দেশের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে ঐতিহাসিক লালকেল্লা থেকে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেওয়ার সময় ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার লক্ষ্যে এক নতুন সংকল্পের বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আগামী পাঁচ থেকে সাত বছর দেশের প্রগতির জন্য অত্যন্ত সিদ্ধান্তমূলক হতে চলেছে উল্লেখ করে, দেশের তরুণ প্রজন্মকে এই রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
চলতি বছর লালকেল্লা থেকে দেওয়া প্রায় ৭৫ মিনিটের এই ভাষণে বিকাশ ও নিরাপত্তার সমন্বয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী।
বিকশিত ভারতের স্তম্ভ: ‘শক্তির সপ্তধারা’
দেশের আগামী দশকের প্রগতির দিশা নির্ধারণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী ‘শক্তির সপ্তধারা’ বা সাতটি বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কারের কথা ঘোষণা করেন:
- উৎপাদন শক্তি (Manufacturing Power): দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থায় গুণগত মান, পরিমাণ এবং সাশ্রয়ী খরচের ওপর জোর দেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, যন্ত্রাংশের পাশাপাশি ভারতে সম্পূর্ণ পণ্য উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে যাতে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ বিশ্ববাজারে জায়গা করে নেয়।
- কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ: ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় খাদ্য, ফল, মশলা ও সবজিকে বিশ্বব্যাপী ব্র্যাণ্ডে রূপান্তর করার বার্তা দেওয়া হয়। মুক্তবাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত বৈশ্বিক বাজারকে কাজে লাগানোর ওপর জোর দেন তিনি।
- প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ: ৬জি (6G) পরিষেবা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য এবং রোবোটিক্স, ডেটা সেন্টার ও নতুন প্রযুক্তির যুগের সঙ্গে দেশকে মানিয়ে নেওয়ার রূপরেখা তুলে ধরা হয়।
- গতিশক্তি ও পরিকাঠামো: বাণিজ্যে গতি আনতে এক্সপ্রেসওয়ে, নতুন সড়ক, বিস্তৃত রেল যোগাযোগ এবং বন্দর-কেন্দ্রিক উন্নয়নের ওপর বিশেষ নজর দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
- আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা: ভারতকে আর কেবল প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের বাজার হিসেবে না রেখে ড্রোন ও কাউন্টার-ড্রোন প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী করার প্রতিশ্রুতি পুনরাবৃত্তি করা হয়।
- পরিবেশ ও সমুদ্রবান্ধব অর্থনীতি: গ্রিন হাইড্রোজেন, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদন ও শক্তি সঞ্চয়ে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সামুদ্রিক প্রযুক্তি, উপকূলীয় পর্যটন ও মৎস্যচাষে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানানো হয়।
- মেধা ও কৃষ্টি শক্তি (Soft Power): ভারতের যোগব্যায়াম, হস্তশিল্প, চলচ্চিত্র, গেমিং, অ্যানিমেশন এবং ডিজিটাল কনটেন্টকে বৈশ্বিক স্তরে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয়।
যুবশক্তির ওপর আস্থা ও মাওবাদ প্রতিরোধ
প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার স্বপ্ন পূরণ করতে দেশের তারুণ্যের ওপরই তাঁর পূর্ণ আস্থা রয়েছে। এই উদ্দেশ্যে প্রতি বছর দেশের ১ কোটি যুবক-যুবতীকে বিশেষ কৃত্রিম মেধা (AI) প্রশিক্ষণের ঘোষণা দেন তিনি।
পাশাপাশি, নিরাপত্তা ইস্যুতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি জানান যে দেশে মাওবাদী হিংসা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং সাড়ে ৩ হাজারেরও বেশি নিরাপত্তাকর্মীর আত্মত্যাগের বিনিময়ে শান্তি ফিরে আসছে। সশস্ত্র মাওবাদ শেষ হলেও দেশের ভেতরে থাকা ‘দিমাগি নকশাল’ বা মাওবাদী মনোভাবাপন্নদের বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করেন তিনি। সমাজকে বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টাকারীদের চিহ্নিত করে বিচ্ছিন্ন করার ডাক দেন মোদী।
অনুষ্ঠানের আবহ ও অন্যান্য মুহূর্ত
এ দিনের কর্মসূচির শুরুতে রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী। লালকেল্লায় পতাকা উত্তোলনের সময় লালকেল্লার ইতিহাসে এই প্রথম বারের মতো পরিবেশিত হয় জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম্’, যার পর গাওয়া হয় জাতীয় সঙ্গীত।
ভাষণ চলাকালীন পরিসংখ্যানে সামান্য সংশোধন এবং সাময়িক বিরতিকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিরোধী দল কংগ্রেস এবং আম আদমি পার্টির পক্ষ থেকে টেলিপ্রম্পটার ব্যবহারের ধরণ নিয়ে কটাক্ষ করা হলে তা রাজনৈতিক চর্চার বিষয় হয়ে ওঠে।
তবে সমস্ত বিতর্ক অতিক্রম করে প্রধানমন্ত্রী শেষ বার্তা দিয়ে বলেন, “আসুন স্বপ্নকে সংকল্পের রূপ দিই। একটি প্রদীপ থেকে হাজার প্রদীপ জ্বালিয়ে বিকশিত ভারত গড়ে তুলি।”

