বিশ্ব ক্রিকেটের চিরচেনা খোলনলচে বদলে ফেলার বড়সড় সিদ্ধান্ত নিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (ICC)। এডিনবরায় আয়োজিত আইসিসি-র বার্ষিক সম্মেলনে ২০২৭ সালের ওডিআই বিশ্বকাপ এবং ২০৮ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের কথা মাথায় রেখে একাধিক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। দুটি টুর্নামেন্টেরই দল সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি নকআউট পর্বে খেলার যোগ্যতার বিন্যাসেও আনা হয়েছে চমকপ্রদ পরিবর্তন।
২০২৭ ওডিআই বিশ্বকাপ: তিন-ধাপের নতুন ফরম্যাটে ‘সুপার সেভেন’
দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবোয়ে এবং নামিবিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে চলা ২০২৭ সালের ওডিআই বিশ্বকাপে মোট ১৪টি দল অংশ নেবে (২০২৩ সালের বিশ্বকাপে দল ছিল ১০টি)। এই টুর্নামেন্টে নকআউট পর্বের আগে একটি সম্পূর্ণ নতুন তিন-ধাপের ফরম্যাট চালু করছে আইসিসি।
নতুন তিন-ধাপের কাঠামোটি নিম্নরূপ:
- ধাপ ১ (সুপার সিরিজ): র্যাঙ্কিংয়ের ১২ থেকে ১৪ নম্বর অবস্থানে থাকা দলগুলি সরাসরি মূল পর্বে খেলার সুযোগ পাবে না। তাদের প্রথমে ‘সুপার সিরিজ’ খেলতে হবে। এই রাউন্ডের জয়ী দল পরবর্তী ধাপে অন্য দলগুলির সাথে যোগ দেবে।
- ধাপ ২ (গ্রুপ পর্ব): মূল পর্বের ১২টি দলকে দুটি গ্রুপে (প্রতি গ্রুপে ৬টি করে দল) ভাগ করা হবে। প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ তিনটি দল এবং উভয় গ্রুপের মধ্যে সামগ্রিকভাবে পরবর্তী সেরা অবস্থানে থাকা আরও একটি দল— অর্থাৎ মোট ৭টি দল পরবর্তী ধাপে উন্নীত হবে।
- ধাপ ৩ (সুপার সেভেন): পূর্বে পরিকল্পিত ‘সুপার সিক্স’-এর পরিবর্তে এবার প্রবর্তিত হচ্ছে বড় পরিসরের ‘সুপার সেভেন’ রাউন্ড। এই রাউন্ডের শীর্ষ চার দল সরাসরি সেমিফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে এবং সেখান থেকে দুই জয়ী দল ফাইনালে মুখোমুখি হবে।
আইসিসি-র বক্তব্য: এই নতুন বিন্যাসটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে বড় দলগুলি দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে এবং প্রতি ম্যাচের ফলাফল শেষ পর্যন্ত যোগ্যতা অর্জনের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত প্রভাব ফেলে।
যেভাবে হবে ২০২৭ ওডিআই বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন:
টুর্নামেন্টে মোট ১০টি দল সরাসরি খেলার সুযোগ পাবে। সহ-আয়োজক হিসেবে আইসিসি-র পূর্ণ সদস্য হওয়ায় দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবোয়ে সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন করলেও, সহযোগী সদস্য হওয়ায় সহ-আয়োজক নামিবিয়া স্বয়ংক্রিয় যোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না। সরাসরি খেলার বাকি ৮টি স্থান ওডিআই র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ আট দলের জন্য বরাদ্দ থাকবে। বাকি ৪টি আসনের জন্য বিশ্বজুড়ে কোয়ালিফায়ার রাউন্ড বা বাছাইপর্ব অনুষ্ঠিত হবে।
২০২৮ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ: বিদায় নিচ্ছে ‘সুপার এইট’, আসছে ‘সুপার টেন’
অস্ট্রেলিয়া ও নিউ জিল্যান্ডের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত হতে চলা ২০২৮ সালের পুরুষদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। পূর্বের ‘সুপার এইট’ ফরম্যাট পুরোপুরি বিলুপ্ত করে চালু করা হচ্ছে ‘সুপার টেন’ রাউন্ড।
নতুন ফরম্যাটের নিয়মাবলী:
- গ্রুপ পর্ব: টুর্নামেন্টের শুরুতে ৪টি করে দল নিয়ে মোট ৫টি গ্রুপ গঠন করা হবে। প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল (মোট ১০টি দল) উন্নীত হবে ‘সুপার টেন’ রাউন্ডে।
- সুপার টেন: এই রাউন্ডে ৫টি করে দল নিয়ে দুটি গ্রুপ গঠিত হবে। পূর্বের নিয়মে শীর্ষ দুই দল সেমিফাইনালে উঠলেও, এবার কেবল দুই গ্রুপের চ্যাম্পিয়নেরাই সরাসরি শেষ চারে জায়গা পাবে।
- এলিমিনেটর ম্যাচ: সেমিফাইনালের বাকি দুটি আসনের জন্য দুই গ্রুপের দ্বিতীয় স্থানে থাকা দলগুলি বিপরীত গ্রুপের তৃতীয় স্থানে থাকা দলগুলির মুখোমুখি হবে এলিমিনেটর ম্যাচে। এই ম্যাচগুলির জয়ী দুই দল সেমিফাইনালের টিকিট পাবে।
আইসিসি মনে করছে, ভারতে অনুষ্ঠিত ২০১৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে উদীয়মান দেশগুলির দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণেই দ্বিতীয় পর্বের দল সংখ্যা ৮ থেকে বাড়িয়ে ১০ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
২০২৮ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের কোয়ালিফিকেশন ব্লু-প্রিন্ট:
২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের পরিবর্তে স্বল্প নোটিশে অংশ নেওয়া স্কটল্যান্ডকে এবার ইউরোপীয় আঞ্চলিক ফাইনালে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২০২৬ সালের টুর্নামেন্টে যারা সরাসরি যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি, তারা গ্লোবাল কোয়ালিফায়ার বা বৈশ্বিক বাছাইপর্বে খেলবে।
আঞ্চলিক টুর্নামেন্টের মাধ্যমে আরও ৮টি দল মূল পর্বের টিকিট পাবে। এর মধ্যে আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপ থেকে ২টি করে এবং আমেরিকা ও পূর্ব এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে ১টি করে দল সুযোগ পাবে। গ্লোবাল কোয়ালিফায়ারে প্রতিটি অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় দল এবং সামগ্রিকভাবে পরবর্তী সেরা ৩টি দল ২০২৮ সালের বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে।
চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা
আইসিসি জানিয়েছে যে, ডেভেলপমেন্ট কমিটি ও চিফ এক্সিকিউটিভস কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই তাদের বোর্ড এই নতুন টুর্নামেন্ট কাঠামোর প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে। আগামী নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হতে চলা বোর্ডের বৈঠকে ফাইন্যান্স অ্যান্ড কমার্শিয়াল অ্যাফেয়ার্স কমিটির পর্যালোচনার পর এই নতুন কাঠামোতে চূড়ান্ত সিলমোহর দেওয়া হবে।

