বিয়ের আগে অসুস্থতার কথা গোপন! বিয়ে বাতিলের আর্জি নিয়ে হাইকোর্টে গিয়ে উলটে অর্থদণ্ডের মুখে স্বামী

বিয়ের আগে অসুস্থতার কথা গোপন! বিয়ে বাতিলের আর্জি নিয়ে হাইকোর্টে গিয়ে উলটে অর্থদণ্ডের মুখে স্বামী

বিয়ের আগে স্ত্রীর দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতার কথা গোপন করার অভিযোগ তুলে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন এক ব্যক্তি। তাঁর আর্জি ছিল, অবিলম্বে তাঁদের এই বিয়ে বাতিল ঘোষণা করা হোক। তবে যুবকের সেই আবেদন খারিজ তো বটেই, উল্টে স্ত্রীকে আদালতে হাজির করানোর এই আইনি লড়াইয়ের জেরে মামলাকারী স্বামীকেই এক লক্ষ টাকার অর্থদণ্ড দিল আদালত। বিচারপতি দেবাংশু বসাক এবং বিচারপতি আর্যক দত্তের ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় দিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ও নিম্ন আদালতের রায়

২০১৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আলিপুরে সামাজিক ও রেজিস্ট্রি— উভয় নিয়ম মেনেই ওই দম্পতির বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল। অভিযোগ, বিয়ের মাত্র কয়েক দিন পরেই স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। স্বামীর দাবি, স্ত্রীর একটি দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা ছিল, যা ২০০৭ সাল থেকে চলে আসছে। কিন্তু বিয়ের আগে স্ত্রী ও তাঁর পরিবার অত্যন্ত সুকৌশলে সেই তথ্য তাঁর কাছ থেকে গোপন করেন। স্বামীর বক্তব্য, তিনি যদি আগে থেকেই এই অসুস্থতার কথা জানতে পারতেন, তবে কখনোই এই বিয়েতে সম্মতি দিতেন না। তিনি প্রতারিত হয়েছেন দাবি করে প্রথমে আলিপুর আদালতে মামলা করেছিলেন।

অন্যদিকে, স্ত্রীর পক্ষের দাবি ছিল, বিয়ের আগে উভয় পরিবারের মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহ বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়েছিল। এমনকি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার নথিপত্রও স্বামীর বাবার কাছে পাঠানো হয়েছিল। আলিপুর আদালত সমস্ত দিক বিবেচনা করে স্বামীর আবেদন খারিজ করে দেয়। নিম্ন আদালত জানায়, স্ত্রী যে প্রতারণা করে এই বিয়ে করেছেন, মামলাকারী তা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। নিম্ন আদালতের এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করেই পরবর্তীতে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন স্বামী।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও ডিভিশন বেঞ্চের রায়

মঙ্গলবারের শুনানিতে বিচারপতি বসাকের বেঞ্চ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানায়, মামলাকারী স্বামী আমেরিকায় কর্মরত ছিলেন এবং বিয়ের মাত্র আট দিন আগে ভারতে এসেছিলেন। ভারতে আসার পর তিনি কেন হবু স্ত্রীর স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেননি কিংবা তাঁর পরিবারের কাছে শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে কিছু জানতে চাননি, সেই প্রশ্ন তোলে আদালত। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, কোনো তথ্য না জানানো মানেই সরাসরি ‘প্রতারণা’ বা ‘চিটিং’ প্রমাণিত হয় না। এ ক্ষেত্রে মামলাকারীকে প্রমাণ করতে হবে যে বিয়ের নেপথ্যে তাঁর স্ত্রীর উদ্দেশ্য প্রথম থেকেই অসৎ ছিল।

শুনানির সময় কিছু হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটও সামনে আসে। আদালত জানায়, বিয়ের পরের কিছু চ্যাটের স্ক্রিনশট দেখিয়ে হঠাৎ প্রতারণার তত্ত্ব দাঁড় করানো যায় না। দুই বিচারপতির স্পষ্ট মন্তব্য, স্বামী বা তাঁর পরিবার যে ইচ্ছাকৃতভাবে অসুস্থতার তথ্য গোপন করেছিলেন এবং জবরদস্তি বিয়েতে সম্মতি আদায় করেছিলেন, তা শক্ত প্রমাণ দিয়ে সাব্যস্ত করতে হবে। তবেই আদালত বিয়ে বাতিলের বিষয় বিবেচনা করবে।

নিম্ন আদালতের রায় বহাল রেখে ডিভিশন বেঞ্চ স্বামীর আর্জি পুরোপুরি খারিজ করে দেয়। সেই সঙ্গে এই মামলা দায়ের করার কারণে স্ত্রীকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ১ লক্ষ টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে স্বামীকে। আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে মামলার খরচ বাবদ ওই অর্থ মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.