সরকারি হাসপাতালকে বেসরকারির মানে উন্নীত করার উদ্যোগ, এক মাসের মধ্যে সংস্কারের পরিকল্পনা চাইলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

সরকারি হাসপাতালকে বেসরকারির মানে উন্নীত করার উদ্যোগ, এক মাসের মধ্যে সংস্কারের পরিকল্পনা চাইলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

সরকারি হাসপাতালের পরিষেবা ও পরিকাঠামোর মান উন্নত করতে উদ্যোগী হল রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর। হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে সামগ্রিক পরিকাঠামো— সব ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে শুক্রবার শহরের পাঁচটি মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ এবং মেডিক্যাল সুপারিনটেনডেন্ট তথা ভাইস প্রিন্সিপালদের (এমএসভিপি) সঙ্গে বৈঠক করলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। সরকারি হাসপাতাল কেন বেসরকারি হাসপাতালের মতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও উন্নত হবে না, বৈঠকে সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। কোন মেডিক্যাল কলেজে কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন, তার বিস্তারিত রিপোর্ট এক মাসের মধ্যে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

স্বাস্থ্য ভবন সূত্রে খবর, সাম্প্রতিক চোরবাগান কাণ্ডের পর সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামো নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতেই এই উদ্যোগ। ওই ঘটনায় আহতদের কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও এসএসকেএম হাসপাতাল থেকে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল জুনিয়র চিকিৎসকদের সংগঠন ডব্লিউবিজেডিএফ এবং সিনিয়র চিকিৎসকদের যৌথ মঞ্চ জেডিএফ। তাদের বক্তব্য ছিল, সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তরে থাকা মেডিক্যাল কলেজগুলির পরিকাঠামো নিয়ে স্বাস্থ্য দফতরেরই যদি সংশয় থাকে, তা হলে রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা তৈরি হচ্ছে কেন?

এই সমালোচনার জবাবে সোমবার মিলন মেলায় মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘‘মণিপাল, অ্যাপেলো যা দিতে পারবে, পিজি ছাড়া আর কেউ দিতে পারবে নাকি?’’ একই সঙ্গে সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলিকেও সেরা করে তোলার আশ্বাস দেন তিনি। তবে সেই কাজের জন্য সময় চেয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ছ’মাসের মধ্যে সব কিছু বদলে ফেলা সম্ভব নয়।

স্বাস্থ্য দফতরের এক আধিকারিকের দাবি, মুখ্যমন্ত্রীর সেই বক্তব্যের সূত্র ধরেই শুক্রবারের বৈঠক। হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও পরিকাঠামোর মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ন্যাশনাল অ্যাক্রিডিটেশন বোর্ড ফর হসপিটালস অ্যান্ড হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার্সের (এনএবিএইচ) নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। সেই কাঠামো মেনেই সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলির পরিকাঠামোগত সমস্যা চিহ্নিত করে সংস্কারের পরিকল্পনা তৈরি করতে নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

বৈঠকে বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের নির্দিষ্ট সমস্যাগুলিও উঠে আসে। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের সার্জারি বিল্ডিং এবং এমসিএইচ বিল্ডিংয়ে অবস্থিত মেডিসিন বিভাগের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা জানানো হয়। ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ সুস্মিতা ভট্টাচার্য জানান, সেখানে কোনও মর্গ নেই। পাশাপাশি নিউরো মেডিসিন ও নিউরো সার্জারির নতুন বিভাগ চালু করা এবং স্ত্রীরোগ বিভাগের পিছনে একটি নতুন ভবন তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। প্রস্তাবিত ভবনে জরুরি বিভাগ ও ক্যাজুয়াল্টি বিভাগ স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ক্যানসার চিকিৎসার বহির্বিভাগ থাকলেও ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে অন্তর্বিভাগের পরিকাঠামো নেই বলে বৈঠকে জানানো হয়।

এনআরএস মেডিক্যাল কলেজেও পরিকাঠামোগত পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রশাসনিক ভবনের উল্টো দিকে তৈরি হওয়া নতুন ভবনে জরুরি বিভাগ, মেডিসিন, সার্জারি, অর্থোপেডিক, রেডিয়োলজি এবং ব্লাড ব্যাঙ্ক স্থানান্তরের কথা রয়েছে। অন্যান্য বিভাগ স্থানান্তরের প্রক্রিয়া এগোলেও জরুরি বিভাগ এখনও সেখানে সরানো সম্ভব হয়নি। বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়।

স্বাস্থ্য ভবনের এক আধিকারিকের বক্তব্য, সদিচ্ছা ও পরিকল্পনা থাকলে সরকারি হাসপাতালেও বেসরকারি হাসপাতালের মতো উন্নত পরিষেবা দেওয়া সম্ভব— এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ সূত্রে খবর, প্রাথমিক ভাবে হাসপাতালের একটি নির্দিষ্ট ভবনকে সংস্কারের জন্য বেছে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে পূর্ত দফতরের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ করতে পারেন কর্তৃপক্ষ।

বৈঠক শেষে সমাজমাধ্যমে স্বাস্থ্যমন্ত্রী লেখেন, দক্ষ, সহজলভ্য এবং প্রতিটি নাগরিকের চাহিদা পূরণে সক্ষম স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলাই তাঁদের লক্ষ্য। পরিকাঠামোর উন্নয়ন, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিষেবাকে দেশের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ করে তোলার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

অন্য দিকে, একই দিনে কলকাতা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক বৈঠক করে সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলির হস্টেল পরিকাঠামোর উন্নয়নের দাবি জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের চিকিৎসক সংগঠন ন্যাশনাল মেডিকোস অর্গানাইজেশন (এনএমও)। সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক অর্ণপ পালের দাবি, মেডিক্যাল কলেজগুলিতে আসন সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে হস্টেলের পরিকাঠামো বাড়েনি। ফলে এমবিবিএস পড়ুয়াদের পাশাপাশি হাউসস্টাফ ও স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণরত চিকিৎসকদেরও হস্টেল পেতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এই বিষয়ে স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিকর্তা ইন্দ্রজিৎ সাহার কাছে স্মারকলিপিও জমা দিয়েছে সংগঠনটি। স্বাস্থ্য ভবনের শুক্রবারের বৈঠকেও মেডিক্যাল কলেজগুলির হস্টেল পরিকাঠামোর মানোন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.