কামদুনি মামলায় আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে অনড় রাজ্য, নির্যাতিতার পরিবারকে পাশে থাকার আশ্বাস মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর

কামদুনি মামলায় আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে অনড় রাজ্য, নির্যাতিতার পরিবারকে পাশে থাকার আশ্বাস মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর

বারাসতের কামদুনিতে কলেজছাত্রীকে গণধর্ষণ ও নৃশংস খুনের মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া ফাঁসির রায় যাতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টেও বহাল থাকে, তার জন্য সবরকম চেষ্টা করবে রাজ্য সরকার। বুধবার নির্যাতিতার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে এই আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রীর এই আশ্বাসে আশার আলো দেখছেন স্বজনহারা পরিবারটি। তবে আদালতের লড়াইয়ের পাশাপাশি দোষীদের সরাসরি ‘এনকাউন্টার’ করে শাস্তি দেওয়ার দাবিও তুলেছেন নির্যাতিতার ভাই।

২০১৩ সালের কামদুনি কাণ্ড ও আইনি টানাপোড়েন

২০১৩ সালে কামদুনিতে দ্বিতীয় বর্ষের এক কলেজছাত্রীকে গণধর্ষণ ও খুন করার ঘটনায় কেঁপে উঠেছিল রাজ্য। ২০১৬ সালে বারাসতের নিম্ন আদালত অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছিল। তবে পরবর্তীকালে কলকাতা হাইকোর্ট সাজাপ্রাপ্তদের সাজা কমিয়ে দেয়। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া এক আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয় এবং বাকিদের ফাঁসির আদেশ পরিবর্তন করে আমৃত্যু কারাদণ্ড করা হয়। তবে আমৃত্যু কারাদণ্ডের নির্দেশ পাওয়া আসামিরাও ১০ বছর সাজা খাটার পর খালাস পেয়ে যান।

হাইকোর্টের এই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় নির্যাতিতার পরিবার। বর্তমানে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে এই মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

“আগের সরকার আসামিদের খালাস করার ব্যবস্থা করেছিল”, বিস্ফোরক শুভেন্দু

বুধবার নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তৎকালীন তৃণমূল সরকারকে তীব্র নিশানা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন:

“আগের সরকার ১৬ বার পিপি (সরকারি আইনজীবী) বদল করে আসামিদের খালাস করার রাস্তা তৈরি করে দিয়েছিল। পরিবার বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছে এবং মামলাটি সেখানে বিচারাধীন। আমি তাঁদের স্পষ্ট জানিয়েছি, সুপ্রিম কোর্টে রাজ্য সরকারের আইনজীবীরা তাঁদের সবরকম সহযোগিতা করবেন। এই বিষয়টি এখন সরাসরি রাজ্য সরকার বা রাজ্য পুলিশের এক্তিয়ারে না থাকলেও, কামদুনির ছাত্রীর হত্যাকারীদের আইনি লড়াইয়ে রাজ্য সরকার কোনোভাবেই সমর্থন করবে না— মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আমি এই নির্দেশ স্ট্যান্ডিং কমিটিকে দিয়ে রেখেছি।”

সিআইডির গাফিলতি নিয়ে নালিশ, এনকাউন্টারের দাবি পরিবারের

মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে নির্যাতিতার মা বলেন, “স্যর বললেন তিনি সবটাই জানেন। উনি তো নিজেও আমাদের এই আন্দোলনে সামিল ছিলেন। আমার মেয়ে নিশ্চয়ই এবার বিচার পাবে।”

তদন্তকারী সংস্থা সিআইডির গাফিলতির একাধিক অভিযোগ তুলে এদিন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ১১ দফার একটি লিখিত স্মারকলিপি জমা দেয় পরিবার। আলোচনার পর নির্যাতিতার ভাই বলেন:

“মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাসে আমরা স্বস্তি পেয়েছি। উনি বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন ওঁর হাত ধরেই আমরা সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিলাম। দাদা আমাদের বলেছেন, আগের সরকার যেভাবে সুপ্রিম কোর্টে মামলাটাকে ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিল, বর্তমান সরকার তেমনটা করবে না। আইনের পথেই দোষীদের শাস্তি দেওয়া হবে।”

রাজ্যে বাড়তে থাকা নারী নির্যাতনের ঘটনার প্রেক্ষিতে কড়া আইনের পাশাপাশি অপরাধীদের তাৎক্ষণিক শাস্তির দাবিও তোলেন তিনি। তাঁর ক্ষোভ, “বর্তমানে ধর্ষণের ঘটনা যেভাবে বাড়ছে, তাতে এদের সরাসরি এনকাউন্টার করে মেরে ফেলা উচিত। আমরা চাই এই ধরনের অপরাধে এনকাউন্টারের আইন আনা হোক। নিম্ন আদালত যে ফাঁসির রায় দিয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টেও যাতে তা বহাল থাকে, তার চেষ্টা এই সরকার করবে শুনে আমরা খুশি।”

উল্লেখ্য, সম্প্রতি বারুইপুরে নাবালিকা গণধর্ষণ ও খুনের মামলায় এক মূল অভিযুক্ত পুলিশের গুলিতে (এনকাউন্টারে) মারা যাওয়ার পর থেকেই কামদুনি মামলা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে রাজ্যের অবস্থান বদলের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার সশরীরে নির্যাতিতার পরিবারের মুখোমুখি হয়ে সেই আশ্বাসেই সিলমোহর দিলেন মুখ্যমন্ত্রী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.