রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতির আবহে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে শোরগোল ফেলে দিয়েছিলেন কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্র। এর জেরে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে জোর জল্পনা শুরু হয়— তবে কি তিনিও বিরোধী শিবিরের পথে পা বাড়াচ্ছেন? এই তীব্র বিতর্কের মাঝেই বুধবার সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে নিজের মন্তব্যের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিলেন মহুয়া। তাঁর দাবি, যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের আবেগের কারণে করে উঠতে পারেননি, সেই অযোগ্য নেতাদের দল থেকে সরিয়ে আদতে তৃণমূলের ‘শুদ্ধিকরণে’ সাহায্য করছেন শুভেন্দুই।
“যা দিদি পারেননি, তা শুভেন্দু করে দেখিয়েছেন”
সম্প্রতি ‘বিবিসি হিন্দি’-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও শুদ্ধিকরণ নিয়ে মুখ খোলেন মহুয়া মৈত্র। বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পর দলের একাধিক নেতার দলবদল প্রসঙ্গে মহুয়া বলেন,
“যে কাজটা দিদি নিজের আবেগ এবং কর্মীদের প্রতি ভালবাসার কারণে করতে পারতেন না, সেটা শুভেন্দু করে দিয়েছেন। আমাদের দলে যত ভুয়ো লোক ছিলেন, ঋতব্রতের মাধ্যমে তাঁদের সবাইকে দল থেকে সরিয়ে নিয়েছেন তিনি। এই জন্যই আমি ওঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছি।”
মহুয়ার সংযোজন, বিজেপিই এতদিন প্রচার করত যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভাল, কিন্তু তাঁর চারপাশের লোকজন ‘চোর-ডাকাত’। এখন বিজেপি সেইসব নেতাদের নিজেদের দলে টেনে নিচ্ছে। ফলে তাঁদের (বিজেপি) দলে চোর-ডাকাতের সংখ্যা যত বাড়ছে, তৃণমূল তত বেশি নিষ্কলঙ্ক ও শুদ্ধ হচ্ছে।
মমতার সাংগঠনিক নীতির সমালোচনা ও বিজেপির শৃঙ্খলা
সাক্ষাৎকারে নিজের দলনেত্রীর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নীতির সমালোচনা করতেও পিছপা হননি মহুয়া। দল পরিচালনায় তৃণমূলের কিছু ব্যর্থতা তুলে ধরে তিনি বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বজায় রাখতে পছন্দ করতেন। ফলে বহু অযোগ্য ও অকর্মণ্য নেতাও দলে জায়গা পেয়ে গিয়েছিলেন। তাঁরা নিজেদের ক্ষমতায় আদৌ ভোট জেতার যোগ্য কি না, তা মমতার যাচাই করা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পাশাপাশি বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোর প্রশংসা করে কৃষ্ণনগরের সাংসদ বলেন, “বিজেপির একটি শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল কর্মীবাহিনী রয়েছে। তাঁদের হিন্দুত্ববাদী আদর্শ অত্যন্ত স্পষ্ট এবং সেই দল কোনো একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।”
শুভেন্দুর সঙ্গে পুরনো বন্ধুত্বের স্মৃতিচারণ
রাজনৈতিক মতাদর্শ আলাদা হলেও, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তাঁর পুরনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করেন মহুয়া। ২০১৪ সালের একটি ঘটনার উল্লেখ করে তিনি জানান, সেবার দলের টিকিট না পেয়ে তিনি সারারাত কেঁদেছিলেন। সেই কঠিন সময়ে একমাত্র শুভেন্দুই তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। এমনকি করিমপুর বিধানসভা কেন্দ্রে মহুয়া যখন প্রথমবার নির্বাচনে লড়াই করেন, তখন শুভেন্দুই একমাত্র নেতা হিসেবে তাঁর হয়ে কোমর বেঁধে প্রচার করেছিলেন।
পুরনো বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করে মহুয়া বলেন, “আমি অত্যন্ত আবেগতাড়িত একজন রাজনীতিবিদ। দলকে পরিবার মনে করি। ব্যক্তিগতভাবে শুভেন্দু আমার খুব ভাল বন্ধু ছিল। এক দলে থাকার সময় ও আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল, বলেছিল— ‘না বোন, সব ঠিক হয়ে যাবে’। এখন ও অন্য দলে (মুখ্যমন্ত্রী) রয়েছে, তাই আগের মতো আর কথা হয় না।”
শুভেন্দু অধিকারীকে ধন্যবাদ দেওয়া নিয়ে রাজনৈতিক মহলে যে ভুল বার্তা যাচ্ছিল, আজ নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে মহুয়া মৈত্র তা ভাঙার চেষ্টা করলেন বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।

