তারাতলার ট্রান্সপোর্ট ডিপো রোডে নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ ধসে পাঁচ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসছে। প্রাথমিক তদন্ত এবং বিশেষজ্ঞদের মত অনুযায়ী, এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের নেপথ্যে রয়েছে গুদামটির নকশাগত (Structural Design) বড়সড় ত্রুটি ও কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি। দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও নকশায় ত্রুটির কথা নিশ্চিত করেছেন। গত ১৭ জানুয়ারি কলকাতা পুরসভা এই ত্রুটিপূর্ণ নকশায় কীভাবে অনুমোদন দিল, তা নিয়ে ইতিমিধ্যেই প্রশাসনিক স্তরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
নকশায় ‘ভয়ঙ্কর ভুল’, উধাও ছিল নজরদারি
প্রায় ২০ হাজার বর্গফুট এলাকা জুড়ে গত দেড় বছর ধরে এই গুদামটি তৈরির কাজ চলছিল। ইমারত বিশেষজ্ঞ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় এই নির্মাণ কাঠামোটিকে ‘ভয়ঙ্কর রকম ভুল’ বলে দাবি করেছেন। তাঁর কথায়:
“নির্মাণের কাঠামোগত নকশা এতটাই ভুল ছিল যে, এটি ভেঙে পড়া অনিবার্য ছিল। এটি সম্পূর্ণভাবে নকশার ব্যর্থতা। নিয়ম মেনে কাজ হলে আজ মানুষকে এভাবে প্রাণ হারাতে হতো না। বিল্ডিং রুল অনুযায়ী পুরসভা এবং পোর্ট ট্রাস্টের শর্তাবলি মেনে আদৌ কাজ হচ্ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত।”
দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বৃষ্টির জেরে মাটি বসে যাওয়ার তত্ত্ব খাড়া করা হলেও, মুখ্যমন্ত্রী তা সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়েছেন। তিনি জানান, “আমি ইঞ্জিনিয়ার নই, তবে ঘটনাস্থল দেখে স্পষ্ট যে বৃষ্টিতে মাটি বসে এই দুর্ঘটনা ঘটেনি। তাহলে লোহার বিম এভাবে বেঁকে যেত না। লোহার কাঠামোর নাট খুলে স্লিপ করে বেরিয়ে গিয়েছে।” বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, নির্মাণে ব্যবহৃত উপকরণের নিম্নমান এবং কোনো পেশাদার নজরদারি (Supervision) না থাকার কারণেই এই বিপর্যয়।
কাঠগড়ায় পুরসভা ও বন্দর কর্তৃপক্ষ
অনুসন্ধানে জানা গিয়েছে, দুর্ঘটনাস্থলের জমিটি কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষের (Port Trust)। ২০২৪ সালের ১ আগস্ট তাঁরা ‘বেহরা ব্রাদার্স’ নামের একটি সংস্থাকে ৩০ বছরের জন্য জমিটি লিজ দেয়। সংস্থার মালিক শম্ভুনাথ বেহরা লিজ নেওয়া জমিতে এই নির্মাণকাজ করাচ্ছিলেন। আইন অনুযায়ী বন্দর এলাকার জমিতে যেকোনো নির্মাণের জন্য বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক আপত্তি না জানালেও, পুরসভার তৎকালীন অনুমোদনের প্রক্রিয়া নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী এই ঘটনার জন্য পুরসভার পূর্বতন জমানার গাফিলতি এবং সিন্ডিকেটরাজকে কাঠগড়ায় তুলেছেন।
নজরে প্রভাবশালী ঠিকাদার আসগর, বামেদের পূর্ব সতর্কবার্তা
এই দুর্ঘটনার পর তীব্র রাজনৈতিক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। জানা গিয়েছে, গত মে মাসেই এই নির্মাণকাজের বৈধতা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছিল বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন।
নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় ঠিকাদার আসগরের ভূমিকাও এখন আতশকাচের নীচে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আসগর শাসকদলের স্থানীয় নেতা ও কাউন্সিলরদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং এলাকায় একচেটিয়া প্রভাব খাটিয়ে বেআইনিভাবে কাজ পরিচালনা করতেন। ত্রুটিপূর্ণ নকশা পাস করানোর নেপথ্যে পুরসভার কোনো বড় চক্র জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জোরালো হচ্ছে।
পুলিশি তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপ
তারাতলা থানার পুলিশ এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই এফআইআর (FIR) দায়ের করে স্বতঃপ্রণোদিত তদন্ত শুরু করেছে। ‘বেহরা ব্রাদার্স’-এর প্রতিনিধিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার পর থেকেই পলাতক ঠিকাদার আসগর, তাঁর খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। এই ঘটনার জেরে কলকাতা পুর এলাকায় তৃণমূল জমানায় অনুমোদিত সমস্ত নির্মীয়মাণ বহুতলের নকশা অডিট করার নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য সরকার এবং আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত সমস্ত অ-জরুরি নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

