শাসক শিবিরে ক্রমাগত ভাঙনের আবহে তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করে তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণ শানালেন বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। সম্প্রতি দলের কঠিন পরিস্থিতিতে অভিষেকের লড়াইকে ‘বাঘ’-এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার সেই মন্তব্যকে উপহাস করে ঋতব্রত দাবি করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসলে অভিষেককে ‘বাঘরোল’ বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ভুলবশত ‘বাঘ’ বলে ফেলেছেন। একই সঙ্গে তৃণমূলের ভাঙন আরও স্পষ্ট করে কালীঘাট শিবির ছাড়ার ঘোষণা করেছেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী মণীশ গুপ্ত। দল ছাড়ার পথে পা বাড়িয়ে রেখেছেন রাজারহাট-নিউটাউনের প্রাক্তন বিধায়ক তাপস চট্টোপাধ্যায়ও।
“বাঘ নয়, বাঘরোল বলতে চেয়েছিলেন মমতা”
বৃহস্পতিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিঁধেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। একদা সিপিআইএম নেতা গৌতম দেবের বিখ্যাত উক্তি—”এই জেলার এক প্রান্তে মেট্রো চলে, অন্য প্রান্তে বাঘ ঘোরে”—স্মরণ করিয়ে দিয়ে ঋতব্রত বলেন:
“এটি একটি অদ্ভুত জেলা। এক দিকে মেট্রো ঢুকছে, অন্য দিকে বাঘ ঘুরছে। ঘটনাচক্রে, উনি (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) যাঁকে বাঘ বলছেন, তিনি এই জেলা থেকেই নির্বাচিত সাংসদ। সুন্দরবনে বাঘের পাশাপাশি বাঘরোলও থাকে। মুখ্যমন্ত্রীর মাঝেমধ্যেই গুলিয়ে ফেলার প্রবণতা রয়েছে। আমার ধারণা, তিনি ‘বাঘরোল’ বলতে গিয়ে ভুল করে ‘বাঘ’ বলে ফেলেছেন।”
‘ডিম’ বিতর্ক ও ঋতব্রতের টিপ্পনী
নির্বাচনে শাসকদলের বিপর্যয় এবং তৎপরবর্তী বিক্ষোভে সোনারপুরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে ডিম ও পাথর ছোঁড়ার ঘটনা ঘটেছিল। সেই ঘটনার রেশ টেনে বিরোধী দলনেতা কটাক্ষের সুরে বলেন:
- ডিম চুরির তুলনা: “বাঘ কখনো ডিম খায় বলে শুনিনি। কিন্তু বাঘরোল বা ভামবিড়াল ডিম চুরি করে খায়। এই তথাকথিত বাঘ ডিম খাওয়ার ভয়েই ঘর থেকে বেরোতে চাইছিলেন না।”
- কণ্ঠস্বরের নমুনা ও নিরাপত্তা: সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টে একটি মামলার শুনানিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, কণ্ঠস্বরের নমুনা দিতে যাওয়ার সময় তাঁর দিকে যেন ডিম ছোঁড়া না হয় এবং পুলিশ যেন তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। আদালতও এ বিষয়ে রাজ্যকে নির্দেশ দেয়।
- আর্থিক তছরুপের অভিযোগ: ঋতব্রত আরও যোগ করেন, “আর্থিক তছরুপের ক্ষেত্রে ওঁর বিরুদ্ধে যে সমস্ত অভিযোগ উঠছে, তা যদি প্রমাণিত হয়, তবে অবশ্যই ওঁকে বড় শিকারি বা ‘বাঘ’ বলতেই হবে।”
কালীঘাট শিবিরে বড়সড় ভাঙন: দল ছাড়ছেন মণীশ গুপ্ত ও তাপস চট্টোপাধ্যায়
তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে ভাঙন পরিস্থিতি আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
- মণীশ গুপ্তের সিদ্ধান্ত: রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা দুঁদে প্রাক্তন আমলা মণীশ গুপ্ত বৃহস্পতিবারই আনুষ্ঠানিকভাবে তৃণমূল ছাড়ার কথা ঘোষণা করেছেন। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠাচ্ছেন এবং একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। রাজনৈতিক মহলের খবর, মণীশ গুপ্ত শীঘ্রই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে যোগ দিতে চলেছেন।
- তাপস চট্টোপাধ্যায়ের দলবদল: রাজারহাট-নিউটাউনের প্রাক্তন বিধায়ক তাপস চট্টোপাধ্যায়ও একই পথে পা বাড়িয়েছেন। সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, ঋতব্রতের সংগঠনে তাঁকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
“২১ জুলাইয়ের আগেই চলে যান”: পাল্টা হুঁশিয়ারি মমতার
দলের একের পর এক হেভিওয়েট নেতার দলত্যাগ ও দলবদল নিয়ে এদিন সমাজমাধ্যমে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজনৈতিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়েও অনড় মনোভাব প্রকাশ করে তিনি জানান:
দলত্যাগীদের নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। যাঁদের দল ছাড়ার, তাঁরা যেন আগামী ২১ জুলাইয়ের (শহিদ দিবস) আগেই চলে যান।
এর পর নতুন করে এবং নতুন মুখ নিয়ে দল গড়ে তোলার ইঙ্গিতও দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২১ জুলাইয়ের সমাবেশকে সামনে রেখে তৃণমূলের অন্দরে এই ভাঙন ও পাল্টা হুঁশিয়ারির লড়াই আগামী দিনে আরও তীব্র রূপ নিতে চলেছে।

