নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়া রাগই ডেকে আনছে স্ট্রোক-হৃদরোগের ঝুঁকি! কখন প্রয়োজন থেরাপির? জানালেন বিশেষজ্ঞরা

নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়া রাগই ডেকে আনছে স্ট্রোক-হৃদরোগের ঝুঁকি! কখন প্রয়োজন থেরাপির? জানালেন বিশেষজ্ঞরা

অপমান, অসম্মান, হতাশা কিংবা তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়ে রেগে যাওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি মানবিক অনুভূতি। দুঃখ বা আনন্দের মতোই রাগও মানুষের একটি সাধারণ আবেগ। তবে চিকিৎসকদের মতে, এই সাধারণ অনুভূতিই অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে যখন তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। রাগের মাথায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চরম ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া বা অন্যের ক্ষতি করার নজির সমাজ জীবনে কম নেই। তবে কেবল অন্যের নয়, অতিরিক্ত রাগ নিজের শরীরেরও মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনে।

দিল্লির বিশিষ্ট মনোরোগ চিকিৎসক অবীণা গুপ্ত এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, রাগে কাণ্ডজ্ঞান হারানো কোনো সাধারণ আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়। কাউকে কেবল ‘রাগী স্বভাবের’ তকমা দিয়ে বা তাঁর ব্যক্তিত্বের দোহাই দিয়ে বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়া আসলে তাঁর নিজেরই মারাত্মক ক্ষতি করা। নিজের সুস্থতার স্বার্থেই রাগ নিয়ন্ত্রণের কৌশল শেখা অত্যন্ত জরুরি।

কখন রাগ একটি মানসিক সমস্যায় পরিণত হয়?

দৈনন্দিন জীবনের মানসিক চাপ, প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া কিংবা আকস্মিক অপমানের কারণে সাময়িক রাগ হতেই পারে। কিন্তু সেই রাগের তীব্রতায় যদি নিজের কিংবা আশেপাশের মানুষের ক্ষতি হতে শুরু করে, তবে তা অবিলম্বে থামানো প্রয়োজন।

তীব্র রাগের কারণে হঠাৎ রক্তচাপ (Blood Pressure) বেড়ে যাওয়া বা হৃৎস্পন্দনের গতি অত্যন্ত দ্রুত হয়ে যাওয়া থেকে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের মতো প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তীব্র ক্ষোভ বা মেজাজ যখন কারও জীবন, সামাজিক সম্পর্ক এবং স্বাস্থ্যের নিয়মিত ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা আর সাধারণ স্বভাব থাকে না— তা একটি মানসিক সমস্যায় পরিণত হয়।

কোন কোন লক্ষণ দেখলে থেরাপির সাহায্য নেওয়া জরুরি?

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, নিচের লক্ষণগুলো যদি কোনো ব্যক্তির মধ্যে ক্রমাগত দেখা যায়, তবে বুঝতে হবে তাঁর অবিলম্বে পেশাদার থেরাপিস্টের সাহায্য প্রয়োজন:

  • রেগে গিয়ে অন্যকে শারীরিক বা মানসিকভাবে আক্রমণ করতে যাওয়া।
  • চিৎকার-চেঁচামেচি করা এবং রাগের মাথায় জিনিসপত্র ভাঙচুর করা।
  • কারও ওপর মনে মনে ক্ষোভ পুষে রাখা এবং প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠা।
  • অনবরত খিটখিটে মেজাজ থাকা এবং সামান্য বিষয়েই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠা।
  • রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামে পড়ে বা অন্যের গাড়ি চালানোর সামান্য ভুলে তীব্র রেগে গিয়ে গালিগালাজ করা (রোড রেজ)।
  • মেজাজ খারাপ হলে বা রাগ হলে মদ্যপান ও ধূমপানের মাত্রা অতিরিক্ত বাড়িয়ে দেওয়া।
  • রাগের কারণে ক্রমাগত মানসিক চাপ ও উদ্বেগ (Anxiety) বৃদ্ধি পাওয়া।

শরীরে রাগের কুপ্রভাব: কী ঘটে ভেতরে?

তীব্র রাগের মুহূর্তে আমাদের শরীর এক চরম উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যায়। বুক ধড়ফড় করা বা চোখ-মুখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো বাহ্যিক লক্ষণগুলোর পাশাপাশি শরীরের ভেতরে দ্রুত নিঃসৃত হতে থাকে ‘কর্টিসল’ (Cortisol) নামক স্ট্রেস হরমোন।

শারীরিক জটিলতা: কর্টিসল হরমোনের অতিরিক্ত ক্ষরণের ফলে রক্তচাপ দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং হৃৎস্পন্দনের গতি বাড়ে। বারবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে দীর্ঘ মেয়াদে হৃৎপিণ্ড এবং রক্তনালীর ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে, যা পরবর্তীকালে হৃদরোগের পথ প্রশস্ত করে।

রাগ নিয়ন্ত্রণের বৈজ্ঞানিক উপায়

যদি স্বাভাবিক উপায়ে নিজের মেজাজকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব না হয়, তবে সঠিক বৈজ্ঞানিক থেরাপির সাহায্য নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

মনোরোগ চিকিৎসকদের মতে, এই ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে ‘কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি’ (CBT) অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এটি একটি স্বল্পমেয়াদি চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে অভিজ্ঞ কাউন্সেলরের সহায়তায় রোগীকে রাগ প্রশমনের বাস্তবমুখী কৌশলগুলো শেখানো হয়। এই থেরাপির মাধ্যমে মানুষের নেতিবাচক চিন্তাভাবনাগুলোকে ইতিবাচক দিকে চালিত করা সম্ভব হয়, যা সামগ্রিকভাবে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে মানসিক স্বাস্থ্যকে স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.