এক যুগ পর বিধানসভায় ২১ জুলাই তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট পেশ: শুভেন্দুর তোপ মমতাকে, আড়াল করার বিস্ফোরক অভিযোগ

এক যুগ পর বিধানসভায় ২১ জুলাই তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট পেশ: শুভেন্দুর তোপ মমতাকে, আড়াল করার বিস্ফোরক অভিযোগ

অবশেষে দীর্ঘ ১২ বছর পর সর্বসমক্ষে এল ১৯৯৩ সালের ঐতিহাসিক ২১ জুলাইয়ের ঘটনা সংক্রান্ত সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় কমিশনের তদন্ত রিপোর্ট। সোমবার রাজ্য বিধানসভায় এই রিপোর্ট পেশ করেন মুখ্যমন্কা শুভেন্দু অধিকারী। রিপোর্ট পেশ করে তিনি অভিযোগ করেন, ২১ জুলাইয়ের আবেগ ও শহীদদের আত্মত্যাগকে ব্যবহার করে অনেকেই নিজেদের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি করেছেন, কিন্তু শহীদ পরিবারগুলি আজ চরম উপেক্ষিত।

কমিশন গঠিত হলেও আড়ালেই ছিল রিপোর্ট

২০১১ সালে রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর ৪ নভেম্বর প্রাক্তন বিচারপতি সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এই তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। দু’বছর পর, ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে কমিশন তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দিলেও তৎকালীন সরকার তা প্রকাশ্যে আনেনি। আজ সেই রিপোর্ট বিধানসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করে রাজ্য সরকার।

৪৪ জনকে তলব করলেও বাদ মূল নেত্রী মমতা!

রিপোর্ট পেশের সময় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী উল্লেখ করেন, তদন্ত কমিশন মোট ৪৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে সাক্ষ্যদানের জন্য তলব করেছিল। সেই তালিকায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বিমান বসু, সোমেন্দ্রনাথ মিত্র, প্রদীপ ভট্টাচার্য, মদন মিত্র ও সৌগত রায়ের মতো প্রবীণ রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি মণীশ গুপ্ত, এন কৃষ্ণমূর্তি এবং তুষারকান্তি তালুকদারের মতো শীর্ষ প্রশাসনিক ও পুলিশকর্তারা ছিলেন।

তবে মুখ্যমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, যে মহাকরণ অভিযানের ডাক দেওয়া হয়েছিল, তার মূল নেত্রী তথা তৎকালীন যুব কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই কমিশন তলব করেনি।

সাক্ষ্য দেননি পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায়: মন্তব্যের পুনরুল্লেখ

যে রাজনৈতিক নেতাদের কমিশন তলব করেছিল, তাঁদের মধ্যে একমাত্র পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায়ই সাক্ষ্য দিতে যাননি। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের রাজ্য বিধানসভার প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা পঙ্কজবাবু তৎকালীন সময়ে কেন সাক্ষ্য দেননি, তা বিধানসভায় পড়ে শোনান মুখ্যমন্ত্রী। পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য ছিল— সে দিনের গুলিচালনার জন্য তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব মণীশ গুপ্তই এককভাবে দায়ী ছিলেন। কিন্তু সেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই পরবর্তীকালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হয়। কমিশন কেন তাঁর নাম উল্লেখ বা তাঁকে দায়ী করেনি, সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলে সাক্ষ্যদান এড়িয়ে গিয়েছিলেন পঙ্কজবাবু।

তদন্ত কমিশনের বিস্ফোরক পর্যবেক্ষণ

কমিশনের রিপোর্টে একাধিক চাঞ্চল্যকর ও বিস্ফোরক পর্যবেক্ষণের কথা তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর:

  • তদন্তে গলদ ও নথি গায়েব: ২১ জুলাইয়ের ঘটনার কোনো উপযুক্ত তদন্ত হয়নি। আইন অনুযায়ী যে ‘এক্সিকিউটিভ ইনকোয়ারি’ হওয়ার কথা ছিল, তা ন্যায্য ও সরল বিশ্বাসে করা হয়নি। এমনকি শীর্ষ প্রশাসনিক কর্তাদের বাঁচাতে একাধিক ফাইল ও নথি গায়েব করা হয়েছিল।
  • তৎকালীন পুলিশ কমিশনারের অসঙ্গতি: তৎকালীন পুলিশ কমিশনার তুষারকান্তি তালুকদারের রিপোর্ট ছিল অসামঞ্জস্যপূর্ণ। সে দিন ঠিক কার নির্দেশে গুলি চলেছিল, তা প্রকাশ করতে তিনি অস্বীকার করেছিলেন।
  • অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক গুলিচালনা: কমিশন তার রিপোর্টে স্পষ্ট জানিয়েছে, সে দিন মহাকরণ থেকে বহু দূরে— যেমন মেয়ো রোড, রেড রোড, ডোরিনা ক্রসিং ও এসপ্ল্যানেড এলাকায় অবস্থানরত আমজনতার ওপর পুলিশি গুলিচালনা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়, উস্কানিবিহীন ও অন্যায্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.