প্রত্যাশিতভাবেই বিধানসভায় পাশ হয়ে গেল শুভেন্দু সরকারের আনা চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিল। এর মধ্যে রয়েছে ওবিসি (OBC) সংরক্ষণ সংক্রান্ত জোড়া সংশোধনী বিল এবং গুন্ডাদমন ও সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের বিরুদ্ধে আনা দুটি বিল। প্রতিটি বিল পাশের ক্ষেত্রেই ভোটাভুটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ভোটের ফলাফলে সরকার পক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কোনো সংশয় না থাকলেও, ভোটাভুটির সময়কার রাজনৈতিক সমীকরণ এবং বিধায়কদের অবস্থান ঘিরে বিরোধী শিবিরের অন্দরে তীব্র জল্পনা ও সমন্বয়হীনতার চিত্র প্রকাশ্যে এসেছে।
প্রথমার্ধ: ওবিসি সংরক্ষণ বিল ও ‘বিদ্রোহী’ শিবিরের সমন্বয়হীনতা
সোমবার অধিবেশনের প্রথমার্ধে অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণমন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ ওবিসি সংরক্ষণ সংক্রান্ত জোড়া সংশোধনী বিল পেশ করেন। বিলের ওপর আলোচনার পর আইএসএফ (ISF) বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি ভোটাভুটির দাবি জানান।
- কৌশল নির্ধারণ: এই সময় কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের তিন বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় ও আলিফা আহমেদকে নিজেদের কৌশল নিয়ে আলোচনা করতে দেখা যায়। অন্যদিকে, তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবিরেও তৎপরতা বাড়ে এবং ঋতব্রত, সন্দীপন সাহা, সাবিনা ইয়াসমিনেরা দ্রুত আলোচনা সেরে নেন।
- কক্ষত্যাগ ও স্পিকারের ভর্ৎসনা: ভোটাভুটির ঠিক আগে ঋতব্রত শিবিরের বিধায়কদের একটি বড় অংশ কক্ষত্যাগ (ওয়াকআউট) করেন। তবে ওই শিবিরেরই কাজল শেখ, তৌফিকুর রহমান, বাইরন বিশ্বাস, মোশারফ হোসেন ও পান্নালাল হালদারের মতো কয়েকজন বিধায়ক ভিতরেই থেকে যান। সময়মতো বেরিয়ে না যাওয়ার কারণে তাঁদের স্পিকারের ভর্ৎসনার মুখেও পড়তে হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁরা ভিতরে থাকলেও ভোটদান থেকে বিরত থাকেন।
- ভোটের রহস্যময় ১৭ নম্বর ফল: ওবিসি বিলের পক্ষে ভোট পড়ে ১৮৬টি এবং বিপক্ষে ১৭টি। কালীঘাট শিবিরের দাবি, তাঁদের ১২ জন বিধায়ক উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁরা প্রস্তাবের বিপক্ষেই ভোট দিয়েছেন। এর সঙ্গে কংগ্রেসের দুই বিধায়ক, সিপিএমের মুস্তাফিজুর রহমান এবং আইএসএফের নওশাদ সিদ্দিকির ভোট যুক্ত হলে বিরোধী ভোট হওয়ার কথা ১৬টি। ফলে ‘১৭ নম্বর’ ভোটটি কে দিলেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। জল্পনা উঠছে, ঋতব্রত শিবিরের ভিতরে থেকে যাওয়া বিধায়কদের কেউ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন কি না।
সমন্বয়হীনতার অভিযোগ: ঋতব্রত শিবিরের বিধায়ক বাইরন বিশ্বাসের কথায় ইঙ্গিত মিলেছে যে, ওয়াকআউটের সিদ্ধান্ত ‘সিস্টেমেটিক’ বা পরিকল্পিতভাবে নেওয়া হয়নি। ওই শিবিরের আরেক বিধায়ক দাবি করেন, ওয়াকআউট করা হবে তা তাঁরা জানতেনই না। উল্লেখ্য, ভোটাভুটির পর বাইরনকে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলতে দেখা যায়।
দ্বিতীয়ার্ধ: গুন্ডাদমন বিল ও ভোটদানে বিরত থাকার সমীকরণ
অধিবেশনের দ্বিতীয়ার্ধে গুন্ডাদমন বিল এবং সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের বিরুদ্ধে মন্ত্রী বিশাল লামার পেশ করা সংশোধনী বিল নিয়ে আলোচনার পর ভোটাভুটির দাবি জানান ঋতব্রত শিবিরের মুখ্যসচেতক আখরুজ্জামান।
- ফলাফল: এই পর্বে কেউ ওয়াকআউট না করলেও বিলের পক্ষে ভোট পড়ে ১৭৬টি এবং বিপক্ষে ৪১টি। ২০ জন বিধায়ক ভোটদান থেকে বিরত থাকেন।
- ভোটদানে বিরতি ও নতুন বিতর্ক: এই পর্বে কালীঘাটপন্থী তৃণমূল সম্পূর্ণভাবে ভোটদানে বিরত ছিল। কুণাল ঘোষের বক্তব্য অনুযায়ী, গুন্ডাদমন বিলের ভোটাভুটির সময় তাঁদের ১১ জন বিধায়ক উপস্থিত ছিলেন। কুণাল বলেন, “তাঁরা এই বিলের বিরোধিতা করেন এবং বেশ কিছু সংশোধনী চেয়ে সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর আবেদন করেছেন।” কৌশলগত কারণে তাঁরা ভোটদানে বিরত ছিলেন।
যদি কালীঘাট শিবিরের ১১ জন বিধায়ক বিরত থাকেন, তবে বাকি ৯ জন (মোট ২০ জনের মধ্যে) কারা? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রথমার্ধের মতো দ্বিতীয়ার্ধেও ঋতব্রত বা ‘বিদ্রোহী’ শিবির থেকে কমপক্ষে ৮-৯ জন বিধায়ক কালীঘাট তৃণমূলকে অনুসরণ করে ভোটদানে বিরত থেকেছেন।
নেতৃত্বের কোন্দল ও ‘তৃতীয় শাখা’র জল্পনা
ভোটাভুটির এই ধোঁয়াশা নিয়ে কুণাল ঘোষ তীব্র কটাক্ষ করে বলেন, “আমরা তো ১১ জন ছিলাম। তাহলে বাকিরা কারা যারা ভোটদানে বিরত থাকলেন?” সেই সঙ্গেই তিনি দাবি করেন, ঋতব্রতের নেতৃত্বে বিদ্রোহী শিবিরের অনেক বিধায়কই বর্তমানে খুশি নন।
কুণাল ঘোষের এই কটাক্ষ এবং ওয়াকআউট বা ভোটদানে বিরত থাকা নিয়ে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক বিতর্ক প্রসঙ্গে ঋতব্রত নিজে বা তাঁর শিবিরের কোনো সদস্যই মুখ খোলেননি। এই রাজনৈতিক ‘মৌনতা’ এবং বিধানসভার অন্দরের সমীকরণ ফের বঙ্গ রাজনীতিতে তৃণমূলের অন্দরে ‘তৃতীয় শাখা’ বা নতুন কোনো সমীকরণ তৈরির জল্পনাকে জোরালো করছে।

