কলকাতার পর এবার নদীয়া জেলা এবং পর্যায়ক্রমে রাজ্যের সমস্ত জেলাতেই সরকারি ও সরকারি-পোষিত স্কুলগুলির মিড-ডে মিল সরবরাহের দায়িত্ব পেতে চলেছে ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস বা ইসকন (ISKCON)। বৃহস্পতিবার পূর্ব মেদিনীপুরের মেচেদায় ইসকনের রথযাত্রা উৎসবে যোগ দিয়ে এই বড় ঘোষণা করলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, এই প্রকল্পের বিষয়ে ইতিমধ্যে রাজ্য সরকারের সঙ্গে ইসকনের প্রাথমিক চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
১ আগস্ট থেকে কলকাতায় পথ চলা শুরু
রথযাত্রা উৎসবের মঞ্চ থেকে প্রকল্পের রূপরেখা স্পষ্ট করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন:
“আপনারা শুনলে খুশি হবেন, আগামী ১ আগস্ট থেকে কলকাতায় প্রথম এই পরিষেবা শুরু করছি আমরা। কলকাতার পর নদীয়া এবং তারপর রাজ্যের অন্যান্য জেলাতেও এই ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। এবার থেকে স্কুলগুলিতে মিড-ডে মিল খাওয়াবে ইসকন।”
চলতি অর্থবর্ষের বাজেট পেশের সময় অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত ঘোষণা করেছিলেন যে কলকাতার পুর এলাকার স্কুলগুলিতে পরীক্ষামূলক বা ‘পাইলট প্রজেক্ট’ হিসেবে মিড-ডে মিলের দায়িত্ব ইসকনকে দেওয়া হবে। বিধানসভার অধিবেশন শেষে মুখ্যমন্ত্রীও এই সিদ্ধান্তের কথা পুনর্ব্যক্ত করে সাংবাদিকদের বলেন, “পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে কলকাতার স্কুলগুলির দায়িত্ব ইসকনকে দেওয়া হচ্ছে। খেয়ে দেখুন গুণমানে অত্যন্ত ভালো হবে। তবে খাওয়া দাওয়ার পর আপনার ইচ্ছা না হলে ‘হরেকৃষ্ণ’ না-ও বলতে পারেন।” রাজ্যের স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মনও পূর্বে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, কলকাতায় এই প্রকল্প সফল হলে তা রাজ্যজুড়ে সম্প্রসারিত হবে।
পুষ্টির আশ্বাস ও ডিম ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক
এতদিন সরকারি স্কুলগুলির মিড-ডে মিলে নিয়মিত ডিম দেওয়া হতো। ইসকন নিরামিষাশী প্রতিষ্ঠান হওয়ায় কলকাতার স্কুলে তাদের এই দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকেই শিক্ষামহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে— তবে কি এবার থেকে পড়ুয়ারা আর ডিম পাবে না?
এই বিতর্কের প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট কোনো পদের নাম না জানালেও পুষ্টিকর আহারের সম্পূর্ণ নিশ্চয়তা দিয়েছেন। তিনি বলেন:
“সাধারণ মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের সন্তানরাই মূলত মিড-ডে মিল খায়। তাদের জন্য সম্পূর্ণ পুষ্টিকর আহারের ব্যবস্থা ইসকনই নিশ্চিত করবে।”
ইসকনের এই পদক্ষেপকে উৎসাহিত করে মুখ্যমন্ত্রী সংস্কৃত শব্দবন্ধ ব্যবহার করে বলেন, “এগিয়ে চলুন। চরৈবেতি!” (যার অর্থ ‘এগিয়ে চলো’)।
আইনি বিতর্ক ও অন্যান্য রাজ্যের মডেল
বর্তমানে কলকাতার কিছু স্কুলে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় রান্না হয়, আবার কিছু স্কুলে কমিউনিটি কিচেন থেকে খাবার সরবরাহ করা হয়। ইসকন ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে তাদের ‘অক্ষয় পাত্র’ প্রকল্পের মাধ্যমে সাফল্যের সঙ্গে লক্ষাধিক দরিদ্র শিশুর খাবার জোগায়। গুজরাত সহ একাধিক রাজ্যে মিড-ডে মিলের দায়িত্ব সামলানোর পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে এই সংস্থার।
তবে বাংলায় এই সিদ্ধান্তের পর বিতর্ক দানা বেঁধেছে। বিকাশ ভবন সূত্রের খবর, স্কুলশিক্ষা দফতরের নিয়ম অনুযায়ী পড়ুয়াদের পুষ্টির জন্য প্রতি সপ্তাহে ডিম দেওয়া বাধ্যতামূলক। ইসকনের মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এই দায়িত্ব নিলে পড়ুয়ারা পুষ্টিকর ডিম থেকে বঞ্চিত হবে এবং জোরপূর্বক তাদের খাদ্যাভাস বদলে নিরামিষ আহারে অভ্যস্ত করানো হবে বলে অভিযোগ তুলেছে বিরোধী শিবির। এই সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেছেন শ্রীরামপুরের তৃণমূল সাংসদ ও আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়।

