবন পদ্ধতির প্রতিষ্ঠা আর লক্ষ্য অর্জনের পথ ও পাথেয় ছিল হিন্দুর ‘জীবন’ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি যা রামায়ণ – মহাভারত – গীতা , বিভিন্ন নীতিশাস্ত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত।
কিন্তু সমস্যা হলো যখন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের একাংশ ধীরে ধীরে সেই পথ থেকে সরতে শুরু করলো। আর তার ফলেই ‘খিলাফত’ আন্দোলন কে সমর্থন করা হলো , ‘মোপলা’ মুসলমানদের দ্বারা হিন্দু গণহত্যা কে ছোট করে দেখানো হলো আর দেশভাগের প্রথম ধাপ হিসেবে স্বাধীনতার বীজমন্ত্র ‘বন্দেমাতরম্’ এর অঙ্গচ্ছেদ হলো। কারণ ? কারণ ভারত রাষ্ট্রের মজ্জাগত যা সেই দেশমাতৃকার বন্দনাকেই বিরোধ করা হলো। মূর্তিপূজার বিরোধীদের তোষণ করতে ‘বন্দেমাতরম্’ এর বিরোধিতাকে মেনে নেওয়া হলো।
যে রাষ্ট্রভক্তি, রাষ্ট্র জাগরণের পথ দেখিয়েছে তাঁর মূলেই কুঠারাঘাত করা হলো। দেশভাগ হলো , নারীর সম্মান লুঠ হলো , কত শিশু অনাথ হলো।
সেই সব পেরিয়ে আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে একদিকে বিশ্বমঞ্চে যখন ভারতের নবজন্ম হচ্ছে, তখন ভারতের ভেতরে রাষ্ট্রবন্দনা তার স্বাধীকার প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে।
জাতি হিসেবে আমরা এই কন্টকময় পথ পার করার শক্তি পেলাম কোথা থেকে? উত্তর সেই একই —- হিন্দু জীবন দর্শনকে সামনে রেখে নিজের কর্মপদ্ধতিতেও সেই দর্শনের সফল প্রয়োগের মাধ্যমে।
আর যে সংগঠন এই কাজটি করেছে আজ তাঁর বয়স ১০০ বছর পেরিয়েছে। ঋষিবাক্য আবার এই কালে সত্যি হলো।
ডঃ হেডগেওয়ার ছাত্রজীবনে অনুশীলন সমিতির মতো বিপ্লবী সংগঠনের সাথে কাজ করেছেন, পরবর্তীকালে জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন — সমস্ত পন্থায় সক্রিয় অংশগ্রহণ ডঃ হেডগেওয়ার কে সেইসব পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা দেখতে সহায়ক হয়েছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে গদর পার্টির সহযোগিতায় যে সশস্ত্র বিপ্লবের চেষ্টা চালানো হয়েছিল তা ব্যর্থ হয় গদর পার্টির কৃপাল সিং এর বিশ্বাসঘাতকতায়। নাসিক ষড়যন্ত্র মামলায় লন্ডনের ইন্ডিয়া হাউসে নিযুক্ত চতুর্ভুজ আমিনের সাক্ষ্যে সাভারকারের সাজা হয়।
জার্মান সহযোগিতায় সশস্ত্র অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয় সাংগঠনিক দুর্বলতার অভাবে। কখনো যোগ্য নেতৃত্ব, কখনো ভারতের মতো বিস্তৃত ভূখন্ডে সাংগঠনিক সমন্বয়ের অভাবে বিপ্লবী প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ডঃ হেডগেওয়ার এই ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন। শুধু বিপ্লবী আন্দোলন ব্যর্থ হওয়া নয় , প্রশ্ন ছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিদেশীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে দেশগঠন কিভাবে সম্ভব? কিভাবে হাজার বছর ধরে ভারতের উপর এই আক্রমণের প্রবাহ কে রুখে দেওয়া যায় অর্থাৎ বারবার বিদেশি শক্তির মোকাবিলায় প্রাণহানি নয় , চায় স্থায়ী সমাধান।
রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রতিষ্ঠাতা কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার বুঝেছিলেন কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী সভ্যতার পীঠস্থান ভারতবর্ষের দীর্ঘ পরাধীনতার কারণ বৈদেশিক , বর্বর শক্তির পরাক্রম নয়। পরাধীনতার মূল কারণ হলো ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য ‘ভারতীয় সমাজের মধ্যকার বিচ্ছিন্নতা‘ , ‘দেশের জন্য আত্মত্যাগ না করা‘। কিন্তু হিন্দু জীবন পদ্ধতির সমস্ত ব্যবস্থা তাকে ব্যক্তিসত্ত্বার গন্ডী থেকে বের তাকে তার বৃহত্তর সত্ত্বাকে উপলব্ধি করানোর জন্য।
ডাক্তারজী বুঝেছিলেন যেন-তেন প্রকারেণ শুধুমাত্র স্বাধীনতা পেলেই হবে না, তাকে টিকিয়ে রাখতে ও ভারতবর্ষকে বৈভবশালী করতে রাষ্ট্রের হিতকারী কাজে সর্বস্ব দেওয়ার মতো নাগরিক সমাজ প্রয়োজন।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘পথ ও পাথেয়‘(রাজাপ্রজা) প্রবন্ধে লিখেছেন…….
“অনেককেই আহ্বান করিলাম, অনেককেই সমবেত করিলাম, জনতার বিস্তার দেখিয়া আনন্দিত হইলাম, কিন্তু এমন করিয়া কোনো কাজের ক্ষেত্র প্রস্তুত করিলাম না যাহাতে উদ্বোধিত শক্তিকে সকলে সার্থক করিতে পারে। কেবল উৎসাহই দিতে লাগিলাম, কাজ দিলাম না। মানুষের মনের পক্ষে এমন অস্বাস্থ্যকর ব্যাপার আর কিছুই নাই। মনে করিলাম উৎসাহে মানুষকে নির্ভীক করে এবং নির্ভীক হইলে মানুষ কর্মের বাধাবিপত্তিকে লঙ্ঘন করিতে কুণ্ঠিত হয় না। কিন্তু এইরূপ লঙ্ঘন করিবার উত্তেজনাই তো কর্মসাধনের সর্বপ্রধান অঙ্গ নহে– স্থিরবুদ্ধি লইয়া বিচারের শক্তি, সংযত হইয়া গড়িয়া তুলিবার শক্তি যে তাহার চেয়ে বড়ো। এইজন্যই মাতাল হইয়া মানুষ খুন করিতে পারে, কিন্তু মাতাল হইয়া কেহ যুদ্ধ করিতে পারে না। যুদ্ধের মধ্যে কিছু পরিমাণ মত্ততা নাই তাহা নহে; কিন্তু অপ্রমত্ততাই প্রভু হইয়া তাহাকে চালিত করে। * সেই স্থিরবুদ্ধি দূরদর্শী কর্মোৎসাহী প্রভুকে * বর্তমান উত্তেজনার দিনে দেশ খুঁজিয়াছে, আহ্বান করিয়াছে; ভাগ্যহীন দেশের দৈন্যবশত তাঁহার তো সাড়া পাওয়া যায় না।”
ডাক্তারজী যেন রবীন্দ্র-ভাবনার সেই ‘স্থিরবুদ্ধি দূরদর্শী প্রভু’র মূর্ত রূপ যার ‘সাড়া’ স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতবর্ষের সমস্যা সমাধানেও অগ্ৰণী ভূমিকা পালন করে চলেছে।
১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে, চৌরিচৌরার উত্তেজিত জনতার হিংস্রতা ,অসহযোগ আন্দোলনের সমাপ্তি টেনে আনে।সমাজ কে সুসংগঠিত না করে কোনো জন আন্দোলন যে সাফল্য লাভ করতে পারে না তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘পথ ও পাথেয়’ প্রবন্ধে বুঝিয়েছেন এই ভাবে…….
“ক্রোধের আবেগ তপস্যাকে বিশ্বাসই করে না। তাহাকে নিশ্চেষ্টতা বলিয়া মনে করে, তাহাকে নিজের আশু উদ্দেশ্যসিদ্ধির প্রধান অন্তরায় বলিয়া ঘৃণা করে; উৎপাতের দ্বারা সেই তপঃসাধনাকে চঞ্চল সুতরাং নিষ্ফল করিবার জন্য উঠিয়া- পড়িয়া প্রবৃত্ত হয়। ফলকে পাকিতে দেওয়াকেই সে ঔদাসীন্য বলিয়া জ্ঞান করে, টান দিয়া ফলকে ছিঁড়িয়া লওয়াকেই সে একমাত্র পৌরুষ বলিয়া জানে; সে মনে করে, যে মালী প্রতিদিন গাছের তলায় জল সেচন করিতেছে গাছের ডালে উঠিবার সাহস নাই বলিয়াই তাহার এই দীনতা। এ অবস্থায় মালীর উপর তাহার রাগ হয়, জল দেওয়াকে সে ছোটো কাজ মনে করে। উত্তেজিত অবস্থায় মানুষ উত্তেজনাকেই জগতের মধ্যে সকলের চেয়ে বড়ো সত্য বলিয়া জানে; যেখানে তাহার অভাব দেখে, সেখানে সে কোনো সার্থকতাই দেখিতে পায় না।”
ডাক্তারজী বুঝেছিলেন বিপ্লবীরা অত্যাচারী ইংরেজ আধিকারিক, পুলিশ কে হত্যা করার সাথে সাথে সমান্তরালভাবে আর একধরনের হত্যালীলা চলেছে —- বিপ্লবী দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা সতীর্থদের হত্যা।
রবি ঠাকুর মনে করিয়েছেন —
“কিন্তু স্ফুলিঙ্গের সঙ্গে শিখার যে প্রভেদ উত্তেজনার সঙ্গে শক্তির সেই প্রভেদ। চকমকি ঠুকিয়া যে স্ফুলিঙ্গ বাহির হইতে থাকে তাহাতে ঘরের অন্ধকার দূর হয় না। তাহার আয়োজন স্বল্প, তেমনি তাহার প্রয়োজনও সামান্য। প্রদীপের আয়োজন অনেক; তাহার আধার গড়িতে হয়, সলিতা পাকাইতে হয়, তাহার তেল জোগাইতে হয়। যখন যথাযথ মূল্য দিয়া সমস্ত কেনা হইয়াছে এবং পরিশ্রম করিয়া সমস্ত প্রস্তুত হইয়াছে তখনই প্রয়োজন হইলে স্ফুলিঙ্গ প্রদীপের মুখে আপনাকে স্থায়ী শিখায় পরিণত করিয়া ঘরকে আলোকিত করিয়া তুলিতে পারে।”
ডাক্তার হেডগেওয়ার যখন সলতে পাকানোর কাজ শুরু করেছেন, ব্যক্তি চরিত্র নির্মাণের জন্য যে কর্মপদ্ধতির আবিষ্কার করেছিলেন তখন তার শক্তি বোঝা যায় নি।
কবিগুরু ঐ একই প্রবন্ধে লিখেছেন…..
“মানুষ বিস্তীর্ণ মঙ্গলকে সৃষ্টি করে তপস্যা দ্বারা। ক্রোধে বা কামে সেই তপস্যা ভঙ্গ করে, এবং তপস্যার ফলকে একমুহূর্তে নষ্ট করিয়া দেয়। নিশ্চয়ই আমাদের দেশও কল্যাণময় চেষ্টা নিভৃতে তপস্যা করিতেছে; দ্রুত ফললাভের লোভ তাহার নাই, সাময়িক আশাভঙ্গের ক্রোধকে সে সংযত করিয়াছে…..”
ডাক্তারজীও বুঝেছিলেন দ্রুত ফললাভের চেষ্টা ভারতবর্ষকে বিপথে চালিত করবে।দ্রুত ক্ষমতালাভের বাসনা ভারতবর্ষের ইতিহাসে দেশভাগের মাধ্যমে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিলো।
ডঃহেডগেওয়ার (Dr. Hedgewar) অসহযোগ আন্দোলনের আবহে নির্জন কারাবাসে, ভারতবর্ষের মঙ্গলসাধনের উদ্দ্যেশ্য নিজের মন কে সেই তপস্যার ‘তপোবন’ প্রস্তুতের জন্যই চিন্তামগ্ন রেখেছিলেন।
স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রত্যক্ষ অনুভব, উপলব্ধি, সেই সঙ্গে পরিস্থিতির গূঢ় বিশ্লেষণ করে ডাক্তারজী বুঝেছিলেন একমাত্র সংঘবদ্ধ সমাজই ভারতবর্ষ কে এক অজেয় পরমবৈভবশালী রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে।
ডাক্তারজী সেই সংঘবদ্ধসমাজ তৈরির উদ্দেশ্যেই ১৯২৫ সালে বিজয়াদশমীর শুভলগ্নে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের শুভ প্রতিষ্ঠা করেন যা বর্তমানে পৃথিবীর সবথেকে বড় সামাজিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে।
ডাক্তারজী সুবক্তা ছিলেন এবং খুব গভীর বিষয় অতি সহজ ভাবে বোঝাতে পারতেন। তিনি বুঝেছিলেন হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ না হওয়ার কারণেই তাদের এই দুর্দশা। আর সভ্যতার মূলে আছে ‘ঐক্য’। কিন্তু পেশি শক্তি বাড়াতে যেরকম অভ্যাসের প্রয়োজন হয় , ঠিক সেই রকমই ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য নিত্য অভ্যাসের প্রয়োজন হয়। সেই অভ্যাস হতেই পারে সামান্য মনে হওয়া শারীরিক কার্যক্রম — কিন্তু তার প্রভাব যে গভীর আজ আর অস্বীকার করার উপায় নেই। মানুষের সত্ত্বা নিজেকে সবসময়ই বড় করে পেতে চায় , ব্যাপ্তি চায় কিন্তু ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে গেলে হাতের পাঁচ আঙুল যেমন নিজেদের গড়ন , উচ্চতা ভুলে গিয়ে শুধুমাত্র উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কাজ করে তেমনি যদি সমাজের প্রতিটি ব্যক্তি তার সামাজিক অবস্থান, প্রভাব , জ্ঞান ইত্যাদির অহঙ্কার মুক্ত হয়ে বৃহত্তর ঐক্যের প্রতিষ্ঠায় নিজের যোগদান করে তাহলে হিন্দু দর্শন নির্দিষ্ট সেই বৃহত্তর ‘আমি’র দিকে তার যাত্রা শুরু হয়। নিজেকে ঈশ্বরীয় সত্ত্বার সঙ্গে এক করে পাওয়াই ‘ব্রহ্মোপলব্ধি’ — আর সেই পথ হতে পারে ভক্তির পথ , জ্ঞানের পথ, যোগসাধনার পথ।
পৃথিবীর সবদেশেই সমাজের অভ্যন্তরীণ বিরোধকে প্রশমিত করে সমাজ কে এক করার চেষ্টা হয়েছে কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই চেষ্টা হয়েছে রক্তক্ষয়ী। জোর করে ঐক্য আনার চেষ্টা হয়েছে যে সমাজের জন্য, সেই সমাজকেই ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে —- এই প্রয়োগ চীন , সোভিয়েত রাশিয়ায় আমরা দেখেছি। কিন্তু মানবমনের প্রকৃতি বুঝে, ব্যক্তিকে সংস্কারিত করে তাকে সমাজের স্বার্থে ব্যক্তিস্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়ার জন্য প্রেরিত করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন ডঃ কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার।
রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ ব্যক্তিকে, রাষ্ট্রের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার যে কার্যপদ্ধতি দিয়েছে তা একটি ‘আধ্যাত্মিক’ পথ অবশ্যই। আপনাকে ভুলে প্রতিদিন একই ধরনের অভ্যাস, নিজের স্বার্থ ভুলতে শেখাই ‘আধ্যাত্মিক’ পথ। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ সেই পথেই যে রাষ্ট্র ঋষিদের জন্ম দিয়েছে, তারাই আজ রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতাত্মার স্বরূপ কে প্রকাশ করছেন। ভারতরত্ন একনাথ রাণাডে গ্ৰামোন্নয়নের পথ দেখিয়েছেন , দীনদয়াল উপাধ্যায় অন্ত্যোদয়ের দিশা দিয়েছেন, দত্তোপন্হ ঠেংরী ভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে উন্নয়নের উপায় বলেছেন। হিন্দু ধর্মে কোনো একটি শক্তিকেন্দ্র খুঁজে পাওয়া যায় না। কোনো একটি মত, একজন অবতার কে ঘিরে হিন্দু ধর্ম গড়ে ওঠে নি। হিন্দু ধর্ম তথা ভারতীয় সভ্যতার বৈশিষ্ট্য বিকেন্দ্রীকরণ আর তাই মতের বিনিময়ের সুযোগ, মূল দর্শন পরিবর্তন না করে যুগানুকূল পরিবর্তনের সুযোগ আছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘আত্মশক্তি’ প্রবন্ধে ইউরোপীয়দের ভারত সম্পর্কে বিভ্রান্তি দূর করতে বলেন —
“এই লোকচিত্তের একতা সব দেশে এক ভাবে সাধিত হয় না। এইজন্য য়ুরোপীয়ের ঐক্য ও হিন্দুর ঐক্য একপ্রকারের নহে, কিন্তু তাই বলিয়া হিন্দুর মধ্যে যে একটা ঐক্য নাই, সে কথা বলা যায় না। সে-ঐক্যকে ন্যাশনাল ঐক্য না বলিতে পার– কারণ নেশন ও ন্যাশনাল কথাটা আমাদের নহে, য়ুরোপীয় ভাবের দ্বারা তাহার অর্থ সীমাবদ্ধ হইয়াছে।” ইউরোপীয় দৃষ্টি দিয়ে ভারত কিভাবে একটা ‘রাষ্ট্র’ সে সম্পর্কে কোনো সম্যক ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়। ভারতের রাষ্ট্র-পরিচয় , হিন্দু ধর্মের বিশেষত্বের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।
ইউরোপীয় দার্শনিকগণ জাতি গঠনের মূল হিসেবে কখনো ভাষাগত ঐক্যের কথা বলেছেন ,কখনো রাজতন্ত্র কে ‘জাতি’ গঠনের আধার বলে ব্যাখ্যা করেছেন।
ভারতবর্ষের ভাষাগত বিভিন্নতা , আচার-অনুষ্ঠান পালনের বিভিন্নতা বরাবরই তাদের আকর্ষণের কেন্দ্র ছিল। কিন্তু তারা ইউরোপীয় ‘জাতি’ গঠনের তত্ত্ব দিয়ে ভারতবর্ষ কে ব্যাখ্যা করেছেন।তারা ইউরোপীয় ‘রিলিজিয়ন’ এর চশমা দিয়ে ভারতবর্ষ কে দেখতে গিয়ে ভারতবর্ষের ভাষা-পোশাক-আচার এর বিভিন্নতার মধ্যে থাকা ঐক্যসূত্র কে চিনতে পারেন নি। ভারতবর্ষের ‘জাতীয়তাবাদ’ এর ভিত্তি সংস্কৃতি যা তার ভাষা-মত-পরিধান এর বিভিন্নতাকে ছাপিয়ে গেছে এবং এই সংস্কৃতির মূল নিঃসন্দেহে তার ‘ধর্ম’ , ‘হিন্দুত্ব’ এর মধ্যে প্রোথিত।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্বদেশী সমাজ প্রবন্ধে এই ধারণাটিকেই সুসংবদ্ধ করেছেন…”……..ভারতবর্ষের মধ্যে একটি বাঁধিয়া তুলিবার ধর্ম চিরদিন বিরাজ করিতেছে। নানা প্রতিকূল ব্যাপারের মধ্যে পড়িয়াও ভারতবর্ষ একটা ব্যবস্থা করিয়া তুলিয়াছে ,তাই আজও রক্ষা পাইয়াছে”।”
এই ‘বাঁধিয়া তুলিবার ধর্ম’ তার বিকেন্দ্রীত ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যক্তিকে যেমন একদিকে আপন সত্ত্বা অনুযায়ী চিন্তন-মনন-আচরণের মাধ্যমে বিকাশের সুযোগ দেয় আবার সেই বিকাশ কে সমাজের পরিপন্থি হতে দেয় না বরং সেই বিকাশ সমাজকে পরিপুষ্ট করে। ‘যাহা পিন্ডে তাহাই ব্রহ্মাণ্ডে’ — হিন্দু ধর্ম আধারিত সমাজের প্রতিটি ক্ষুদ্র এককে সেই একই দর্শনের প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ক্ষেত্রেও তার কার্যপদ্ধতির প্রতিটি অংশে ব্যক্তির বিকাশ কে প্রাধান্য দিয়ে সেই বিকাশকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যপ্রাপ্তির জন্য সংগঠনকে পুষ্ট করার ব্যবস্থা রয়েছে। সঙ্ঘের কার্যপদ্ধতির মূল ‘শাখা’। একটি ‘শাখা’র কার্যক্রম, সিদ্ধান্ত গ্ৰহণের জন্য মতবিনিময়, বিভিন্ন বয়সের স্বয়ংসেবকদের জন্য উপযুক্ত শারীরিক ও বৌদ্ধিক কার্যক্রম রচনা হিন্দু ধর্ম আধারিত সমাজ ব্যবস্থার প্রতিফলন। সঙ্ঘের সর্বোচ্চ স্তর থেকে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বয়ংসেবকদের আচরণ স্বাভাবিক হয়ে ওঠে কারণ সর্বোচ্চ স্তরের সিদ্ধান্ত শাখাস্তরের মতবিনিময়, পরামর্শেরই বৃহৎ রূপ।
হিন্দু জীবন পদ্ধতির দর্শনগত ভিত্তি, রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের পরিচয় আর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের কার্যপদ্ধতির দর্শনগত অভিন্নতার জন্যই সঙ্ঘ আজ শতবর্ষ পেরিয়ে ভারতবর্ষের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে পেরেছে। স্বয়ংসেবকরা নিজেদের আচরণের মাধ্যমে সমাজের মধ্যে ভারত তথা হিন্দু সমাজ কে বলিষ্ঠ করার কাজ করতে পেরেছে। একদিকে সঙ্ঘবদ্ধ শক্তি হিসেবে ব্যবস্থার পরিবর্তন আর একদিকে সমাজের একক হিসেবে স্বয়ংসেবকদের দ্বারা পরিচিত ব্যক্তির মানসিকতা রাষ্ট্রানুকূল করা — এই দুই দিকেই সঙ্ঘ সফল হয়েছে আর দুই দিকের প্রত্যেকটি অপরকে সহায়তা করে চলেছে।
একদিকে ব্যক্তিকে সংস্কার আর অন্যদিকে সংগঠিত শক্তি হিসেবে ব্যক্তির সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা পরিবর্তন — এই দুই দিকের সমন্বয়ই সঙ্ঘের কার্যপদ্ধতির মৌলিকত্ব যা হিন্দু জীবন দর্শনের মৌলিকত্বের সঙ্গে অভিন্ন।
আজ শতবর্ষ পার করে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ নিজের সহজ-সরল কার্যপদ্ধতির মতোই আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ কিছু লক্ষ্য দিয়েছে সমাজের সামনে যাকে ‘পঞ্চ পরিবর্তন’ বলা হচ্ছে।
সেগুলি হলো- সামাজিক সমরসতা; ‘স্ব’ ভাব অর্থাৎ স্ব-ভাষা , ভূষা, ভোজন, ভজন ,ভ্রমণ, ভবন এর জাগরণ, নাগরিক কর্তব্যবোধ , পরিবেশ সংরক্ষণ এবং পরিবার প্রবোধন। এই পাঁচটি লক্ষ্যের প্রতিটি হিন্দু জীবন পদ্ধতির উপর আধারিত বিষয় অর্থাৎ হিন্দু জীবন পদ্ধতির প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্বকল্যাণ আর কার্যপদ্ধতিও হিন্দু দর্শন আধারিত —- পথ ও পাথেয়-এর মধ্যে সমন্বয়ের এই যুগানুকূল আবিষ্কারের নামই ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ’।
পিন্টু সান্যাল

