হাই কোর্টে শোরগোল: মসজিদ থেকে মাইক খোলা সংক্রান্ত শুনানিতে তুঙ্গে বচসা, এজি-কল্যাণ বিতণ্ডায় হস্তক্ষেপ প্রধান বিচারপতির

হাই কোর্টে শোরগোল: মসজিদ থেকে মাইক খোলা সংক্রান্ত শুনানিতে তুঙ্গে বচসা, এজি-কল্যাণ বিতণ্ডায় হস্তক্ষেপ প্রধান বিচারপতির

মসজিদ থেকে মাইক বা লাউডস্পিকার খুলে ফেলাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা জনস্বার্থ মামলার শুনানি চলাকালীন চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠল কলকাতা হাই কোর্টের আদালতকক্ষ। ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি অতরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চে শুনানি চলাকালীন বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন সিনিয়র আইনজীবী তথা সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল (এজি) সুরজিৎ নাথ মিত্র। উভয়পক্ষের তীব্র ব্যক্তিগত আক্রমণের জেরে পরিস্থিতি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়লে শেষ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে নিজেই হস্তক্ষেপ করে পরিবেশ শান্ত করতে হয়।

আদলতকক্ষে বাকবিতণ্ডা ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

বৃহস্পতিবার ডিভিশন বেঞ্চে মসজিদ থেকে মাইক সরানোর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার শুনানি শুরু হয়। আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সওয়ালে দাবি করেন, ১৯৯৯ সালের একটি ডিভিশন বেঞ্চের নির্দেশিকা ও শব্দবিধি মেনে মসজিদে মাইক বাজানোর বিধান রয়েছে। কিন্তু কোনো সঠিক নির্দেশিকা ছাড়াই বর্তমানে মসজিদগুলি থেকে মাইক সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

এই সওয়ালের বিরোধিতা করে এজি সুরজিৎ নাথ মিত্র জানান, তিনি গত মঙ্গলবার এই পিটিশন সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। এর জবাবে কল্যাণবাবু বলেন, “আমি সোমবার পিটিশন করেছি, আপনি মঙ্গলবার জানতে পারলে আমি কী করব!”

এর পরেই দুই অভিজ্ঞ আইনজীবীর মধ্যে বচসা তুঙ্গে ওঠে। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, এজলাসে শুনানি চলাকালীন এজি তাঁকে উদ্দেশ্য করে ‘চটিচাটা’ বলে কটাক্ষ করেন এবং মন্তব্য করেন, “দিদির কাছে ধমক খাচ্ছেন, তাই হয়তো এজলাসে এমন আচরণ করছেন।” এর পাল্টা জবাবে এজি-র উদ্দেশে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও তাঁকে ‘বুটচাটা’ বলে আক্রমণ করেন।

অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

ঘটনার সময় এজলাসে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল বিল্বদল ভট্টাচার্য। তিনি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণের অভিযোগ এনে মন্তব্য করেন, “এই সব আচরণের কারণেই পার্লামেন্টে সাসপেন্ড হয়েছিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়।” এর জবাবে কল্যাণবাবু জানান, সংসদে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধে সরব হওয়ার কারণেই তাঁকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল।

আদালতকক্ষের উত্তপ্ত পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে আনতে হস্তক্ষেপ করেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং উভয়পক্ষকে শান্ত করেন। মামলাটির পরবর্তী শুনানি আগামী মঙ্গলবার ধার্য করা হয়েছে।

মামলার প্রেক্ষাপট

উল্লেখ্য, সম্প্রতি নবান্নে আয়োজিত এক সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, শব্দবিধি সংক্রান্ত হাই কোর্টের ২০২০ সালের রায় কার্যকর করতে রাজ্য জুড়ে বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছে। এই অভিযানে বিভিন্ন ধর্মীয় স্থান থেকে পাঁচ হাজারেরও বেশি লাউডস্পিকার খুলে ফেলা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, সরকার নতুন কোনো নিয়ম চালু করেনি, বরং আদালতের পুরনো রায়কেই আইনানুগভাবে প্রয়োগ করছে এবং ধর্মীয় স্থান চত্বরের ভেতরে শব্দ সীমাবদ্ধ থাকলে তাতে কোনো বাধা নেই। তবে রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপের বৈধতা নিয়েই হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন মামলাকারীরা, যার শুনানিতে এদিন অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী থাকল উচ্চ আদালত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.