বীরভূমের তারাপীঠ মন্দিরের কাছেই অবস্থিত ‘বিদেশিনী’ হোটেলে সোমবার ভোরে এক মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে দুই শিশুসহ মোট নয়জন পুণ্যার্থীর মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় আরও বহু আবাসিক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। খবর পেয়ে তারাপীঠ ও রামপুরহাট থানার পুলিশ এবং দমকল বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে বেশ কিছুক্ষণের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। হোটেল থেকে ২৮ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বর্তমানে ৭ জন রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নিহতদের মধ্যে মেঘালয়ের একই পরিবারের পাঁচ সদস্য রয়েছেন। পুলিশ ইতিমধ্যে হোটেলের মালিককে গ্রেফতার করেছে এবং অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সংক্রান্ত অনিয়মের তদন্ত শুরু করেছে।
অগ্নি ফাঁদ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিজ্ঞতা
দমকলের প্রাথমিক অনুমান, শর্ট সার্কিট এবং অন্দরের ফাইবার সজ্জার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। ভোরে চিৎকার শুনে পর্যটকেরা ঘরের দরজা খুলতেই আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পান। জানলাবিহীন ঘরে শিশুরা ও বয়স্কদের নিয়ে অনেকে আতঙ্কে আটকে পড়েন।
বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় অন্ধকারে হোটেলের জরুরি নির্গমন পথ পুণ্যার্থীরা খুঁজে পাননি। পিছনের একটি নিরাপদ রাস্তা থাকলেও আবাসিকরা সে বিষয়ে অবগত ছিলেন না এবং অভিযোগ উঠেছে যে সেই পথটি বন্ধ রাখা হয়েছিল। প্রাণ বাঁচাতে অনেকেই রিসেপশনের দিকে ছোটেন, কিন্তু সেখানেই আগুনের তীব্রতা বেশি থাকায় অনেকে দগ্ধ হন। এছাড়া পাঁচতলা পর্যন্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ায় বিষাক্ত ধোঁয়ায় বহু মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন।
প্রশাসনের ভূমিকা ও ফায়ার অডিট নিয়ে বড় প্রশ্ন
এই দুর্ঘটনার পর আরও একবার রাজ্যের ফায়ার অডিটিং এবং দমকলের ছাড়পত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্টিফেন কোর্ট, তপসিয়া কিংবা আনন্দপুরের মতো অতীতে ঘটে যাওয়া একাধিক অগ্নিকাণ্ডের স্মারক হিসেবে প্রতিবারই তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও, বাস্তবে সুপারিশ বাস্তবায়নের অভাব প্রকট।
- কমিটির সুপারিশে অনীহা: দমকল বিভাগের প্রাক্তন ডেপুটি ডিরেক্টর উদয় নারায়ন অধিকারী জানান, ঘটনার পর একাধিক কমিটি গঠন করা হলেও তাদের দেওয়া সুপারিশ পরবর্তীতে কার্যকর করা হয় না।
- পরিকাঠামোগত অভাব: একই দমকল কর্মীদের ওপর অগ্নিনির্বাপণ এবং অডিট—উভয় দায়িত্বই থাকায় পর্যবেক্ষণ যথাযথভাবে করা সম্ভব হয় না। পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে অনৈতিকভাবে রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগও উঠে আসে।
- নিয়মের অবহেলা: ফায়ার বিভাগের আধিকারিকরা উল্লেখ করেছেন যে আগে থেকে জানিয়ে অডিট করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়ম মেনে পরিকাঠামো সাজিয়ে রাখে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে জরুরি নির্গমন পথে মালামাল রেখে পথ অবরুদ্ধ করার মতো ঘটনা অহরহ ঘটে, যা দক্ষিণ কলকাতার এক শপিং মলের ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছিল।
বর্তমানে তারাপীঠের হোটেলটিতে সঠিক নিয়ম মেনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল কি না এবং আপদকালীন পথ বন্ধ থাকার অভিযোগের সত্যতা কতখানি, তা পুলিশ ও দমকল বিভাগ খতিয়ে দেখছে।

