বীরভূমের মহম্মদবাজারে এক প্রাক্তন বাসচালকের বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও সোনা উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বুধবার ভোর থেকে চালানো অভিযানে মিনার মণ্ডল নামের ওই ব্যক্তির বাড়ি থেকে ২০ কোটি নগদ টাকা এবং ১৫ কেজি সোনার বাট উদ্ধার করেছে পুলিশ। জানা গেছে, উদ্ধার হওয়া এই বিপুল অর্থ ও সম্পত্তির প্রকৃত মালিক মিনার নন, বরং তাঁর ভগ্নিপতি তথা এলাকার প্রভাবশালী ‘পাথরসম্রাট’ নাজিবুদ্দিন ওরফে টুলু মণ্ডল।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে খবর, উত্তরবঙ্গ রাজ্য পরিবহণ নিগমের বাসচালকের চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়া মিনারের বাড়িতে বুধবার দিনভর তল্লাশি চালানো হয়। মিনারের বাড়ি থেকে থরে থরে সাজানো নোটের পাহাড়ে টাকা গোনার কাজ এখনও চলছে। মিনার মূলত টুলু মণ্ডলের পিসতুতো বোনের স্বামী এবং তাঁর টোল ব্যবসার ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতেন। ঘটনার পর থেকে টুলু মণ্ডলের সন্ধান মেলেনি।
সাধারণ দিনমজুর থেকে ‘পাথরসম্রাট’: টুলুর উত্থানের নেপথ্যে
বীরভূমের মহম্মদবাজার, মুরারই ও নলহাটির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা ব্যাসল্ট পাথরের খনি ও ক্রাশার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের মূল অভিযোগ রয়েছে টুলুর বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০০ সাল নাগাদ পাঁচামি এলাকায় ক্রাশারে লরি লোডিংয়ের দিনমজুর হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন টুলু। পরবর্তীতে লরিচালকদের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে ব্যবসা বাড়িয়ে ২০১০ সালের মধ্যে তিনি নিজের লরি কেনেন।
২০১৬ সালে রাজ্যে পাথর খাদানে শুল্ক আদায়ের জন্য ডুপ্লিকেট কার্বন রিসিট বা ‘ডিসিআর’ ব্যবস্থা চালুর পর থেকেই টুলুর ভাগ্যের আমূল বদল ঘটে। সাৎশোলসহ মোট সাতটি টোলগেটের পরিচালনার দায়িত্ব পান তিনি।
কোটি কোটি টাকার ‘ডিসিআর’ দুর্নীতি
অভিযোগ, টোলগেট পরিচালনার আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে চলছিল ভুয়ো ও জাল ডিসিআর র্যা কেট। লরি পিছু নিয়মমাফিক শুল্ক নেওয়া হলেও জাল রিসিট দিয়ে সেই রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা না করে আত্মসাৎ করা হতো। প্রতিদিন ওই অঞ্চলে গড়ে ৩ হাজার লরি যাতায়াত করে, যেখান থেকে প্রতিদিন প্রায় আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সরকারি খাতায় ১০ শতাংশের কম রাজস্ব জমা পড়ত এবং বাকি টাকা বেআইনিভাবে অন্যত্র পাচার হতো।
সম্পতি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শুল্ক আদায়ের দায়িত্বে পরিবর্তন আনা হয় এবং ১৭ মে থেকে সরকারি চার দপ্তরের আধিকারিকদের হাতে টোল পরিচালনার দায়িত্ব সঁপে দেওয়া হয়। নতুন ব্যবস্থা চালু হতেই রাজস্ব আদায়ে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে:
- আগের সরকারের সময় (এপ্রিল–অক্টোবর ২০২৫): দৈনিক গড় রাজস্ব ১৯ লক্ষ টাকা।
- পরবর্তী সময় (নভেম্বর ২০২৫–মার্চ ২০২৬): দৈনিক গড় রাজস্ব ৭০ লক্ষ টাকা।
- নতুন ব্যবস্থার অধীনে (১৭ মে পরবর্তী): প্রথম দিনেই আদায় ১ কোটি ২০ লক্ষ টাকা এবং পরের দিন তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ কোটি ৩০ লক্ষ টাকায়।
কর্মকর্তাদের মতে, দৈনিক শুল্ক আদায় ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বিগত কয়েক বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ডিসিআর দুর্নীতি হয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
আইনানুগ ব্যবস্থা ও তদন্তের নির্দেশ
সম্প্রতি দুর্গাপুরের এক ব্যবসায়ীকে হুমকি দেওয়া এবং ভূমি ও রাজস্ব দপ্তরের তরফে ৩ লক্ষ কিউবিক ফুটেরও বেশি বেআইনি বালি উদ্ধারের ঘটনায় টুলুর বিরুদ্ধে মহম্মদবাজার থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়। বুধবারের ঘটনার পর তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তের পরিধি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এর আগেও গোরু পাচার মামলায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আতশকাঁচের নিচে এসেছিলেন টুলু। তিনি ‘মহম্মদ নাজিবুদ্দিন মণ্ডল স্টোন প্রোডাক্টস্ প্রাইভেট লিমিটেড’ সহ পরিবারভুক্ত একাধিক সংস্থার মাধ্যমে বেআইনি অর্থ লেনদেন ও পাচার করেছেন বলে ইডি ও সিবিআই সূত্রে জানা গেছে।
উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সোনা বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি পলাতক টুলু মণ্ডলের সন্ধানে তল্লাশি জোরদার করেছে পুলিশ। রাজ্য পুলিশের ইঙ্গিত, এই চক্রের শিকড় আরও অনেক গভীরে বিস্তৃত এবং ঘটনায় জড়িত অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামও শীঘ্রই প্রকাশ্যে আসতে পারে।

