সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন ধর্ম ও সন্ন্যাসীদের বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্য করা কোনো প্রার্থীকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করতে বাধ্য নয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বুধবার এক ঐতিহাসিক রায়ে কলকাতা হাই কোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশ খারিজ করে এই পর্যবেক্ষণ জানাল বিচারপতি দেবাংশু বসাক এবং বিচারপতি মহম্মদ শব্বর রশিদির ডিভিশন বেঞ্চ। আদালতের স্পষ্ট বক্তব্য, নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও, নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ ও আদর্শ রক্ষা করার সম্পূর্ণ অধিকার কলেজ কর্তৃপক্ষের রয়েছে।
মামলার প্রেক্ষাপট ও রামকৃষ্ণ মিশনের আপত্তি
কলেজ সার্ভিস কমিশনের (CSC) লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন রেসিডেন্সিয়াল কলেজে ইংরেজির সহকারী অধ্যাপক (Assistant Professor) পদের জন্য সুপারিশপত্র পেয়েছিলেন মামলাকারী তমাল দাশগুপ্ত। চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি তিনি কাজে যোগ দিতে গেলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁকে নিয়োগপত্র দেয়নি।
রামকৃষ্ণ মিশন রেসিডেন্সিয়াল কলেজের পরিচালন সমিতির বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, তমাল দাশগুপ্তকে নিয়োগ করা সম্ভব নয়। কলেজের অভিযোগ ছিল:
- ওই চাকরিপ্রার্থী ফেসবুকে বিভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে কটাক্ষ ও আপত্তিকর পোস্ট করেছেন।
- তিনি সনাতন ধর্মের সন্ন্যাসীদের বিরুদ্ধেও কুৎসিত মন্তব্য করেছেন, যা রামকৃষ্ণ মিশনের আদর্শ ও দর্শনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
- সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত হলেও এই আবাসিক কলেজটি একটি স্বশাসিত সংস্থা এবং একটি নির্দিষ্ট দর্শনের ভিত্তিতে চলে। এমন মানসিকতার শিক্ষক নিয়োগ করলে কলেজের পরিবেশ ক্ষুণ্ন হবে এবং ছাত্রদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশ ও ডিভিশন বেঞ্চে আপিল
কলেজের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন তমাল দাশগুপ্ত। তাঁর যুক্তি ছিল, ফেসবুকে লেখা মন্তব্য তাঁর ব্যক্তিগত মতামত এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা তাঁর মৌলিক অধিকার। যেহেতু তিনি কমিশনের মাধ্যমে যোগ্যতা প্রমাণ করে এসেছেন, তাই কলেজের নিজস্ব ইচ্ছার কোনো আইনি বৈধতা নেই।
হাই কোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চ প্রথমে রামকৃষ্ণ মিশনের যুক্তি খারিজ করে তমালকে চার সপ্তাহের মধ্যে নিয়োগপত্র দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে ডিভিশন বেঞ্চের দ্বারস্থ হয় রামকৃষ্ণ মিশন কর্তৃপক্ষ।
“অধিকার থাকলেই চাকরি বাধ্যতামূলক নয়”: ডিভিশন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ
ডিভিশন বেঞ্চে মামলার শুনানির পর বিচারপতি দেবাংশু বসাকের বেঞ্চ সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশটি সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়। রায়দানের সময় আদালতের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলি হলো:
১. স্বাধিকার ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ: আইন অনুযায়ী কমিশনের সুপারিশ মেনে নিয়োগ হলেও, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। তবে সেই সিদ্ধান্ত সৎ এবং প্রতিষ্ঠানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট হতে হবে, কোনো খামখেয়ালিপনা চলবে না।
২. নিয়োগের চূড়ান্ত অধিকার: কোনো প্রার্থী কেবল পরীক্ষায় নির্বাচিত বা সুপারিশপ্রাপ্ত হলেই সংশ্লিষ্ট সংস্থায় চাকরি পাওয়ার সম্পূর্ণ আইনি অধিকার তৈরি হয়ে যায় না।
৩. মত প্রকাশের স্বাধীনতার সীমা: মামলাকারীকে কেউ ফেসবুকে লিখতে বা ধর্ম পালন করতে বাধা দেয়নি। কিন্তু তাঁর মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে বলেই কোনো প্রতিষ্ঠান তাঁকে চাকরি দিতে বাধ্য— এমনটা হতে পারে না।
বিচারপতিদ্বয়ের বেঞ্চ আরও জানায় যে, ওই ফেসবুক পোস্টগুলি অশ্লীল বা রাষ্ট্রদ্রোহী কি না, আদালত সেই বিতর্কে ঢুকছে না। তবে পোস্টগুলির পরিপ্রেক্ষিতে কলেজ কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে যে ওই ব্যক্তি তাদের প্রতিষ্ঠানের পরিবেশের সাথে মানানসই নন, তবে সেই সিদ্ধান্তকে কোনোভাবেই ‘অযৌক্তিক’ বা ‘বিদ্বেষমূলক’ বলা যায় না। আদালতের এই রায়ের ফলে রামকৃষ্ণ মিশনের স্বাধিকার ও আদর্শ রক্ষার লড়াই আইনি স্বীকৃতি পেল।

